তোফায়েল আহমদ 

কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরটিতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি লেগেই রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে সরকারি রাজস্ব আয়ের মাসিক এবং বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া থাকলেও নানা অজুহাতে সেই লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয় না। সর্বশেষ স্থলবন্দরটি নিয়ে পিলে চমকানো একটি তথ্য দিয়ে টেকনাফের স্থলবন্দরের একজন সিআইপি মানের ব্যবসায়ী একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আবদুস শুক্কুর (Abdus Sukkur) (cip) নামের ওই ব্যবসায়ী তাঁর ফেসবুক আইডিতে বুধবার (৩০ জুন) সন্ধ্যায় বন্দরের অভ্যন্তরে শ্রমিকদের ঘামের টাকা আত্মসাতের বিষয়ে দেওয়া স্ট্যাটাসটি ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীকে শ্রমিক হিসাবে না রেখে রোহিঙ্গাদের সস্তা দামে শ্রমিক নিয়োগ করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

আবদুস শুক্কুর সিআইপি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টেকনাফ পৌর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। ব্যক্তিগত পরিচয় হিসাবে তিনি উখিয়া-টেকনাফ আসনের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ছোট ভাই। তিনি ফেসবুক আইডিতে গতকাল সন্ধ্যায় টেকনাফ স্থলবন্দর নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। স্ট্যাটাসটি রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছে। বুধবার রাত ১১টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখাকালীন সময়ে মাত্র তিন ঘণ্টায় স্ট্যাটাসটি বহু ফেসবুক ব্যবহারকারীরা তাতে লাইক দিয়ে শেয়ার করেছেন এবং মন্তব্যও করেছেন।

বন্দরের এই ব্যবসায়ী তাতে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেছেন। যেটি তদন্ত করা হলে হয়তোবা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। সেই সঙ্গে মিয়ানমার সীমান্তের নাফনদী তীরের এই স্থলবন্দরটিতে গত দুই যুগ ধরে বাস্তবে কি ঘটছে সেই রকমেরও ভয়াল তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। দেশের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটির অভ্যন্তরে যে ভয়াল দুর্নীতির তথ্য নিয়ে সিআইপি ব্যবসায়ী স্ট্যাটাসটি দিয়েছেন তা নিচে হুবহু ছাপিয়ে দেওয়া হলো।

‘আমি একজন টেকনাফ স্থলবন্দরের ছোট মানের ব্যবসায়ী। আমি অভিযোগ করতেছি যে, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও লেবার মাঝিদের সীমাহীন দুর্নীতি করতেছে। যেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকার থেকে লীজ নেয়, সেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ মালামাল লোডিং আনলোডিং করা হয়। ব্যবসায়ীরা মালামালের লোডিং আনলোডিং-এর সম্পূর্ণ খরচ সিএন্ডএফকে দিয়ে দেন। লেবারের অতিরিক্ত টাকা চার্জ করার কারণে, ব্যবসায়ীদের সিএন্ডএফ খরচও বেশি হয়। এ সপ্তাহে আমার ব্যক্তিগত ১৫টি পেঁয়াজের গাড়ি হয়। প্রতি গাড়িতে ৮৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। মালামাল লোডিং আনলোডিং-এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের।

আমি যখন বন্দর ম্যানেজারকে জিজ্ঞাস করলাম, আমাকে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ লেবারের সম্পূর্ণ টাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। তারপরে বন্দরের লেবারের মাঝিকে জানাইলে, মাঝি আমাকে বলে বন্দর লেবারের যেই টাকা দেয়, তা আমাদের ল্যাভারের চা খাওয়ার পয়সাও হয় না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করার পরে বন্দর কর্তৃপক্ষ মজুরি হিসাবে জনপ্রতি ২৬০ টাকা করে দেয়। প্রতি গাড়িতে ৮৫০০ থেকে ৯০০০ টাকা করে নেয়। সেখানে প্রতি গাড়িতে লেবারদেরকে দেওয়া হয় মাত্র ৩০০০ টাকা। বন্দরে দৈনিক ১২০ থেকে ১৫০টি গাড়ি হলে, এখন চিন্তা করে দেখেন কি পরিমাণ দুর্নীতি করতেছে আপনারা দেখেন। এই অভিযোগগুলো বন্দরের সিএন্ডএফ-এর সভাপতি ও সেক্রেটারিকে জানানোর পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বন্দরে দুটি গেট থাকার পরেও একটি গেট ব্যবহার করার কারণে প্রচুর যানজট হচ্ছে। সকালে গাড়ি লোড করার পরেও সন্ধ্যার সময় গাড়ি বাহির হতে পারে না, তাই ব্যবসায়ীদের মালামালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বন্দরে এ অবস্থা চলমান থাকলে আমরা ব্যবসায়ীরা কিভাবে ব্যবসা করব। তাই আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করি।’

ব্যবসায়ী আবদুস শুক্কুরের এই স্ট্যাটাসটিতে মন্তব্যকারীরা প্রায় সবাই সাধুবাদ দিয়ে তাঁকে সত্য কথা বহুদিন পরে হলেও বলার জন্য ধন্যবাদও দিয়েছেন। অনেকেই বিষয়টি দুদকের আওতায় তদন্তেরও দাবি করেছেন। স্ট্যাটাসের মূল কথা হচ্ছে-ব্যবসায়ীরা বন্দরে জিন্মি হয়ে রয়েছেন। তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে মাল উঠানামার টাকা গাড়ি প্রতি ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার করে দিয়ে ফেলেন। কিন্তু মাল উঠানামার কাজে যেসব শ্রমিক থাকে তাদের বঞ্চিত করে দুর্নীতিবাজরা দৈনিক ৭ থেকে ৯ লাখ টাকা লুটে নিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, প্রতি গাড়ি ব্যবসায়ীরা ৯ হাজার টাকা শ্রমিকের জন্য দিলেও শ্রমিকদের গাড়ি প্রতি দেওয়া হয় মাত্র তিন হাজার টাকা করে। অর্থাৎ গাড়ি প্রতি ৬ হাজার টাকার হিসাব কেউ পায় না।

বন্দরে দৈনিক কমপক্ষে ১৫০ গাড়ি মালামাল পরিবহন করা হয়। প্রতি গাড়ির শ্রমিকদের বাবদ যদি ৬ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত থাকে তাহলে দৈনিক ৯ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। আর যদি কমসংখ্যক দৈনিক ১২০ গাড়িও হয় তাহলেও ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা শ্রমিকদের না দিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে। এভাবে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার কেবল শ্রমিকদের ঘামের টাকা চুষে নেওয়া হয়। অথচ এ পরিমাণ টাকা নিয়ে এ যাবৎকালেও কোনো ব্যবসায়ী বা সিএন্ডএফ এজেন্ট থেকে শুরু করে স্থানীয় কেউই মুখ খুলেনি।

বুধবার রাতে এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে একাধিকবার বন্দরের জেনারেল ম্যানেজার জসিম উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভড করেননি। এমনকি ম্যাসেজে পরিচয় দেওয়ার পরেও কোনো জবাব দেননি। এ বিষয়ে সিএন্ডএফ এজেন্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বাহাদুরের সঙ্গে কথা বললে তিনিও জানান, আমরা সকল ব্যবসায়ী জিম্মি বন্দরের কাছে। আমরা টাকা দিচ্ছি শ্রমিকদের জন্য কিন্তু শ্রমিক হিসাবে স্থানীয়দের না নিয়ে রোহিঙ্গাদের এনে তাদের দৈনিক নামকাওয়াস্তে কিছু ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করা হয়।

তবে বন্দরের শ্রমিক ঠিকাদার নজরুল ইসলাম বুধবার রাতে মোবাইলে আলাপকালে জানান, স্থানীয় লোকজনকে শ্রমিক হিসাবে পাওয়া যায় না। তাই শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের আনতে হয়। রোহিঙ্গাদের শিবির থেকে আনতেও কিছু টাকা পয়সা খরচ করতে হয়। তিনি শ্রমিকদের নামে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কথা এক পর্যায়ে স্বীকার করে বলেন- ‘কি করার আছে বলুন, প্রায় প্রতিদিনই নানা সরকারি-বেসরকারি লোকজন বন্দরে পরিদর্শনে আসেন। তাদের তো খুশি করতে হয়। এমন খুশিতে তো কিছু নয়-ছয় করা লাগে। তদুপরি আমাদের অফিস আছে। সেখানে কর্মচারী আছে। তাছাড়া আমাকেও তো মাসিক ২০/৫০ হাজার টাকা আয়-রোজগার করা দরকার। সবচেয়ে বেশি খরচ হয়, পরিদর্শক এবং শিবির থেকে দৈনিক ২০০/২৫০ জন রোহিঙ্গা বের করে আনা।’

এভাবে মাসে কমপক্ষে কয়েক লাখ টাকার ম্যানেজতো করা হয়ে থাকে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া দৈনিক ৭/৯ লাখ টাকা একজন শ্রমিক সরবরাহকারী ঠিকাদারের পকেটে যাবার বিষয়টিও সঠিক কিনা তা অবশ্য জানা গেল না। প্রতি মাসে শ্রমিকদের নামে অতিরিক্ত আদায় করা এ পরিমাণ পিলে চমকানো দুর্নীতির বিষয়টিও চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু এ বিষয়ে কেউ এতদিনেও মুখ খুলেননি। এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি করছে এলাকার লোকজন।

–  কালেরকন্ঠ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •