বদরুল ইসলাম বাদল

দেশে আশংকা জনক হারে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মতে 08জুন199 জনের মৃত্যু হয়েছে।দেশে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় কোভিট 19 কারিগরি পরামর্শক কমিটি দেশে 14 দিনের “শাটডাউন” এর সুপারিশ করায় 01.07.21থেকে দুই দফায় 14.07.21পর্যন্ত সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। কারণ প্রাণঘাতি ভারতীয় ডেল্টা প্রজাতির ভাইরাস সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। মার্চ( 2020) প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের পর থেকে দেশে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারি ভাবে বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া করোনা সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট,স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, করোনা কালীন নাগরিক সমস্যা সমুহ তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

কোভিট19 বিশ্বের প্রথম মহামারি নয়।এর আগে ও আরো অনেক মহামারী বিশ্বে হানা দেয়। লাখ লাখ মানুষ মৃত্যু হয়েছিল ।শুধু তাই নয় জীবন জীবিকার ব্যাঘাতের কারণে দুর্ভিক্ষ ও তৈরি হয়েছিল।তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রেখে নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।2020 মার্চ মাস থেকে আজকের দিনে এই লম্বা সময়ে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বিশ্বের অনেক দেশে কিছু সুনির্দিষ্ট বিধিমালা অনুসরণের ফলে সংক্রমনের বিস্তার রোধের অভাবনীয় ফল পাওয়া গেছে । যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া সহ অনেক দেশ। তবে বিধিমালা কিংবা বিধিনিষেধ এই ভাইরাসের সংক্রমণের শেষ পন্থা নয়।সংক্রামক ব্যধি বিশেষজদের মতে দেশের শতকরা আশিভাগ মানুষের টিকা নেয়ার আগ পর্যন্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণের টিকা অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।সবাইকে টিকার আওতায় আনা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।তাই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিশেষজ্ঞগণ মাক্স পরা সহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সর্বোচ্চ পরামর্শ দিয়ে আসছেন ।মহামারী শুরুর পর থেকে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মাক্স পরা নিয়ে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হলেও জনগণ তেমন সচেতন হয় নাই।মাক্সপরা নিয়ে নানা ঠুনকো যুক্তি দিয়ে বাস্তবতা এড়িয়ে যাচ্ছে ।ফলে মহামারির ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকার লকডাউনের মতো সীদ্ধান্ত দিতে বাধ্য হচ্ছে।তাতে দেশের গতিশীল অর্থনীতি স্থবির হবার পথে।সরকারের নেয়া 2041ভিশন বাস্তবায়ন ব্যাহত নিয়ে চিন্তিত কতৃপক্ষ।

এ পর্যায়ে রবিঠাকুরের একটি কবিতার গল্প উপস্থাপন করা যায়।একদেশে এক রাজা।প্রতাপ,প্রতিপত্তি আর,আধিপত্য জগত জোড়া। রাজা একদিন ভাবতে লাগলো এত বড় রাজা হয়েও পা জমিনে রাখলে কেন মলিন ধুলা পায়ে লাগে।প্রজাদের মতো। তাহলে রাজা প্রজার মধ্যে পার্থক্য কোথায়।তাই মন্ত্রীকে পায়ের ধুলা সমস্যা সমাধানের কড়া নির্দেশ জারি করে রাজা।নির্দেশ পেয়ে মন্ত্রী এবং পরিষদ বর্গ নিয়ে পরামর্শ করে পুরা দুনিয়ায় ঝাড়ু দিয়ে ধুলো দুর করার সীদ্ধান্ত নেয়।
ডাকা হল ঝাড়ুদার হাজারে হাজার। ঝাড়ু দেয়া শুরু হতে ধুলায় আকাশ ঢেকে গেল। দিনের বেলায় ও দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল। ধুলোর কারণে মানুষের সর্দিকাশি আরম্ভ হল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল।চোখ খুলতে পারে না ধুলোর কারণে। অবস্থা দেখে রাজা আরও রেগে যায় ।মন্ত্রীকে ধুলো বন্ধ করার জন্য আদেশ করে। মন্ত্রী আবার ও সভাসদ নিয়ে ধুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা নিয়ে বসে। ডাক পড়ে রাজ্যের সব ভিস্তিওয়ালার।তারা পানি সেচে ধুলোয় মেরে দুর করার কাজ শুরু করে ।তাতে হিতে বিপরীত হয়ে ধুলা সব কাদা হয়ে যায়।পথ ঘাট হাঁটার অযোগ্য হয়ে পড়ে।সমস্যা আরও বড় হয়ে যাওয়ায় রাজা মন্ত্রীকে সমস্যা সমাধানের কড়া তাগিদ করে।
তারপর আবার সভা বসলো। সীদ্ধান্ত হল পুরো রাজ্যে চামড়া দিয়ে ঢেকে দেয়া।নিয়ে আসা হল সব মুচিদের।তখন মুচির দল পুরো রাজ্য ঢেকে দেওয়ার মতো চামড়া জোগাড় হবে না বলে অপারগতা জানায়।সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়ে রাজার অগ্নিঝরা চেহারা দেখে ভয়ে তটস্থ।তখন শেষে এক বৃদ্ধ মুচি ভয়ে এগিয়ে এসে রাজা এবং সভাসদের অনুমতি নিয়ে চামড়া দিয়ে শুধু রাজার পা দুটি ঢেকে দিলো।দেখা গেল রাজার পায়ে আর ধুলোয় মলিন হচ্ছে না।সামান্য কাজ দিয়ে জটিল একটি সমস্যা সমাধান আসলো। সমাধানের জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ হল।জনগণের কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে গেল। ব্যর্থ হল মন্ত্রী পরিষদ,বুদ্ধিজীবি,বিশেষজ্ঞ সবাই। শেষে একটি ছোট্ট উপায়, বিপদ থেকে পরিত্রাণ মিলল সবার।

বাংলাদেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবস্থা দেখে এই জুতা আবিষ্কার কাহিনি থেকে কিছু শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের মন্ত্রী বিশেষজ্ঞ গণ ঐ রাজার মন্ত্রী বিশেষজ্ঞদের মত ব্যর্থ হয় নাই।করোনা ভাইরাস স্বাভাবিক ভাবে নাকমুখ দিয়ে বাতাসের সাথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।তাই নাকমুখ ঢেকে নিতে মাক্স পরার জন্য এবং স্ব্যাস্থবিধি মেনে চলা নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিদিন জনগণকে মাক্স ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করছেন,উপদেশ দিচ্ছেন “আজ ধৈর্য ধারণ করে সারাক্ষণ মাক্স পরে থাকলে হয়ত কাল করোনা থেকে বেঁচেও যেতে পারি আমরা” করোনাকে জয় করতে মাক্স পরা ছোট্টএকটি পদক্ষেপ।কিন্তু মানুষের মনে কোন সচেতনতা তৈরি হয় নাই রাস্তাঘাটে হাটবাজারে দেখা যায় মানুষের মাঝে মাক্স ছাড়া নির্ভয়ে চলাচল।গন পরিবহন, টমটম রিক্সায় নিশ্চিন্তে যাচ্ছে। যেন দেশে মহামারির কোন অস্তিত্বও নাই। সংবাদপত্র হকার কল্যাণ কক্সবাজার সভাপতি হকার মোস্তফা কামালের সাথে কথা বলে জানা যায়, সকাল থেকে সারাদিন সংবাদ পত্র ফেরি করার সময় দেখে প্রশাসনের নজরদারি ছাড়া কম সংখ্যক মানুষকে সচেতনভাবে মাক্স নিতে। তাই বলা যায় ঐ রাজার মন্ত্রী সভাসদের অনভিজ্ঞতার এবং দূরদৃষ্টি চিন্তার অভাবের কারণে রাজার জনগণ কষ্ট পেয়েছিল।প্রজাদের কারণে নয়। কিন্তু আমাদের দেশের জনগণ সরকারি নির্দেশনা স্ব্যাস্থবিধি মেনে চলা এবং ঘরের বাইরে মাক্স ব্যবহার না করার কারনে অনেকটা বর্তমানের মহামারির ভয়াবহ পরিস্থিতি হিসেবে মনে করে সচেতন মহল।

মাক্স পরার অবহেলা থেকে আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি। তাই লকডাউন শাটডাউন নিয়ে পরিকল্পনা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানোর পরও কথা না শুনার জন্য এই সমস্যার দায় জনগণ এড়াতে পারে না।তবে প্রশাসন চাইলে আরও কঠোর হতে পারতো।বিধিনিষেধ পালনের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করে বাধ্য করতে পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি নাও হত।বিশ্বে করোনা মোকাবিলা করে বেরিয়ে আসা দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝা যায়, মাক্স পরা সহ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চললে লকডাউন প্রয়োজন হয় না।
প্রতিবেশী দেশ ভারত সহ বিশ্বের দেশে দেশে করোনা ভাইরাসের কারণে চলছে লকডাউন।স্তব্ধ হয়ে গেছে বিশ্ব অর্থনীতির গতি। এভাবে চলতে থাকলে খাদ্য এবং ঔষধের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (WHO) হুশিয়ারি দিয়ে রাখে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা নিয়ে ।এই মুহূর্তে জীবন বাঁচনোর পাশাপাশি জীবন যাত্রা ও এক সাথে চালানোর জন্য মেনে চলতে হবে সরকারি নীতিমালা। অভ্যাসে পরিণত করতে হবে মাক্স ব্যবহার।এ নিয়ে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টির লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ যতটা সচেতন হবে তত দ্রুত মহামারি মোকাবিলা করে জয়ী হওয়া যাবে।

লকডাউন কিংবা শাটডাউনে স্থবির হয়ে যাবে ব্যবসা বানিজ্য।বন্ধ হয়ে যাবে দিনমজুর,হকার সহ সল্প আয়ের মানুষদের জীবিকার পথ।তাই প্রশাসনের উচিত খাদ্যের সরবরাহ করা। যাদের খাবারের সমস্যা তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা।
স্বাধীনতার সুবর্ণ রজতজয়ন্তী এবং মুজিব বর্য ঘিরে উন্নয়ন সমৃদ্ধির পথে গতিশীল অর্থনীতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। করোনা মুক্ত হয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে আসুক পৃথিবীর। জয় হউক বাংলাদেশের। জয় বাংলা।

লেখক: কলামিস্ট, নব্বই দশকের সাবেক ছাত্র নেতা
ই- মেইল badrulislam@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •