ছৈয়দ আলম :
মোটরসাইকেলে চালকের পেছনে অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে বসা এক যুবক। গন্তব্য কক্সবাজার শহরের তারাবনিয়ারছড়া এলাকায়। করোনার উপসর্গে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া রোগীর জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন-তখন ১৪ জুলাই দিনের বেলায় অক্সিজেন ব্যাংকে দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবীরা সবাই দুপুরের খাবার খেতে ব্যস্ত। এমন সময় হটলাইন নাম্বারে ফোন আসে অক্সিজেনের প্রয়োজনে।

দেরি না করে প্রধান উদ্যোক্তা ইশতিয়াক আর স্বেচ্ছাসেবক শাকিল বেরিয়ে পড়লেন। অক্সিজেন ভর্তি সিলিন্ডার নিয়ে। এমন ফোনকল পেয়েই অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে ছুটে যান। করোনার চলমান ঢেউয়ের শুরু থেকেই এ কার্যক্রম চলছে। এই কর্মসূচির উদ্যোক্তা কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য ও কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয়। বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার সব ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম চলছে তবে কয়েকদিনের মধ্যে শহরের পাশর্^ ঝিলংজা ও খুরুশকুল ইউনিয়নে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা চালু হবে।

এর আগেরদিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কল করে বিনামূল্যে অক্সিজেন পেয়েছেন মোহাজের পাড়ার করোনা আক্রান্ত মো. জালাল। গভীর রাতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাসেবকরা অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছেন কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর উদয় শংকর পাল মিঠুর বাড়িতেও।

এ বিষয়ে উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, আমার বৃদ্ধ মা করোনা আক্রান্ত। বাসাতেই তার চিকিৎসা চলছে। হঠাৎ করে রাতে তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যায়। আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক জানান, জরুরীভাবে অক্সিজেন দিতে হবে। কিন্তু শহরের কোথাও অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন অক্সিজেন ব্যাংকে ফোন করি। ফোন করার ৫ মিনিট পরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি অক্সিজেন নিয়ে আসে ঘরে। সময়মত অক্সিজেন দিতে না পারলে হয়তো আমার মাকে বাঁচানো সম্ভব হত না। আমি সংগঠনটির সমন্বয়ক ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

একইদিন বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে করোনা আক্রান্ত শহরের নুরপাড়ার পূষণ আঞ্জুমকে বিনামূল্যের অক্সিজেন সরবরাহ করে সংগঠনটি।

শুধু এ কয়েকজন নয়, হটলাইনে ফোন পেলেই সংগঠনের সদস্যরা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটছেন করোনা রোগীর ঘরে ঘরে।

শুধু করোনা নয় ইতিপূর্বে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে বিশে^র দরবারের আলোকিত করতে ব্র্যান্ডিং কক্সবাজার নামে সংগঠনটির উদ্যোগ নেন ইশতিয়াক আহমেদ জয়। তারই একটি কার্যক্রম কক্সবাজার অক্সিজেন ব্যাংক।

জানা গেছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর সাথে লড়তে থাকা মানুষের জীবন বাঁচাতেই গড়ে উঠেছে ‘কক্সবাজার অক্সিজেন ব্যাংক। ১ জুলাই ১৬ জন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটির বর্তমান স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। ১৪টি সিলিন্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটির পাশে দাঁড়িয়েছে কক্সবাজারের অনেক বিত্তবানরা। বর্তমানে অক্সিজেন ব্যাংকের সিল্ডিন্ডার সংখ্যা ২৪। এই ১৪ দিনে ৫২ জনকে সঠিক সময়ে বিনামূল্যে অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছেন তারা।

কক্সবাজার অক্সিজেন ব্যাংকের কো-অর্ডিনেটর এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ফলে এখন প্রচুর অক্সিজেনের চাহিদা। কোনো ব্যক্তি অক্সিজেনের অভাবে যেন মারা না যান সে জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, অক্সিজেন সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে। প্রয়োজনের সময়েই অক্সিজেন দরকার। আমরা সঠিক সময়েই বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করে সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই। এটাই হবে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার আসল পরিচয়।

কক্সবাজার অক্সিজেন ব্যাংকের প্রধান সমন্বয়ক ইশতিয়াক আহমেদ জয় বলেন, আমরা রাত দিন ২৪ ঘন্টায় সেবা দিয়ে যাব। শহরের ১২টি ওয়ার্ডের মধ্য থেকে প্রায় ওয়ার্ড থেকে অক্সিজেন ব্যাংকের জরুরি নম্বরে ফোন আসে। কখনও গভীর রাতে, কখনো বা বৃষ্টিমূখর ভোর রাতে, অক্সিজেন ব্যাংকের হট লাইনে ফোন করার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মীরা অক্সিজেন নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন। সঠিক সময়ে অক্সিজেন পৌঁছে যাওয়ায় অনেকেই প্রাণে বেঁচে গেছেন। এ ধারা অব্যাহত রাখতে চান তিনি।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ইশতিয়াক আহমেদ জয়ের ব্র্যান্ডিং কক্সবাজার নামে অক্সিজেন সেবা দারুণ সাড়া জাগিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চাপ বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে না এসে সহজে বিনামূল্যে সহযোগিতা পাচ্ছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯০ এর উপরে থাকা রোগীদের বাড়িতে তারা অক্সিজেন পৌঁছে দেন।’ তাদের এ আয়োজন আরো বৃদ্ধি পেতে সমাজের বৃত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •