নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যৌথভাবে রোহিঙ্গা সাংস্কৃতিক স্মৃতি কেন্দ্র (আরসিএমসি) চালু করেছে।
এটি একটি বহুমাত্রিক উদ্যোগ যার মাধ্যমে অনলাইন কমিউনিটির জন্য নতুন একটি মাধ্যম, ইন্টারএক্টিভ গ্যালারী, ডিজিটাল সংরক্ষণাগার, এবং ওয়েব-ভিত্তিক প্রদর্শনী উপস্থাপিত হবে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে বিশদভাবে নথিভুক্ত ও সংরক্ষণের জন্য প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রয়াসগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বর্তমানে ১০ লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন যেখানে তাদের আশ্রয়ের জন্য প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় কিন্তু তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম সীমিত।
আরসিএমসি আইওএম-এর অনুশীলনকারী এবং মানসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আর্ট থেরাপি, সুরক্ষা এবং দক্ষতা বিকাশের কার্যক্রমের মাধ্যমে মনোসামাজিক সহায়তা সরবরাহ করছে।
মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিচর্চা এবং নিদর্শনগুলো ২০১৯ সালে কক্সবাজারের আইওএম গবেষকরা সংগ্রহ এবং নথিভুক্ত করার কাজ শুরু করেছিলেন। এই আরসিএমসি শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিল্পীদের দ্বারা গবেষণা করা এবং উৎপাদিত সংস্কৃতি নিদর্শন এবং শিল্পকর্মের একটি বিস্তৃত সংগ্রহের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মানুষের গল্প উপস্থাপন করছে।
এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে রোহিঙ্গা পরিচয়ের নৃতাত্ত্বিক চিত্র, কর্মকাণ্ড-গুলোর বিশদ বর্ণনা তৈরি করেছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের জীবনের গল্প বলার জন্য সরঞ্জামাদি এবং সুযোগ সরবরাহ করে আরসিএমসি আবিষ্কার করে যে শরণার্থীদের তিন-চতুর্থাংশ দ্বারা বর্ণিত “পরিচয় সংকট” তাদের ভালভাবে থাকার অন্যতম অন্তরায়। আরসিএমসি একটি বাহন হিসাবে কাজ করার চেষ্টা করছে যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং বর্ধিত করছে, তাদের সম্মিলিত পরিচয়কে শক্তিশালীকরণে অবদান রাখছে।
আরসিএমসি-এর একজন গবেষক এবং কবি শাহিদা উইন বলেনঃ “এই কেন্দ্রটি আমাদের রোহিঙ্গা সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য ধরে রাখতে একটি সুযোগ করে দিয়েছে। এটি আমাদের সৃজনশীলতা, আকাঙ্ক্ষাগুলো, স্মৃতি এবং অনুভূতিগুলো আমাদের নিজস্ব চারু ও কারুকলার মাধ্যমে প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছে।“
সংগ্রহশালাটি একটি সংস্কৃতির প্রতিকৃতি যা তার অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতিফলন করে, ঐতিহ্য এবং উদ্ভাবন, কল্পনা এবং স্মৃতি, স্থানচ্যুতি এবং নিজস্বতা এগুলোর মধ্যে অস্থিরতার সন্ধান করে। এটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য মডেল থেকে সূচিকর্ম, মৃৎশিল্প, ঝুড়ি, কাঠের কাজ, ভিজ্যুয়াল আর্টস, সংগীত, গল্প, কবিতা এবং আরও অনেকগুলো স্পর্শনীয় ও অস্পর্শনীয় ঐতিহ্য সামগ্রীর সম্মিলন করেছে।
আইওএম-এর বাংলাদেশ মিশনের উপ-প্রধান ম্যানুয়েল মার্কেস পেরেইরা বলেনঃ “আরসিএমসির ওয়েবসাইটটি রোহিঙ্গা জনগণকে তাদের গল্পগুলো বিশ্বব্যাপী দর্শকদের সাথে ভাগ করে নিতে এবং রোহিঙ্গা প্রবাসীদের সাথে সংযুক্ত করার জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। রোহিঙ্গা ঐতিহ্য এবং জনগণের সৌন্দর্য ও জটিলতা প্রদর্শন করে কেন্দ্রটির লক্ষ্য এই সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন এবং ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।“
আরসিএমসি সংগ্রহশালাটি আপাতত কেবল অনলাইনে অভিগম্য, তবে আইওএম একটি সমন্বিত বহুমুখী হল নির্মাণকাজের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে চাচ্ছে। এই স্থাপনায় প্রদর্শনী এবং কর্মশালার স্থানও অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এট পুরোপুরি পরিচালনা করবে।
যখন শরণার্থী শিবিরে সংস্কৃতি হলটি তৈরি হবে তখন রোহিঙ্গা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ইন্টারএক্টিভ প্রদর্শনী, রোহিঙ্গা “ওয়াক-থ্রু” অভিজ্ঞতা ইত্যাদি চাক্ষুষ দেখার সুযোগ হবে। এই প্রকল্পের মূল উপাদান সাংস্কৃতিক হলটি রোহিঙ্গাদের নতুন ও পুরাতন প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপর একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
আরসিএমসি কার্যক্রমে জড়িত সমস্ত কারিগর এবং গবেষকরা তাদের কাজের জন্য যথাযথ স্বীকৃতি এবং লেখক-স্বত্ত্ব পান। পাশাপাশি, এই কেন্দ্রের শিল্পীরা ঘরে বসেই তাদের নতুন কারুকর্ম উদ্ভাবন করে এবং নতুন দক্ষতা বিকাশের সুযোগের প্রক্রিয়া এবং উপকরণ অন্বেষণ করতে পারেন। আরসিএমসি এবং এর শিক্ষামূলক কর্মসূচী পরিচালনার জন্য একটি নিবেদিত রোহিঙ্গা দল প্রশিক্ষিত হচ্ছে।
আরসিএমসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে আইওএম-এর সাথে যৌথভাবে অবদান রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। এই প্রকল্পে সহায়তে করেছে সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সী (সিআইডিএ), কানাডার পররাষ্ট্র বিষয়ক বিভাগ, ট্রেড এন্ড ডেভলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ডিএফএটিডি), দ্যা ফরেন, কমনওয়েলথ এন্ড ডেভলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও), সুইস এজেন্সি ফর ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি), এবং নেদারল্যান্ড-এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •