মো. নুরুল করিম আরমান, লামা:
বান্দরবানের লামা উপজেলায় গত সোমবার দিনগত রাত থেকে টানা বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে নামতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এরি মধ্যে ঢলের পানিতে প্লাবিত ও টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ৭টি ইউনিয়নে প্রাথমিকভাবে ৪ হাজার ২৫০টি বসতঘর আংশিক এবং সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে পৌরসভা এলাকার ৩ হাজার ৭৫০টি ও ৭টি ইউনিয়নের ৫০০শ বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয় ৬৮৪ হেক্টর জমির আমন বীজতলা, মৌসুমি ফসল ও ফলদ-বনজ বাগানের। এছাড়া প্রধান সড়ক সহ অধিকাংশ অভ্যন্তরীন রাস্তা ঘাট ভেঙ্গে চুরে তছনছ হয়ে গেছে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, টানা দুই দিন পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে ঢলের পানি নামতে শুরু করে। তবে পুরোপুরি পানি নেমে না যাওয়ায় অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নেয়া বন্যা কবলিতরা এখনো নিজ ঘরে ফিরতে পারেনি। আশ্রয়কালীণ সময় পানি বন্দি ও আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিতদের পৌরসভার পক্ষ থেকে ত্রাণ সামগ্রী ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়। এদিকে পাহাড়ি ঢলের পানিতে রিংওয়েল ও টিউবওয়েলগুলো প্লাবিত হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বন্যা কবলিত এলাকায়। ঢলের পানিতে পৌরসভা এলাকায় সাড়ে তিন হাজার বসতঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত ও পাহাড় ধসে ২৫০ টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া লামা সদর ইউনিয়নে ঢলের পানিতে ১৩০ বসতঘর প্লাবিত ও পাহাড় ধসে ৪টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রুপসীপাড়া ইউনিয়নে ঢলের পানিতে প্লাবিত ৩৫টি ও পাহাড় ধসে বিধস্ত হয় ৪টি বসতঘর, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে ঢলের পানিতে প্লাবিত ১০০ বসতঘরসহ পাহাড় ধসে ও বগাইছড়ি খালের ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৫টি বসতঘর, সরই ইউনিয়নে ঢলের পানির স্রোতের টানে পাহাড়ি ঝিরির উপর নির্মিত বেশ কয়েকটি কালভার্ট ভেসে গেছে, ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড় ধসে ও গাছ পড়ে ৮টি, গজালিয়া ইউনিয়নে ঢলের পানিতে ২০০ বসতঘর প্লাবিত হয়েছে। লামা-আলীকদম-চকরিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থান থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় উপজেলার সঙ্গে আলীকদম এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। পাহাড়ি স্রোতের টানে লামা-ফাঁসিয়াখালী সড়কের ইয়াংছা ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অপরদিকে বিভিন্ন স্থানে সড়ক ধসে পড়ে, পানি স্রোতের টানে ও সড়কের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচলে দারুণ ব্যঘাত ঘটছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানরা। এছাড়া উপজেলায় ৬৮৪ হেক্টর জমির আমন বীজ তলা, মৌসুমি ফসল ও ফলদ বনজ বাগানের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা সানজিদা বিনতে ছালাম।

এদিকে পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত আবুল হোসেন, জাকির হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান ডন, মো. সেলিমসহ আরো অনেকের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই ৪-৫ বার বন্যা শিকার হতে হয় পৌর শহরের হাজার হাজার মানুষকে। বন্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন ব্যবস্থা গ্রহন করছে প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিরা। ফলে চীনের দু:খ যেমন হোয়াংহু, এখন লামা শহরের মানুষের দু:খ মাতামুহুরী নদী। এ দু:খ দূর করতে প্রস্তাবিত মাতামুহুরী নদীর গতি পরিবর্তন চায় ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে লামা পৌরসভা মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, টানা বর্ষণের শুরুতেই ঢলের পানিতে ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ পৌরবাসিদেরকে যথাসময়ে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। এরপরেও ঢলের পানিতে ও পাহাড় ধসে সাড়ে ৩ হাজার ৭৫০টি ঘরবাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পৌরসভার পক্ষ থেকে ৩টি অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রসহ বন্যা কবলিতদের মাঝে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরন করার পাশাপাশি পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ন সড়ক সমূহ ও অলিগলিতে জমে থাকা পলি ও ময়লাআবর্জনা অপসারণ করার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

ঢলের পানিতে ও পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতির সত্যতা নিশ্চিত করে লামা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা জামাল জানান, চার দিনের টানা বর্ষণের ফলে উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ও পাহাড় ধসে অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ভেঙ্গে পড়েছে। এছাড়া ফসলি জমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •