রিয়াজ উদ্দিন, পেকুয়া:
পেকুয়ায় মগনামা হাই স্কুল সড়কটি এখন মরণফাঁদ। গত দু’যুগের অধিক সময় থেকে গ্রামীণ জনপদের এ সড়কটিতে নেই সংষ্কার কাজ। এতে করে উপজেলার উপকুলবর্তী মগনামা ইউনিয়নের গ্রামীণ অবকাঠামোর প্রধান সড়কটি পরিনত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। সড়কের বিপুল অংশ থেকে উঠে গেছে ইট। প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ জুড়ে সড়ক থেকে মাটিও নিঃসরণ হয়েছে। লোকালয় অংশে প্রায় ১ কিলোমিটারে কিছু অংশে রয়েছে ইট। অপর অংশতে নেই ইট। খানা খন্দকে রুপান্তর হয়েছে হাই স্কুল সড়কটি এখন মৃত্যুফাঁদ। প্রতিনিয়ত মানুষ এ সড়কের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারনে সড়কটির সংষ্কার ও উন্নয়ন কাজ থেমে গেছে। হাই স্কুল সড়কটি মগনামার এক সময়ের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম।
মগনামা সৃষ্টিলগ্ন থেকে এ সড়কটি হয়েছিল। বৃটিশ আমলে অবিভক্ত মগনামা ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের প্রধান সড়ক এটি। মগনামা বাজার থেকে সড়কটি ব্যাঙওয়াল ঘোনা হয়ে মুহুরীপাড়ার মাঝখান দিয়ে বহমান। হাই স্কুল থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে গিয়ে উজানটিয়ার করিমদাদ মিয়া চৌং ঘাট পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। তবে উজানটিয়া পৃথক ইউনিয়ন হওয়ার পর থেকে এ সড়ক মগনামার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। হাই স্কুল সড়কটি নামকরণ করা হয়েছিল ১৯৯২ সালের দিকে। ১৯৯১ সালে প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস হয়। সেই সময় দুর্গত এলাকায় মানুষের যাতায়াত ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করতে ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে হাই স্কুল সড়কটি সংষ্কারকাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। সেই সময় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর মগনামা হাই স্কুলের নিকট মুহুরীপাড়া বাজার থেকে পূর্বদিকে ব্যাঙওয়াল ঘোনা হয়ে বাইন্যাঘোনা পর্যন্ত সড়কটিতে ইট বসানোর উদ্যোগ নেন। তবে মুহুরীপাড়া বাজার থেকে রুপাইখালের মাথা পর্যন্ত পশ্চিম অংশে ব্রিক সলিন দ্বারা উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। এ ছাড়াও বাইন্যাঘোনা পয়েন্টে সড়ক ও জনপদ বিভাগের রাস্তা থেকে আশ্রায়ন প্রকল্পের পশ্চিম দিকে গিয়ে ১০ চেইন পর্যন্ত পূর্ব প্রান্তেও ইট বসানো ছিল। জাফর মাস্টারের ঘোনা থেকে মোজা মিয়ার ঘোনা পর্যন্ত ১ কিলোমিটারে ইট বসানো ছিলনা। তবে ১ কিলোমিটারসহ প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটারে সড়কটিতে ব্রিক সলিন ও মাটি খনন করে উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের দিকে হাই স্কুল সড়কের ১ কিলোমিটারে পুন:সংষ্কারকাজ বাস্তবায়ন হয়। মুহুরীপাড়া বাজার থেকে মোজা মিয়ার ঘোনা পর্যন্ত ব্রিক সলিন অংশে পুন:সংষ্কারকাজ হয়েছিল। এরপর থেকে হাই স্কুল সড়কের বাইন্যাঘোনা থেকে মুহুরীপাড়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ২ যুগ ধরে আর কোন সংষ্কারকাজ বাস্তবায়ন হয়নি। সড়কটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। সাড়ে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে মুহুরীপাড়া বাজার থেকে মোজা মিয়ার ঘোনা পর্যন্ত সড়কটিতে অধিকাংশ অংশে এখন আর ইট নেই। রুপান্তর হয়েছে কাঁচা সড়কে। মুহুরীপাড়া গ্রামসহ আরও ৪/৫ টি গ্রামের অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে।
পেকুয়া কিংস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল আমিন জানান, মগনামা প্রবর্তন থেকে এ সড়কটির সৃষ্টি। কিন্তু রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর উন্নয়ন থেমে গেছে। ১ বছর আগে আমার বাবা মারা গেছেন। তিনি যখন অসুস্থ বোধ করছিলেন আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু সড়কটি এত খারাপ হয়ে গেছে যে, এর উপর দিয়ে আমার বাড়িতে এ্যাম্বুলেন্স অথবা গাড়ি নিয়ে যেতে পারেনি। আমার বাড়ি থেকে মুহুরীপাড়া বাজার পর্যন্ত ১ কিলোমিটারে সময় গিয়েছে ১ ঘন্টা। সেখান থেকে চট্টগ্রাম পৌছতে সময় লেগেছে ২ ঘন্টার চেয়ে কম। সড়কটির কারণে সঠিক সময়ে আমার পিতাকে আমরা চিকিৎসকের কাছে নিতে পারেনি। লবণ ব্যবসায়ী মো: ইউনুছ, মনির, ইলিয়াছ মাঝি, ছরওয়ার কামালসহ আরো অনেকে জানান, ২০ বছরের বেশী সময় আমরা এ সড়ক নিয়ে চরম কষ্টে আছি। সব জায়গায় উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু আমাদের এ সড়কটি চরম অবহেলিত। আমরা প্রতি বছর বর্ষার সময় নিজেরা টাকা কালেকশন করে কিছু ইট ও বালি দিয়ে থাকি।
সমাজ কমিটির সর্দার ও ইউনিয়ন আ’লীগ সহসভাপতি নাজেম উদ্দিন জানান, মগনামার মধ্যে ৫ নং ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশী অবহেলিত। মুহুরীপাড়ার মানুষগুলো আ’লীগ করে। বিএনপির শাসনের সময় আমরা আ’লীগ করি বলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হাই স্কুল সড়কের উন্নয়ন থেমে গিয়েছিল। এরপর এখন আমরা দলীয় এমপি পেয়েছি। কিন্তু এমপি সাহেবও বিএনপি চেয়ারম্যানের অনুকুলে চলে গেছে। চেয়ারম্যান ও এমপি মিলে এখন আমরা যারা আ’লীগ করি এদেরকে সবকিছুতে বঞ্চিত করছি। এখন আমরা প্রশ্ন করছি নেত্রী কি এমপি সাহেবকে বলেছেন এখানে আ’লীগ করলে রাস্তাও থাকবেনা।
ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান খাইরুল এনাম জানান, আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় একবার সংষ্কার হয়েছিল। এখানে না আসলে বুঝা যাবেনা মানুষের দু:খ দুর্দশা কি। অপরাধ একটাই পাড়ার ভোটাররা আ’লীগ করেন। স্বাধীনতার সময় যারা আমাদের সাথে বিরোধীতা করেছে এখন ওদের সন্তানরা আমাদের দলের কিছু নেতার সাথে সম্পর্ক করেছে। এরাই মগনামার সবকিছু নিয়ন্ত্রন করছে। এমপি সাহেব ধানের শীষের চেয়ারম্যানের কথায় রাস্তাটি উন্নয়নের উদ্যোগ নিচ্ছেনা।
মগনামা ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান ও ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো: আলমগীর জানান, কিছু মানুষের কুদৃষ্টির মধ্যে হাই স্কুল সড়কের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওয়াসিম চেয়ারম্যান এর জন্য দায়ী। এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যান রাজু সড়কটি উন্নয়নে বিপরীত ছিল। নাসরিন সোলতানা লিলি, মাইমুনা জন্নাত আরবি, রাকিবুল হাসানসহ শিক্ষার্থীরা জানান, আমরা পাদুকা দিয়ে হেঁটে যেতে পারিনা। সড়কের সব জায়গায় এখন পানি ও কাঁদা। মনে হচ্ছে আমরা এ রাষ্ট্রের কেউ নই। আপনারা একটু দেখতে আসেন। আমরা কত দুর্ভোগের মধ্যে আছি। গাড়ী চলাচল থেমে গেছে।
চট্টগ্রাম এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, আমার বাবা ক্যান্সার রোগী। অসুস্থবোধ করলে আমরা দ্রুত সময়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারিনা। কারণ এখন বর্ষার সময় গাড়ী চলাচল বন্ধ রয়েছে। হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করলে এ সড়কটি এ ভাবে থাকতে পারেনা।
পেকুয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, আসলে সড়কটি খুবই জনগুরুত্বপূর্ন। এটি বৈষম্য ও প্রতিহিংসার কারণে উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে আছে। এলজিইডির মাধ্যমে এর সংষ্কারের উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পেকুয়ার উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুল আলিম জানান, আসলে সড়কটির অবস্থা খুবই নাজুক। আমি একবার মোটর সাইকেল নিয়ে গিয়েছিলাম। মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •