নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাামের বাঁশখালী উপজেলার দক্ষিণে অবস্থিত উপকূলীয় ছনুয়া ইউনিয়ন। উপকূলীয় এই ইউনিয়নে অধিকাংশ মানুষেরা লবণ চাষ, মৎস্য চাষ ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ পেশায় জড়িত রয়েছেন। সেখানে কোনো দুর্ঘটনা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা হলে খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেতে সময় লাগে প্রায় ২-৩ ঘন্টা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছনুয়া ইউনিয়নের নিরীহ লোকজনকে জিম্মি করে দখল, চাঁদাবাজি, হত্যা, সালিশ বিচারের নামে মারধর করে জিম্মি করে চাঁদা আদায়, ধর্ষণ, ডাকাতি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সেখানে—এমন অভিযোগ উঠেছে ছনুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ ও তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে।

সূত্র বলছে, হারুনুর রশীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকা ছেড়েছেন অনেকেই। সেখানে জায়গা-জমি দখল, তাদের হাতে প্রাণ হারানো সহ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে অনেকেই। তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো মামলা করলে উল্টো ভুক্তভোগীর উপর আসে সন্ত্রাসী তাণ্ডব। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করেনা অনেক নিরীহ মানুষ।

গেল বছরের ২ আগস্ট জন্মনিবন্ধন ইস্যু করতে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার বিষয় নিয়ে ‘প্রতিবেদন’ প্রকাশ করার জের ধরে একুশে পত্রিকার বাঁশখালী প্রতিনিধি বেলাল উদ্দিনকে অপহরণ করে হারুন বাহিনীর সদস্য আশেক, মিয়া হোসেন, ছৈয়দুল মোস্তফা প্রকাশ বাক্কা, এমদাদ, নজরুল সিকদার, শাহাবুদ্দিন রাকিব, আশরাফ হোসাইন। এ ঘটনায় ৫জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তারা জামিনে পার পেয়ে আবার ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে।

অভিযুক্ত হারুনের অন্যান্য সহযোগিরা হলেন, দুর্ধর্ষ ডাকাত ৮ মামলার আসামি ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. ইউনুছ, চেয়ারম্যানের ভাই ৮ মামলার আসামি মো. আলমগীর, ছোটভাই আবদুল আজিজ টিপু।

ছনুয়ার আইনজীবি আতার উল্লাহ চৌধুরী, আব্দু ছবুর, মো. সরোয়ার, মোজাম্মেল হকসহ একাধিক ব্যক্তিরা অভিযোগ করে বলেন, ‘সন্ত্রাসী হারুন ২০১৭ সালের ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার পর থেকে তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বহুমাত্রায় বেড়ে গেছে এলাকায়। মানুষের পৈত্রিক জমি, ১২ হাজার ২২৫ শতক চিংড়ি ঘের, লবণ মাঠ দখল করে ৮ মামলার আসামি দুর্ধর্ষ ডাকাত মো. ইউনুছ মেম্বারকে পাহারায় বসিয়েছেন। ২০১৮ সালে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাতে পরিষদের অন্য মেম্বারদের অমতে প্যানেল চেয়ারম্যানও বানানো হয় ইউনুছ মেম্বারকে। ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর সন্ত্রাসী ইউনুস র‌্যাবের হাতে গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। বর্তমানে তিনি জেল হাজতে আছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপকূলীয় বনবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, হারুন চেয়ারম্যান উপকূলীয় বনবিভাগের ছনুয়া রেঞ্জের একশ কানি জায়গা দখল করে রেখেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাকেও একবার অপহরণ করেছিল। চেয়ারম্যান বাহিনীর উপর্যুপরি কয়েকদফা হামলায় আমি দীর্ঘদিন হাসপাতালে মৃত্যু শয্যা থেকে প্রাণে বেঁচে পৈত্রিক ৩৮০ শতক জায়গা-জমি হারিয়ে উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিয়েছি। এরকম অসংখ্য মানুষের নিরব কান্নায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে অনেকেই। মামলা-হামলা করে ও আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করে মুক্তি মেলেনা গ্রামবাসীর। তার বাহিনীর নকল স্বর্ণ ব্যবসা, সাগরে জেলেদের আটকে চাঁদা আদায়, জলদস্যুতা, মানবপাচার, এলাকায় বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় করা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।’

‘এছাড়া চেয়ারম্যান হারুনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজি ও দখল করে ২০১৭ সালে ৫ কোটি টাকা খরচ করে ছনুয়ায় ১৫০ শতক জায়গার উপর নির্মাণ করেছে একটি বহুতল ভবন। নানামুখি সন্ত্রাসী তাণ্ডবে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসীর দেয়া অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব অভিযান চালালে ২০১৯ সালে তার বাহিনীর অন্যতম সদস্য বহু মামলার দুর্ধর্ষ ডাকাত সোলতান বাহাদুর প্রকাশ বাহাদুর ডাকাত, নুরুল আলম, মো. হোসাইন ও আবু তালেব সহ চারজন ডাকাত র‌্যাবের ক্রস ফায়ারে নিহত হয়। কিন্তু গডফাদার এই তিনজন এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে’—যোগ করেন ওই শিক্ষক।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় ১২ বছরের কাজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগের মামলাসহ প্রায় ১২ টি মামলা রয়েছে চেয়ারম্যান মো. হারুনের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি। এছাড়া তার সহযোগিদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা ও অভিযোগ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল করা হলে ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশীদ বলেন ‘প্রতিপক্ষের লোকজন আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। আমাকে প্রশাসনের কাছে শত্রু বানানোর অপকৌশল চালাচ্ছে।’ —বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত ৫ বছরে ছনুয়ায় র‌্যাবের ক্রসফায়ারে চারজন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার পর সেখানে সেখানকার পরিবেশ অনেকটা ভাল ছিল। সম্প্রতি আবার সেখানকার পরিবেশ আবার উত্তপ্ত করার সুযোগ তৈরি করছে সন্ত্রাসীরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •