সিবিএন ডেস্ক:
মাদকের নাম ‘ঝাক্কি’, ‘ঝাক্কি মিক্স’, ‘ককটেল মাদক’। এগুলো তৈরি করা হয় আইসের সঙ্গে ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় ওষুধের তরল মিশিয়ে। যা ইয়াবার চেয়েও ভয়াবহ।

আর এই মাদক তৈরিতে চক্রটি একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বানিয়েছিল ‘মেথ ল্যাব’। সেখানেই তৈরি করা হতো ‘ঝাক্কি’।

‘ঝাক্কি’ একবার সেবন করার পর দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত একজন মানুষ নেশারত কিংবা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে।

চক্রটি বাজার থেকে বিভিন্ন ওষুধ ও কেমিক্যাল কিনে মাদকের সঙ্গে মিশ্রণ করত। পরে পাতন পদ্ধতিতে ভেজাল দ্রব্য মিশিয়ে আইসের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ইয়াবার রং পরিবর্তন করে ‘ঝাক্কি’ তৈরি করা হতো। চক্রটি আইস ও ইয়াবার পরীক্ষামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করছিল। তারা ভেজাল ও পরিশুদ্ধ আইস সরবরাহ এবং নিজেরাও ঝাক্কি সেবন করত বলে র‌্যাব জানায়।

নতুন এই মাদক উচ্চবিত্তদের সন্তানেরা সেবন করত। এ চক্রের অন্যতম মূলহোতা তৌফিকসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৩।

বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত র‌্যাবের আভিযানিক দল গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানাধীন এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে।

গ্রেফতাররা হলেন- চক্রের মূলহোতা মো. তৌফিক হোসাইন (৩৫), মো. জামিরুল চৌধুরী ওরফে জুবেইন (৩৭), মো. আরাফাত আবেদীন ওরফে রুদ্র ওরফে ঝাক্কি রুদ্র (৩৫), মো. রাকিব বাসার খান (৩০), মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে সবুজ (২৭) ও মো. খালেদ ইকবাল (৩৫)।

অভিযানে আইস, ইয়াবা, বিদেশি মদ, গাঁজা, ১৩টি বিদেশি অস্ত্র, রেপলিকা অস্ত্র, ইলেকট্রিক শক যন্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

শুক্রবার (১৮ জুন) বিকেলে কারওয়ান বাজার র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‌্যাব সদরদফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম নতুন নতুন মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এর কারণে চক্রটি ভয়ানক মাদক আইসের সঙ্গে ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় ওষুধের তরল মিশ্রণে ‘ঝাক্কি’ তৈরি করছিল। মাদক তৈরিতে তারা একটি বাসা ভাড়া নেয়। বাসা ভাড়া নেয়ার পর তারা ‘মেথ ল্যাব’ তৈরি করে।

তিনি বলেন, ‘মেথ ল্যাবটি’ মূলত গ্রেফতার আরাফাত রুদ্র ওরফে ঝাক্কি রুদ্র ও তার কয়েকজন সহযোগীর সহায়তায় পরিচালিত হতো। তারা ভেজাল ও পরিশুদ্ধ আইস সরবরাহ ও নিজেরাও সেবন করত। এছাড়া তারা উত্তরায় একটি বাইং হাউজের নামে বাসা ভাড়া করে গোপনে মাদক সেবন ও অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। যেখানে সেবনকারী সিন্ডিকেটের একই ‘রিং’ বা পরিচিতরা আসা-যাওয়া করত।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, মাদক ব্যবসার মূলহোতা ও সমন্বয়কারী হলেন তৌফিক। অর্থ যোগানদাতা হলেন জুবেইন ও খালেদ। রুদ্র কেমিস্ট হিসেবে ‘মেথ ল্যাব’ পরিচালনা করতেন। সবুজ সংগ্রহ ও সরবরাহকারী এবং তৌফিকসহ বাকিরা সকলেই মাদক বিপণনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ চক্রে আরও ১০-১৫ জন রয়েছেন।

র‌্যাব জানায়, গ্রেফতার জুবেইন লন্ডন থেকে বিবিএ শেষ করে দেশে আসেন। তৌফিক দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করেন। খালেদ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করেন। রুদ্র ও সাইফুল এইচএসসি পাস করেন। আর খালেদ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। রুদ্রের নামে ৩টি মাদক মামলা রয়েছে ও জুবেইনের নামে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা রয়েছে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিয়ত ইয়াবা সেবনে তারা চরম আসক্তির পর্যায়ে পৌছায়। পরে ৪-৫ বছর ধরে তারা আইস গ্রহণ শুরু করে। গ্রেফতাররা বিভিন্ন সময়ে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের নেশায় উদ্বুদ্ধ করত। ক্ষেত্র বিশেষে গোপন ভিডিও ধারণ করে তাদেরকে ব্ল্যাকমেইলও করা হতো। এছাড়া তারা অস্ত্র দিয়ে ‘এমিং গেম’ জুয়া খেলত।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, তৌফিককে আমরা চক্রের মূল সমন্বয়ক হিসেবে পেয়েছি। আগে তারা ইয়াবা কারবারে জড়িত ছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই বছর ধরে নতুন মাদক আইস নিয়ে কাজ শুরু করেন। এখন ঝাক্কি প্রস্তুত করছিলেন।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, চক্রটি টেকনাফ ও রাজধানীর মিরপুর, গুলশান-বনানীর বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আইস সংগ্রহ করে সেগুলো তাদের সার্কেলে সরবরাহ করতেন। এই একটি গ্রুপের বাইরে আরও কয়েকটি ক্লোজ গ্রুপ রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। তাদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত হয়েছে।

অস্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আটক জোবেইনের এইম গেমিংয়ের নেশা ছিল। মাদকাসক্তের পর তারা এই অস্ত্র দিয়ে এইম গেমিংয়ের নামে জুয়াও খেলত। এছাড়া যারা মাদক গ্রহণের জন্য আসত তাদের ভয়ভীতি পরিদর্শনের জন্য অস্ত্র ব্যবহার করা হতো।

মাদক সিন্ডিকেট ও আইস গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান সময়ে মাদকের ধরণ ও সরবরাহের গতিপথে পরিবর্তন এসেছে। এখন সবচেয়ে আলোচিত মাদক হলো আইস। এই মাদকে আসক্ত হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে অনেকে।

র‍্যাব জানায়, আইস এক ধরনের মেথামফেটামিন মাদক যা মানবদেহে ইয়াবার চেয়েও বহুগুণ ক্ষতিসাধন করে। এটি সেবনের ফলে অনিদ্রা, অতি উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভার জটিলতা এবং মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে। শারীরিক এবং মানসিক উভয় ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই মাদকের ফলে তরুণ-তরুণীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •