সিবিএন ডেস্ক:
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত শুধু বন্ধ থাকলো সরকারি, বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত অফিস, আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাকি সবই খুলে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ তারিখের প্রজ্ঞাপনে আন্তঃজেলা বাস, লঞ্চ ও ট্রেন সার্ভিসও খুলে দেওয়া হয়েছে। চলমান শর্তাবলী বহাল রেখে ৬ জুন রবিবার মধ্যরাত পর্যন্ত লকডাউনের মেয়াদ আবার বাড়িয়েছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা আদেশে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, এর আগে দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ফেরি ও শহরের ভেতর বাস চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার। এসব করা হয়েছে কখনও সংশ্লিষ্টদের দাবির মুখে, আবার কখনও সরকারের নিজস্ব বিবেচনায়।

চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় প্রথমে অফিস খোলা রেখে জনসাধারণের জন্য কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। পরে সেই বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে পরিপালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নির্দেশনায় জরুরি সেবাদানকারী দফতর যেমন হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, বন্দর, রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত দফতর ও সংস্থা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত অফিস, শপিংমল, মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালের মার্চ থেকে অব্যাহতভাবে বন্ধই আছে।

জানা গেছে, চলতি ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউন (যা সরকারি ভাষায় বিধিনিষেধ নামে অভিহিত) এখনও চলমান। তবে শর্তাবলীতে ছাড় দিতে দিতে এখন শুধু অফিস, আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। বাকি সবই ধাপে ধাপে খুলে দেওয়া হয়েছে।

সংক্রমণ ঠেকাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অধীন দফতর-সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবাইকে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে গত ২৪ মার্চ বুধবার মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করে।

১৮ দফা নির্দেশনা
পরে ২৯ মার্চ সোমবার নতুন করে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করে সরকার। সেই ১৮ দফা নির্দেশনায় ছিল –
১. সব ধরনের জনসমাগম (সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অন্যান্য) সীমিত করতে হবে। উচ্চ সংক্রমণযুক্ত এলাকায় সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হলো। বিয়ে ও জন্মদিনসহ যেকোনও সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে।

২. মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. পর্যটন, বিনোদন কেন্দ্র সিনেমা হল, থিয়েটার হলে জনসমাগম সীমিত করতে হবে এবং সব ধরনের মেলা আয়োজন নিরুৎসাহিত করতে হবে।

৪. গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং ধারণক্ষমতার ৫০ ভাগের অধিক যাত্রী পরিবহন করা যাবে না।

৫. সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতে আন্তঃজেলা যান চলাচল সীমিত করতে হবে। প্রয়োজনে বন্ধ রাখতে হবে।

৬. বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের ১৪ দিন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক (হোটেলে নিজ খরচে) কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে।

৭. নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী খোলা বা উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনপূর্বক ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ওষুধের দোকানে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে মাস্ক পরিধানসহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

৯. শপিং মলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

১০. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) ও কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে।

১১. অপ্রয়োজনীয় ঘোরাফেরা, আড্ডা বন্ধ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাত ১০টার পর বাইরে বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

১২. প্রয়োজনে বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক না পরলে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১৩. করোনায় আক্রান্ত, করোনার লক্ষণ দেখা দিলে ব্যক্তির আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা অন্যান্যদেরও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে।

১৪. জরুরি সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস প্রতিষ্ঠান বা শিল্প কারখানাসমূহ ৫০ ভাগ জনবল দ্বারা পরিচালনা করতে হবে। গর্ভবতী, অসুস্থ, বয়স্ক কর্মকর্তা কর্মচারীর বাড়িতে অবস্থান করে কাজ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১৫. সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা যথাসম্ভব অনলাইনে আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৬. সশরীরে উপস্থিত হতে হয় এমন যেকোনও ধরনের গণপরীক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

১৭. হোটেল-রেঁস্তোরাসমূহে ধারণ ক্ষমতার ৫০ ভাগের বেশি মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

১৮. কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং অবস্থানকালীন সর্বদা বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

পরবর্তীতে সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের রূপরেখা তৈরিতে জরুরি বৈঠক ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউসসহ সকল মন্ত্রণালয়, ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিব, তিনবাহিনী প্রধানদের প্রতিনিধি, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিজিবি’র মহাপরিচালক, আনসার-এরমহপরিচালকসহ চারটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভার সুপারিশ অনুযায়ী ৬ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে শিল্প কারখানা খোলা রেখে এক সপ্তাহের জন্য ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে লকডাউনের ঘোষণা দেয় সরকার।

এ সময় জারি করা আদেশে ১০ দফা নির্দেশনা দেয় সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনা চলাকালীন এই সাত দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কোনভাবেই ঘরের বাইরে থাকা যাবে না। প্রয়োজনীয় ওষুধসহ যা না হলে জীবন চলে না-এমন পণ্য কিনতে ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে। কেউ মারা গেলে তাকে দাফন বা সৎকার করার কাজে ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে।

এ সময় সকল প্রকার গণপরিবহন বন্ধ রাখতে হবে। চালানো যাবে না লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলার, সরকারি-বেসরকারি গাড়ি, প্রাইভেটকার, বাস, মোটরসাইকেল, রেলগাড়ি, অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীবাহী বিমান। পণ্যবাহী পরিবহন, উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত পরিবহন এবং এসব পণ্য সরবরাহ করার কাজে নিয়োজিত পরিবহনও চলবে। একইসঙ্গে, যারা বিদেশে যাবেন, অথবা যারা বিদেশ থেকে এসেছেন, তারা যাতায়াতের ক্ষেত্রে যে পরিবহন ব্যবহার করবেন সেগুলোও চলবে।

উল্লেখিত সাতদিন খাবারের হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা রাখা যাবে, তবে বসিয়ে কোনও ক্রেতাকে খাওয়ানো যাবে না। সতর্কতার সঙ্গে খাবার বিক্রি করা যাবে অনলঅইনে।

দোকানপাট-শপিংমল পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। তবে অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগ রয়েছে। এ কাজে নিয়োজিত দোকানের কর্মচারীদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। কোনও ক্রেতা সশরীরে এসব দোকানে যেতে পারবেন না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জরুরি সেবা যেমন ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বলানি, সমুদ্র, স্থল ও নৌ বন্দরসমুহ, কার্যক্রম চলবে। টেলিফোন, ইন্টারনেট, ডাক বিভাগসহ অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় জরুরি পণ্য ও সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত অফিস, তাদের কর্মকর্তা কর্মচারী, তাদের যানবাহন, গাড়ি, এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না।

নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন কাঁচাবাজার যেমন চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, সবজি ও মাছসহ নিত্যপণ্য কিনতে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে। বিকাল চারটার পর এসব পণ্যের দোকান এবং বাজার বন্ধ করতে হবে। ওষুধের দোকান চব্বিশ ঘণ্টা খোলা রাখা যাবে।

সকল সরকারি অফিস, আধাসরকারি অফিস, বেসরকারি অফিস, স্বায়ত্বশাসিত অফিস এবং আদালতের জরুরি কাজ করার জন্য খোলা থাকবে। এসময় সকল কর্মীর উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। জরুরি কাজে যাদের প্রয়োজন শুধু তাদেরকেই অফিসে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসের নিজস্ব গাড়িতে আনার সুযোগ তাকবে। এক্ষেত্রেও সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।

সকল প্রকার গার্মেন্টস ও কারখানা খোলা থাকবে। কারখানা চালানোর জন্য কারখানার নিজস্ব গাড়িতে শ্রমিকদেরকে আনা-নেওয়া করতে হবে। এসব গাড়ির ক্ষেত্রেও সরকারি নির্দেশনা কার্যকর হবে না।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লেনদেন চালাতে সারা দেশেই ব্যাংক খোলা থাকবে। ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া দৈনিক ব্যাংকিং লেনদেনের সময়সূচি সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলবে।

এই সময়ে দেশের সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ রাজধানী ঢাকায় সুবিধাজনক স্থানে ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণ করবে। স্থানীয় প্রশাসন এসব নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। পুলিশ, বিজিবি আনসার সদস্যরা এ সময় দেশের সকল পাড়া মহল্লায় সার্বক্ষণিক টহল দেবে। সরকারি এই আদেশ যারা অমান্য করবে বা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা ছিল। কিন্তু কাউকেই মানতে দেখা যায়নি।

একের পর এক উঠলো নিষেধাজ্ঞা
সরকারের এই ১০ দফা নির্দেশনা বা আংশিক লকডাউন দেওয়ার দুদিন যেতে না যেতেই বিভিন্ন মহলের চাপে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে বাধ্য হয় সরকার।

শুরুতে গণপরিবহন চালু হলো। এরপর ব্যাপক দাবি ও বিক্ষোভের মুখে খুলে দেওয়া হলো শপিংমল ও দোকান পাট। রাস্তায় নামলো সাধারণ মানুষের ঢল।

১৪ এপ্রিল বুধবার থেকে সাত দিনের জন্য সারাদেশে কঠোর লকডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বলা হলো এটা হবে ‘কমপ্লিট লকডাউন’। অতিপ্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে যেতে পারবে না। সরকারি-বেসরকারি সকল অফিস, আদালত ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। চলবে না গণপরিবহন। বন্ধ থাকবে প্রাইভেট গাড়ি, লঞ্চ, ট্রলারও। এমনকি রিকসা, ভ্যান, অটোরিকসাও চলবে না।

চলমান বিধিনিষেধের মেয়াদ যেমন বেড়েছে, তেমনি আবার ধাপে ধাপে ছাড় দিতে দিতে সব শর্তই শিথিল হয়েছে। খুলে দেওয়া হয়েছে যানবাহন, শপিংমল, হাটবাজার, মসজিদ, দোকান, ফেরি, লঞ্চ, ট্রেন, উড়োজাহাজ। জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে জেলা-উপজেলায় হিসাবরক্ষণের অফিস, রাজস্ব আদায়ের অফিসও খুলে দেওয়া হয়েছে। খুলে দেওয়া হয়েছে বন্দর, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •