ডেইলি স্টার :

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান করে আলোচনায় আসা দুদকের একজন কর্মকর্তার অনিয়ম নিয়ে ইসির বিরুদ্ধে মামলার এক ঘন্টার মাথায় বদলির ঘটনা ঘটেছে।

এই কর্মকর্তা পুরো চট্টগ্রামজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চষে বেড়িয়েছেন আর একের পর এক চমক লাগানো সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করে কুড়িয়েছেন প্রশংসা। তবে অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই তাকে বদলি করা হলো চট্টগ্রাম থেকে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর উপ সহকারী পরিচালক আলোচিত কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিনকে দুর্নীতি দমন কমিশন জেলা কার্যালয় পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ জুন) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পরিচালক মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ আদেশ দেওয়া হয়। একই আদেশে মো. শরীফ উদ্দিনসহ আরও ২১ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তার এ বদলিকে স্বাভাবিক চোখে দেখছেন না দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলকারী সংগঠকরা।

তারা বলছেন, যেখানে সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন সেখানে দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দীন ছিলেন ব্যতিক্রম। তার সাহসী অভিযান ও পদক্ষেপে দুর্নীতিবাজদের ভীত নড়ে গিয়েছিল। মূলত প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েই তাকে গণ-বদলির সিরিয়ালে ফেলে কৌশলে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে গতি কমবে আর বেপরোয়া হয়ে উঠবে দুর্নীতিবাজরা। চট্টগ্রামের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনকে চলমান রাখতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে শরীফ উদ্দীনের বদলি প্রত্যাহারের দাবি ওঠেছে।

আলোচিত দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দীন সর্বশেষ ১৬ জুন হালনাগাদ ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে অর্ন্তভুক্ত করার অভিযোগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পরিচালকসহ ইসির ৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর আগে গত ১৫ জুন রোহিঙ্গা নাগরিকদের অবৈধ উপায়ে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণের ঘটনায় ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সরফরাজ কাদের রাসেলসহ ৬ জন এবং ১২ জুন ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল বালিসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন শরীফ।

তবে ১০ জুন দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ প্রদান করায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলামের (বিএসসি) বড় ছেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য মো. মুজিবুর রহমান, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন, সাবেক ব্যবস্থাপক মো. মজিবুর রহমান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, সার্ভেয়ার মো. দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে মামলা করে আলোচনায় আসেন শরীফ উদ্দীন। এ মামলায় মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন, সাবেক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান ও সার্ভেয়ার মো. দিদারুল আলমকে গ্রেপ্তারও করে দুদক। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়।

এছাড়া তার আরও বেশ কয়েকটি আলোচিত অভিযান ছিল। তারমধ্যে ২০২১ সালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে সংলগ্ন কলাতলী বাইপাস রোড এলাকায় পুলিশ ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স (পিবিআই) অফিস তৈরির জন্য এক একর (১০০ শতক) জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতির ঘটনা উঠে আসে দুদকের এ কর্মকর্তার তদন্তে। এ ঘটনাসহ কক্সাবাজারের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জমি অধিগ্রহণের দুর্নীতিতে জড়িত বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি ও রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার করা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে চট্টগ্রামে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারি হাসপাতালের টেন্ডার কারা নিয়ন্ত্রণ করে, হাসপাতালে টেন্ডারবাজি, বদলি, নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে কারা জড়িত, বেসরকারি হাসপাতাল কারা পরিচালনা করছেন, ওই সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের যাবতীয় কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা এসব বিষয় তদন্তে নেমে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও কয়েকটি মামলাও করেছিলেন শরীফ উদ্দীন।

এ বছরের মার্চে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে খালাসি পদে ১৯ জনকে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এক কোটি ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে পূর্বাঞ্চলের সাবেক মহাব্যবস্থাপকসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন শরীফ উদ্দীন। একই মামলায় দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত খালাসি, ঠিকাদার, স্কুল শিক্ষক, পিয়ন, রেলের ড্রাইভারসহ আরও ৮ জনকে আসামি করা হয়।

একই মাসে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেতে সহায়তা ও জালিয়াতি করে জন্ম নিবন্ধনের মামলায় কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর মিজানুর রহমান, সাবেক কাউন্সিলর জাবেদ কায়সার নোবেল, রফিকুল ইসলাম এবং পৌরসভার জন্ম নিবন্ধন শাখার অফিস সহকারী দিদারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারও আগে জানুয়ারিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় দুর্নীতি ও নানা অনিয়মে জড়িত থাকা একজন শীর্ষ দালাল ও সাবেক একজন সার্ভেয়ারকে আটক করেছিলেন আলোচিত দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দীন।

সাম্প্রতিক দুর্নীতি বিরোধী ঘটনার জেরে শরীফ উদ্দীনকে বদলি করা হয়েছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ। এমন ঘটনায় দুদকের মত সংস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে মনে করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী জানান, ‘ক্ষমতাশীলদের আইনের আওতায় আনার কারণেই তাকে এই ফল ভোগ করতে হচ্ছে এমনটা মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদিও সরকারি চাকরিতে বদলির নিয়ম আছে। তবে সাবেক মন্ত্রীপুত্র ও বেশ কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার পর এই কর্মকর্তাকে বদলি করা একেবারে উচিৎ হয়নি। এতে করে কর্মকর্তাদের মনোবলে আঘাত লাগে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যদি এই বদলিটি রুটিন ওয়ার্কও হয় তবু দুদকের এই বদলি আদেশ দেওয়া উচিত হয়নি। এই সময়ে তার বদলির ঘটনাটি সময়োপযোগী ও যুক্তিযুক্ত হয়নি। স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ন্যায়-গণতন্ত্রের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ অবশ্যই হুমকি স্বরূপ।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •