সাজন বড়ুয়া সাজু :

উখিয়া উপজেলায় করেনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে,সাথে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।
সংক্রমণ রোধে উখিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়ন রাজাপালংয়ে কয়েকটি ওয়ার্ড রেডজোন ঘোষণা ও পাঁচটি রোহিঙ্গা শিবিরে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হলেও তা পালিত হচ্ছে যেন ঢিলেঢালাভাবে।
সড়কে চলছে ছোট–বড় অসংখ্য যানবাহন। কাঁচাবাজার,দোকানপাট, মুদিরদোকান গুলোতেও মানুষের ভিড় দেখা যায়। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর প্রবেশমুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারা থাকলেও শিবিরের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই।

জানা যায়, ৬ জুন উখিয়া ও টেকনাফের কঠোর লকডাউনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। একই সঙ্গে সময়সীমা শেষ হচ্ছে বিভিন্ন বিধিনিষেধেরও। এই সময়সীমা বাড়ানো হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ জানায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের সিদ্ধান্তে ২৩ মে থেকে সীমান্তের দুই উপজেলা টেকনাফ ও উখিয়াতে কঠোর লকডাউন করা হয়। দুই উপজেলায় লকডাউন বাড়ানো হবে কি না, তার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে শিগ্রীই ।

এদিকে সকাল বেলায় উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখা গেছে, লকডাউন চলছে ঢিলেঢালাভাবে। সড়কজুড়ে ছোট–বড় যানবাহনের দৌড়ঝাঁপ। যানবাহনে লোকজনের একদম ভিড় অবস্থা। দোকানপাট গুলোতেও যেন চলছে হরদমভাবে বেচাকেনা। সবকিছুই চলছে যেন স্বাভাবিক অবস্থায়।

বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ও মানুষের মুখে নেই মাস্ক, সুরক্ষা সামগ্রী। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামলে সবকিছু চির যেন পাল্টে যায়।এমনকি যানবাহন পর্যন্ত উধাও হতে দেখা গেছে। প্রশাসনের নজর একটু কমলেই আবারও সড়কে রিকশা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, টমটম, সিএনজি,, মোটরসাইকেল, ট্রাক, মিনিবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের যানজট অবস্থা হয়ে যায়। এই বিষয়ে এক রিকশাওয়ালা ভুলু (৪০) বড়ুয়ার কাছ থেকে জানতে চাইলে সে বলে লকডাউন দিলেও আমরা গরীবরা খাবো কী? কাজ না করলে বউ এবং ৩ ছেলে-মেয়ে না খেয়ে মরব। আরেকজন ব্যাটারি চালিত টমটম চালক খোকন বড়ুয়া বলেন,পরিবারে মা,বউ এবং ছেলে মেয়েসহ সদস্য সংখ্যা ৭ জন।একমাত্র উপার্জনকারী নিজেই। তাই গাড়ি না চালালে সবাই খাবে কি? এছাড়া সরকার থেকেও কোনো প্রকার সাহায্য সহযোগীতা পাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা কাজে নেমেছি।

লকডাউন প্রসঙ্গে উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজাম উদ্দিন বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নের করতে উপজেলা প্রশাসনের লোকজন দিনরাত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। লকডাউন কার্যকর করতে ও স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য এ পর্যন্ত শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রেও কাজ করছে ট্রাফিক পুলিশ।
এছাড়া কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাব হতে প্রাপ্ত তথ্যমতে জেলার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত উখিয়াতে ১ হাজার ৩০৮ জন।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে নজর দিলে দেখা যাই স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই রোহিঙ্গা শিবিরে,কারও মুখে নেই মাস্ক এবং সুরক্ষা সামগ্রী।এমনকি করোনা ভাইরাস কি সেটাও বেশিরভাগ রোহিঙ্গাদের অজানা। রহিম উল্লাহ (৪০) নামে একজব রোহিঙ্গা বলে এখানে করুনা ভাইরাসের কিছু নেই তাই আমাদের এইসবের দরকার নেই। তবে ক্যাম্পের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ আছে। একটি পুরাতন কুতুপালং রেজিঃ ক্যাম্পের এক দোকানের মালিক আয়াস উল্লাহ(২৬) নামে এক রোহিঙ্গা বলে এপিবিএন পুলিশরা আসলে সব দোকান বন্ধ থাকলেও তারা চলে গেলে দোকান খোলা হয়।কারন দোকানের মালগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।
তবে ক্যাম্পের ভিতরের সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল নেই। সেখানে এপিবিএন সদস্যরা পাহারা বসিয়েছেন। কিছু রোহিঙ্গাকে বাইরে যাওয়ার সময় আটক করে পুনরায় ক্যাম্পের ভেতরে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
করোনার সংক্রমণ রোধে ২১ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত উখিয়ার চারটি এবং টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা শিবিরে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সংক্রমণ বেড়ে গেলে লকডাউন বাড়িয়ে ৬ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানো হয়। এখন তৃতীয় দফায় আরও এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে প্রশাসনে।
লকডাউন অমান্য করায় কয়েকজন রোহিঙ্গাকে সতর্ক করছেন আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশ।

সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৩ জুন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৯৭ জন রোহিঙ্গার নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩১৭ জনের। এর মধ্যে উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের ১ হাজার ১১৭ জন পজেটিব । করোনায় রোহিঙ্গা শিবিরে ইতিমধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। শিবিরের কয়েকটি আইসোলেশন সেন্টারে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন করোনায় আক্রান্ত ২৩৫ জন রোহিঙ্গা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অনুপম বড়ুয়া বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। যত্রতত্র লোকসমাগম হচ্ছে। কাজকর্মের জন্য রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে চলে যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। তা ছাড়া শরণার্থীদের মানবিক সেবায় যুক্ত এনজিও কর্মীরা প্রতিদিন ক্যাম্পে যাওয়া-আসা করছেন। এনজিও কর্মীদের অনেকে কক্সবাজারের বাইরের জেলায় গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে ক্যাম্পে যাতায়াত করছেন। তাঁরা মিশছেন কক্সবাজার শহর, উখিয়া ও টেকনাফের মানুষের সঙ্গে। তাঁদের কারও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সংক্রমণ বাড়ছে। সংক্রমণ রোধ করতে হলে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পকে পৃথক করে কঠোর লকডাউনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যাতে রোহিঙ্গারা এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে এবং ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করতে না পারে। আর সব রোহিঙ্গার জন্য মাস্ক নিশ্চিত করতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •