তাওহীদুল ইসলাম নূরী:
আজ ২৫ আগষ্ট ২০২১। মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন ও গণহত্যার হাত থেকে বাঁচতে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চার বছর পূর্তি হল আজ। কিন্তু এখনো এই সমস্যা সমাধানের কোন কূলকিনারা হল না। একে তো আমাদের ছোট্ট দেশ, তার উপর ২০১৭ সাল থেকে যুক্ত হয় ১৫ লক্ষ রোহিঙ্গার বসতি। প্রতিদিনই যেন এই সংখ্যা বেড়েই চলছে। ১৯৮০ সালে আসা রোহিঙ্গারা আদৌ ফিরে নি। লোক দেখানো কিছুকে ফেরত নেয়া হলেও ‘পাঁচ লক্ষ মত মিশে আছে বাংলাদেশীদের সাথে’ এমন ধারণা রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। দেশের বিভিন্নপ্রান্তে ওরা ব্যবসায়-বাণিজ্য,বিয়ে-শাদি করে বনে গেছে বাংলাদেশী নাগরিক। তাই, ২০১৭ সালে যারা পালিয়ে এসেছে তারা কবে ফিরবে সেটা আজও সকলের কাছে অজানা। কারণ, যতই প্রত্যাবাসন চুক্তি হোক না কেন কাজের কাজ কিছুই হয় নি ।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের সীমাহীন অত্যাচারে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল ঠিক। কিন্তু এখানে ওরা শুধু নিজেরা নিজেরা নয় কথায় কথায় ঠুনকো ব্যাপারে আশ্রয়দাতা হওয়ার পরেও সংঘর্ষে জড়াচ্ছে বাংলাদেশীদের সাথে। ২০১৯ সালের ২২ আগষ্ট রাতে সরকার দলীয় ইউনিয়ন পর্যায়ের এক নেতাকে পাহাড়ে নিয়ে হত্যা করে রোহিঙ্গারা। অতিসম্প্রতি এবছরের ২১ আগষ্ট ১২ জন শিক্ষার্থী টেকনাফের ন্যাচারাল পার্কস্থ ঝর্ণাটি পরিদর্শনে গেলে সেখানে তাদেরকে দিনদুপুরে বেঁধে রেখে সাথে থাকা টাকা-মোবাইল সব কেড়ে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে ডাকাতি চালায় মানবতার খাতিরে বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া এই রোহিঙ্গারা। খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রায় এক ঘন্টা পর অবশেষে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। ওরা যে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এরকম কয়েকটি ঘটনা থেকে অনুমান করা যায়। আসলে, দিনের পর দিন ক্রমবর্ধমান হারে রক্তারক্তি,খুন,ডাকাতি,চোরাচালান,ধর্ষণ,মাদক পাচারসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে ওরা। রোহিঙ্গারা দেশে আসার পর থেকেই ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে মাদকপাচার।

কক্সবাজারের প্রশাসনের মতে বাংলাদেশীদের খুন ছাড়াও তাদের নিজেদের হাতে নিজেদের মধ্যেও রেকর্ড সংখ্যক খুনের ঘটনা ঘটেছে গত চার বছরের বিভিন্ন সময়ে। বলা হয়ে থাকে যে, রোহিঙ্গারা যতবেশি নির্যাতিত ততবেশি হিংস্র। বাস্তবতাও তাই। সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সাথেও নানান সময়ে সংঘর্ষে জড়াতে দেখা গেছে রোহিঙ্গাদেরকে। বিভিন্ন অপকর্মের কারণে দেড় হাজারের অধিক প্রায় দুই হাজার মামলা হয়েছে এদের বিরুদ্ধে। সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় ২০১৯ সালের ২৬ আগষ্ট একটি এনজিওর সহায়তায় টেকনাফের একটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য ৬০০০ দেশীয় অস্ত্র সরবরাহের চিত্র দেখে। ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্সন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর বাঁধা এবং ইন্ধন রয়েছে’ বলে যে জনরব আছে সেটা এরকম কয়েকটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আরও বেশি স্পষ্ট হয় আমজনতার মাঝে। ওদের এসব অপকর্ম উপলব্ধি করেই অনেক ইসলামিক স্কলার পরিষ্কার ভাষায় বর্তমানে রোহিঙ্গাদেরকে সাহায্য করার প্রয়োজন নাই বলেছেন।

নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সংস্থা,সংবাদ মাধ্যম এবং ব্যক্তির তথ্য মতে শুধুমাত্র আইন শৃঙ্খলা নয় প্রাকৃতিক,অর্থনৈতিক,সামাজিকসহ কক্সবাজারের সমকালীন পরিবেশের সর্বত্র বিরুপ প্রভাব পড়ছে এদের কারণে। কক্সবাজারের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো তো আছেই, জাতীয় সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে চোখ বুলালেও প্রায় প্রতিদিনই আমরা রোহিঙ্গাদের এমন সংবাদ দেখতে পাই।শুধুমাত্র গত চার বছরে বন ও পাহাড় কেটে রোহিঙ্গারা নিজেদের বসতি গড়ে তোলায় কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সৃজিত আর প্রাকৃতিক বন এই দুই রকম বনের ধ্বংস হয়েছে প্রায় দশ হাজার (১০০০০) একর বন । একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় এই রোহিঙ্গাদের কারণে সৃজিত বন,প্রাকৃতিক বন এবং জীববৈচিত্র্যের সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। যা অর্থের মূল্যে হিসাব করলে প্রায় ৫০০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। এখানেই শেষ নয়। পাহাড় কেটে ওদের জন্য কিছুদিন পর পর কখনো ক্যাম্প ইনচার্জ, কখনো পুলিশ ক্যাম্প কিংবা বিভিন্ন সংস্থার অফিসের জন্য অবকাঠামো তৈরী হচ্ছে। যা বন ও পরিবেশের জন্য ব্যাপক হুমকিস্বরুপ।

যদি রোহিঙ্গারা এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করে তবে কক্সবাজার বিশেষ করে উখিয়া
-টেকনাফের বনভূমি ও বনজ সম্পদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আর,কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরিও যথেষ্ট অবনতি হবে। আমরা তাই এই রোহিঙ্গা সমস্যার অতিদ্রুত এবং স্থায়ী সমাধান চাই। লোক দেখানোর জন্য নয়, মিয়ানমার সরকারের উপর বাংলাদেশ এবং বিশ্বের সকল দেশ ও জাতিসংঘসহ আলোচিত সংগঠনগুলো থেকে জোর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানান প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে আসা সকল রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা হোক।
জয় হোক মানবতার।

তাওহীদুল ইসলাম নূরী
আইন বিভাগ (অধ্যয়নরত)
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
শাহারবিল বাজার, চকরিয়া, কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •