আনম রফিকুর রশীদ

অধৈর্য সময়ের অস্থির কাঁটা দিকহারা পথে দৌড়ে নিশ্চল,
নিস্তেজ স্নায়ু মনের জোরে শ্যেন চোখে আকাশ দেখে;
কুয়ালালামপুর থেকে কুর্মিটোলা কয় ঘন্টার পথ? পোহায় না অপেক্ষার প্রহর।

অবশেষে, স্বামী আসছেন, বরণে ব্যস্ত প্রবাসীর বউ।

‌উঠোনের চারপাশ ঘুরে এসে বারবার মায়ের কাছে ন্যান্সির একই প্রশ্ন
“বাবা কখন আসবে মা, আমার বান্ধবীরা এসেছে ফুল নিয়ে, বলেছে, হেডস্যারও আসবেন।”
“তুমি কি তোমার বাবাকে চিনতে পারবে? তুমি তো কখনো দেখনি তাকে।”
“ওমা! চিনতে পারব না কেন? ভিডিও কলে যার সাথে কথা হয় দিনরাত তাকে চিনব না!
ছয়মাস ধরে আমার জন্য শপিং করেছেন বাবা;
চেইন, চূড়ি, মেকআপ কতোকিছুই, বলেছেন, আসার সময় নিয়ে আসবেন সবই।”

বালিশের নিচে মোবাইলে বেজে ওঠে রিংটোন; এরি জন্যে এতক্ষন উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি।
“মা, বিমান ল্যান্ড করেছে, এক ঘণ্টার মধ্যেই আব্বুকে রিসিভ করব ইনশাল্লাহ।”
ছেলের মেসেজ পেয়ে মায়ের উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে।

জায়নামাজে সেজদা রত বৃদ্ধা শাশুড়ি; নাওয়া খাওয়া বন্ধ।
উঠোনে শশুর ঠাকুর, এক হাতে লাঠি অন্য হাতে তসবি; বিচলিত পায়চারি।

শিক্ষিত বেকার ছেলে অভাব কারে বলে বিয়ে করে বুঝে,
স্বর্ণালঙ্কার বেচে বিদেশ গিয়ে সংসারের হাল ধরে;
ভাইবোনের ভরণপোষণ, আত্মীয়-স্বজনের প্রয়োজনে যথেষ্ট উদার।
‘অনেক হয়েছে, এবার চলে এসো, বাবার আদর পেতে পাগলী মেয়েটা অস্থির।”
“আর কিছুদিন ধৈর্য ধরো সোনা, ঘরের উপর তলার এখনও ফিনিশিং বাকি;
ছেলের চাকুরি, ন্যান্সির বিয়ের জন্যে অল্প জমিয়ে, তারপর একপলকে তোমার বুকে।”
“ওরা মেধাবী, আপন যোগ্যতায় স্বনির্ভর হবে;
প্রবাসীর বউদের সম্মান পড়শির পায়ের নিচে, সন্দেহের বেড়াজালে বন্দি।”
“সবাই চিলের পেছনে দৌড়ে না, লাউ ফুলের শুভ্রতার মত বউকে আমি পবিত্র জানি।”
– শোন প্রিয়তম,”তোমার কথা মনে পড়লে ভিনদেশি মেঘ নামে।”
– আমারও তাই, “তোমার কথা ভাবলে স্বদেশি বৃষ্টির জ্যামে হৃদয় গাড়ি থামে।”

খবরের পিঠে খবর নিয়ে এসে ন্যান্সির উৎপীড়ন, দাদুকে ফোন করেছে ভাইয়া, জিলানী রিসোর্টে যাত্রাবিরতি, জুমার আগে বাড়ি পৌঁছবে যথারীতি।

ছাদে আর উঠোনে লোকারণ্য, পিনপতন নিরবতায় দূর দৃষ্টি; কখন গাড়িটা আসবে?
হিতাকাঙ্খী, ননদ ননদি বসে আছে চারপাশ ঘিরে; ভাই আসার আগে মূল আকর্ষণ ভাবী।

ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে এলো সাইরেন, মৃদু শোরগোল ভারী হতে লাগলো ধীরে।
জায়নামাজ থেকে মাথা তুলে গগণবিদারী বিলাপে বেরিয়ে গেল মা।
শীতলপাটিতে উষ্ণ চাদর বিছিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে বউ।
ছেলে ইশারায় ডাকে, আব্বুকে দেখতে এখানে আসুন, আম্মু।

এম্বুলেন্সের ঝাপসা গ্লাসের ভেতরে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ছলছল দুটি চোখ।
– এভাবে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছো কেনো সুন্দর
– তোমাকে দেখার স্বাদ কখনও মিটিবে না নূরে নজর
– ডাগর চোখে তাকিয়ে মান ভাঙাতে, আমি আজ রাগ করিনি
– ষোল বছর বাইরে ছিলাম, কখনও তোমাকে ভুলিনি
– আমার ক্ষতবিক্ষত দেহে তোমার কোমল হাতে গরম জলের ছোঁয়া দিও
– দুঃখের অনলে পুড়ে আমাদের জন্য সুখের প্রাচুর্য গড়েছো, ক্ষমা করিও
নির্বাক সত্তার সবাক আত্মার সাথে অমর সংলাপ;
মানবদেহ নশ্বর, প্রেমিকের আত্মা অবিনশ্বর।

মালয়েশিয়ায় দক্ষ শ্রমিকের খাতার প্রথম পাতায় সালমানের নাম,
বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাতে বেচারার প্রাণ যায়।

স্বাধীনতার জন্য যে মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ দিয়েছিলেন তিনি শহিদ;
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য যে রেমিটেন্সযোদ্ধা প্রাণ দিলেন তিনিও শহীদ।
যিনি দেশের জন্য প্রাণ দেন, শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি,
শহিদের এই বাংলাদেশ শহিদের কাছে ঋণী।

বিদায়ের নির্মম আয়োজন সমাপন,
মুসল্লিদের মুখে দোয়া কালাম, স্বজনদের আহাজারি।
ননদীর কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে যায় আধমরা দিশাহারা বউ,
স্বামীর স্বর্গীয় বদনে পবিত্র চুম্বন।
শাদা গোলাপের পাপড়ির মত শুভ্র কাফনে গোলাপ জলের ঘ্রাণ।
প্রাণে উথলে উঠে বিষাদঢেউ, গগণ ভাঙে মাথায়, চরণ হারায় মাটি।

কত কষ্টে কত স্বপ্নে গড়া এ সুরম্য বাড়ি,
দুয়ারে এসে চলে যাবে যদি, তবে, কেনো এ ঘরসংসার!
কান্নার জলে সতী বউয়ের গড়াগড়ি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •