সিবিএন ডেস্ক:
দ্রুত ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আলীপুর আবহাওয়া অফিসের খবর অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা থেকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে ইয়াস। এটি আজই অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে।

এদিকে মঙ্গলবার (২৫ মে) সকাল ছয়টায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিসের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।

আবহাওয়া অফিসের খবর বলছে, আগামীকাল বুধবার ভোরে ঘূর্ণিঝড়টি আছড়ে পড়তে পারে উপকূল অঞ্চলে। সেই সময় হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার। ভারতের পারাদ্বীপ ও সাগরদ্বীপের মধ্যে দিয়ে বালেশ্বরের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে যাওয়ার কথা ঘূর্ণিঝড়ের।

মূল ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত না করলেও এর প্রভাবে খুলনা উপকূলে প্রচুর ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছেই। এর সঙ্গেই আরও একটি তথ্য ছড়িয়েছে আশঙ্কা— প্রায় তিন দশক পর বঙ্গোপসাগরে এমন শক্তিশালী কোনো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে ভরা কটালে।

পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় যে পূর্ণ মাত্রার জোয়ার দেখা যায়, তাকেই বলা হয় তেজ কটাল বা ভরা কটাল। জ্যোতির্বিদা বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, আগামী বুধবার (২৬ মে) শুরু হচ্ছে শাওয়াল মাসের চাঁদের পূর্ণ তিথি তথা পূর্ণিমা। অর্থাৎ বুধবারেই উপকূলে থাকবে তেজ কটাল বা ভরা কটাল। আবার বর্তমান গতিপথ অনুযায়ী বুধবারই উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলে আছড়ে পড়ার কথা রয়েছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস-এর। অর্থাৎ তেজ কটালের পূর্ণ জোয়ারের সময়ই আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস।

এমনিতেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ইয়াস-এর। তেজ কটালের সঙ্গে এর উপকূলে আঘাত হানার সময়টিও মিলে গেলে ইয়াস ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে— এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আর এরকম ঘূর্ণিঝড় কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশের পূর্ব উপকূল— একানব্বইয়ের সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে।

তিন দশক আগে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ভরা পূর্ণিমায় চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হেনেছিল এক ঘূর্ণিঝড়। এখন যেমন প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়কেই আলাদা আলাদা নামে ডাকা হয়, তখন সেই প্রচলন ছিল না। একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়টি ‘বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়’ নামেই চিহ্নিত করে থাকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। ৩০ বছর আগের সেই ঘূর্ণিঝড়ে ১২ থেকে ২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস আর ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার গতির বাতাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল উপকূল। প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এক কোটির বেশিও মানুষ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন।

তিন দশক পর ফের ভরা কটালে আঘাত হানতে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। এখন পর্যন্ত তথ্য বলছে, ভারতীয় উপকূলেই মূল আঘাতটি হানবে এই ইয়াস। তবে এসব ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি পাল্টাতে সময় লাগে না। গতিপ্রকৃতি না পাল্টালেও ঘূর্ণিঝড়ের উপকেন্দ্রের বাইরের অংশটির প্রভাব খুলনা উপকূলে পড়বে ভালোভাবেই। আর সেই সময়েই তেজ কটাল বা ভরা কটাল ঘটলে জোয়ারের পানির উচ্চতা হতে পারে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত না হলেও জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটায় ঠিকই আক্রান্ত হতে পারে খুলনা ও সংলগ্ন উপকূল।

আবহাওয়াবিদরা অবশ্য এখনই এতটা শঙ্কিত হতে নারাজ। ঘূর্ণিঝড়ের মূল গতিপথ যেহেতু ভারতের দিকে, তাই বাংলাদেশের উপকূলে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে না বলেই মনে করছেন তারা। জানতে চাইলে ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ সারাবাংলাকে বলেন, ভরা কটালের সময়ই সম্ভবত ঘূর্ণিঝড় ইয়াস স্থলভাগে আঘাত করবে। তবে আমাদের বিভিন্ন অ্যানালাইজার বা মডেল যেগুলো আছে, সেগুলোর তথ্য বলছে— এটি আমাদের ছেঁড়াদ্বীপ ও ভারতের সাগর দ্বীপের মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে যাবে। তো সে হিসাবে আমাদের উপকূল খানিকটা নিরাপদে থাকতে পারে। তবে অনেক সময় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ বদলেও যায়। তেমনটি হলে আমরা আপনাদের জানাব।

তেজ কটালের সঙ্গে একই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের আগমনে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে বজলুর রশিদ বলেন, ভরা কটালে নিজস্ব জোয়ারের একটা উচ্চতা তো আছেই। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়লে এই উচ্চতা নিশ্চয় আরও বাড়তে পারে। আবার বর্ষাকালে পানির উচ্চতা একটু বেশিই থাকে। এমন কয়েকটি বিষয় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে ঘূর্ণিঝড় আমাদের দিকে কতটা আসছে, সেটির ওপরই আসলে বাকি বিষয়গুলো নির্ভর করছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •