বদরুল ইসলাম বাদল

পনেরো আগষ্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।পঁচাত্তরের এই দিনে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় ।তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির স্বাধীনতার মহান নেতা, জাতির পিতা।বঙ্গবন্ধু মুজিব ব্রিটিশ ভারত এবং পাকিস্তান সময়ের বৈষম্যের স্বীকার বাঙালি জাতির দুঃখ,দুর্দশা,বঞ্চনা, শোষণ, নিপীড়ন সব কিছু নিজের চোখে দেখেছেন। তাই তিনি জাতিকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন।আর তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জাতি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। । কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামের যাত্রার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সাম্রাজ্যবাদীদের মদদপুষ্ট দেশীয় এজেন্ট এবং পরাজিত সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ভাড়াটিয়া বাহিনী।
স্বাধীনতা বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দীর্ঘ সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারণার কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং অধিকার নিয়ে ধারাবাহিক রক্ত ঝরা আন্দোলনের ফসল হল স্বাধীনতা। যার মহা নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।তাই ইতিহাস স্বীকৃত বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু মানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐক্য, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ। তিনি আর্তনিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ স্বর।দেশে কিংবা দেশের বাইরে যেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত কিংবা সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন সন্ত্রাস সেখানে বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত মানুষের পক্ষ হয়ে কথা বলেছেন। ভিয়েতনাম, প্যালেস্টাইন সহ যেখানে মুক্তির আন্দোলন সেখানে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সোচ্চার,বলিষ্ঠ প্রতিবাদী। তার মহত্ত্ব, মানবিকতা,,সাহস,রাজনৈতিক মেধা আর অহিংস নীতি নিয়ে প্রখর নেতৃত্বের বিকাশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে ও প্রভাবিত করে।সে নিরিখে আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, মহাত্মা গান্ধীর মত বিশ্বের প্রথম সারির নেতাদের কাতারে শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক শেক্সপিয়ার বঙ্গবন্ধু নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “এ জগতে কেউ কেউ জন্মগত ভাবে মহান,কেউ মহত্বের লক্ষণ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। আবার কেউ স্বীয় প্রচেষ্টায় মহানুভবতা অর্জন করেন।আমার মতে এই তিন টি বৈশিষ্ট্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।”
পনেরো আগষ্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর প্রচারিত হলে সারা বিশ্বে নেমে আসে শোকের ছায়া।বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ জেনে নোবেল জয়ী জার্মান নেতা উইনি ব্রানডিট গভীর শোকাহত হয়ে আবেগে বলেছিলেন, “মুজিব হত্যার পর বাঙালি জাতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না।যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে”। মিশরের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে সে হত্যাকান্ডের জন্য নিজেকে অভিযুক্ত করে আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন।আর বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে মিশরে নিযুক্ত নতুন রাষ্ট্রদূত আসাদুজ্জামান কে বলেন,”তোমরা আমার প্রিয় বন্ধু মুজিবকে হত্যা করলে? তাও আমার দেয়া ট্যাংক ব্যবহার করে! আমি নিজেকে এখন অভিশাপ দেই,কেন আমি তোমাদের ট্যাংক দিয়েছিলাম?” উল্লেখ থাকে যে স্বাধীনতার পর আনোয়ার সাদাত বঙ্গবন্ধু সরকার কে একটি ট্যাংক বহর উপহার দিয়েছিল।
ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম পাকিস্তানী জেনারেলরা হাজার পরিকল্পনা করে ও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাহস করতে পারে নাই কিন্তু এদেশীয় মীর জাফরের বংশধরেরা বঙ্গবন্ধুকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে।শুধু তাই নয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বৈরাচার জিয়ার ছত্রছায়ায় সুকৌশলে স্বাধীনতার বিরোধীরা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ কে বিলীন করার মিশনে নামে্। বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রতিষ্ঠিত সব সংস্কৃতি ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মুলমন্ত্র “জয় বাংলা” বলা বন্ধ করে।স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে নতুন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা নিয়ে এসে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে দ্বিধা বিভক্তি নিয়ে আসে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করে।পাঠ্যবই থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা হয়৷ স্বাধীনতা ঘোষণা বিতর্ক নিয়ে এসে রাজনীতিকে কলুষিত করে তোলে। শুধু তাই নয় স্বঘোষিত বঙ্গবন্ধু খুনিদের পুরস্কার হিসেবে জাপান মধ্যপ্রাচ্য,আফ্রিকা সহ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের চাকরিতে নিযুক্ত করে । মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে নানা অসংলগ্ন মন্তব্য করে,।মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রচিত সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের মত মুল মূলনীতিতে স্বৈরাচারী কোঠার চালায়।সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মূল্যবোধকে বিনাশ করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী জিয়া -এরশাদ -জোট সরকার।
তবে কেউ চাইলে ইতিহাসের সত্য কে মুছে ফেলতে
পারে না। তাই যতই দিন যাচ্ছে প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে অপপ্রচার সমূহের সঠিক ইতিহাস উন্মোচিত হচ্ছে। তাই স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী বর্ষে, এবারের শোক দিবস অতীব গুরুত্ববহ। বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষকে তার জীবনের চেয়ে অধিক ভালবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন ।বাঙালী ও বাংলার মানুষের গভীরতম ভালবাসা থেকে উত্সরিত মমতাবোধে হাসতে হাসতে নিজের জীবন দানে বিন্দু মাত্র পিছু হটেননি তিনি। 1972 সালে এক সাক্ষাৎকারে বিদেশি সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনার শক্তির উত্স কি?”বঙ্গবন্ধু সে প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমার দেশের মানুষের ভালবাসা”। আর আপনার দুর্বলতার দিকটি কি”? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালবাসি”।কিন্তু দেশের প্রতি অগাধ ভালবাসার সে মহান পুরুষটাকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি।তবে তার দেয়া স্বাধীনতা সমুন্নত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্ভর ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত শক্তিশালী করতে আজকের প্রজন্ম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বঙ্গবন্ধুর দেখা সোনার বাংলা বিনির্মানে মুক্তি যুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনা আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখাবে।
71এর পরাজিত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী 75 সালের পর মাথা চড়া দিয়ে আজ তাদের অনেক ডালপালা বেড়েছে।
তাদের এখনই পুরোপুরি রুখতে না পারলে দেশের উন্নয়ন সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হবে। তাই বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার শপথ হউক আজকের শোকের মিশিলে।শোকের মিশিল নিয়ে আসুক শক্তির উত্স। মুজিব প্রেমিদের বলিষ্ঠ কন্ঠে উচ্চারিত হউক-
“এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে” “আমরা সবাই মুজিব হবো,মুজিব হত্যার বদলা নিব”।
বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে না থাকলেও তার রেখে যাওয়া দর্শন বাঙ্গালী জাতির মুক্তির সনদ। তার রেখে যাওয়া আদর্শের আলোর মশাল নিয়ে অসংখ্য মুজিব সেনা অকুতোভয় চিত্তে এগিয়ে আসলে শোষণ মুক্ত সমাজ গঠন ত্বরান্বিত হবে। এই পর্যায়ে রবিঠাকুরের একটি কবিতা পথের দিশারি হয়ে দৃষ্টিভঙ্গিকে চাঙা করতে পারে। যেমন —
“কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যা রবি
শুনি জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি
মাটির প্রদীপ ছিল সে কহিল, “স্বামী
আমার যে টুকু সাধ্য করিব তা আমি”।
জগতের অমোঘ বিধানে সারাদিন পৃথিবীতে আলো ছড়ায়ে বেলাশেষে অস্তমিত হয়ে যায় সুর্য। তাই অন্ধকার দুর করার দায়িত্ব নিতে সূর্যের আহ্বানে কেউ রাজি হয় না দেখে মাটির প্রদীপ তার ক্ষমতার ছোট্ট ছোট্ট শিখা দিয়ে আলো জ্বালানোর দায়িত্ব নিতে রাজি হয়।তেমনি ভাবে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ নিয়ে এগিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার বাস্তবতা বেশি দুরের নয়।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: কলামিস্ট। নব্বই দশকের সাবেক ছাত্র নেতা। E-mail : badrulislam2027@gmail.com.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •