মোহাম্মদ আশরাফুল হক
সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বিএফআরআই ও পিএইচডি ফেলো

সাগরে তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণিদের বিশাল পরিবেশগত সেবা রয়েছে, যে কারণে এদেরকে ইকোসিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার বা বাস্তুসংস্থান প্রকৌশলী বলা হয়। তিমিরা তাদের স্বভাবজাত বা আচরণগত প্রকৌশলের মাধ্যমে শুধু নিজেদের বসবাসের পরিবেশ ঠিক রাখেনা, অন্য প্রাণিদের জন্যও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়। যে কারণে তিমিরা যে পরিবেশে বসবাস করে সেই পরিবেশকে একটি উর্বর, জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ নির্মল পরিবেশ মনে করা হয় অর্থাৎ তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণিরা পরিবেশের উৎপাদনশীলতার সূচক প্রাণী (Indicator Species)। আমাদের বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ এখনও অনেকটা নির্মল এবং জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ। পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্যারাবন “সুন্দরবন” এর অবস্থান আমাদের বাংলাদেশে। বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলাশয়ে চার প্রজাতির তিমিসহ বারো প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণি বাস করে।

তিমিরা কীভাবে পরিবেশে ভূমিকা রাখে?

সাগর বা মহাসাগরে কার্বন চক্র ও নাইট্রোজেন চক্রসহ অসংখ্য পুষ্টিচক্র সক্রিয় থাকে, যে পুষ্টিচক্রের উপর নির্ভর করে টিকে থাকে সাগরের প্রাণিরা। এই ধরনের একটি পুষ্টিচক্র হলো হুয়েল পাম্পিং (Whale Pumping), যেটি তিমিদের একটি আচরণগত কার্যকলাপের কারণে তৈরি হয়।

আমরা জানি যে, মনুষ্যসৃষ্ট নানা ক্ষতিকর কর্মকান্ডে আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরন। আর বিশে^ প্রতিবছর যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়, তার ৯০ শতাংশই কমায় সমুদ্রে থাকা ফাইটোপ্লাংক্টন; যা এক ধরনের ক্ষুদ্র সবুজ উদ্ভিদ। এরা প্রতি বছর আনুমানিক ২ বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমায়। ফাইটোপ্লাংক্টন সামুদ্রিক প্রাণিদের জন্যও একটি পুষ্টিকর খাদ্য। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ ফাইটোপ্লাংক্টন সমুদ্রের উপরি স্তরে তাদের জীবনচক্র শেষ করার পর তাদের দেহাবশেষ সাগরের তলদেশে গিয়ে জমা হয়। আর তিমিরা সাগরের তলদেশে জমাকৃত এই অব্যবহৃত পুষ্টিকে পুনরায় উপরিস্তরে নিয়ে এসে ব্যবহার উপযোগী করে সামুদ্রিক প্রাণিদের জন্য খাদ্য যোগান তৈরি করে। তিমিদের এই কার্যক্রমই হুয়েল পাম্পিং (Whale Pumping) নামে পরিচিত।

তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণিরা তাদের খাদ্য সংগ্রহ বা শিকারের জন্য অধিকাংশ সময় সাগরের তলদেশসহ বিভিন্ স্তরে ভ্রমণ করে থাকে। আবার শ্বাস নেয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর পানির উপরে ওঠে আসে। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, উপরোক্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে তিমিরা সাগরের তলদেশে থেকে বিপুল পরিমাণ ন্ইাট্রোজেনসহ নানা ধরনের পুষ্টি সাগরের ইউট্র্রোফিক জোন (সাগরের উপরিস্তর থেকে যে যে গভীরতা পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌাছে) বা উপরিস্তরে নিয়ে আসে। এভাবে তিমিরা সমুদ্রের ফাইটোপ্লাংক্টন ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিসহ সার্বিকভাবে সাগরে জীববৈচিত্র সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।

সাগরের পানিতে ফাইটোপ্লাংক্টন উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে ফসফেট ও নাইট্রেট পুষ্টি বিরাজমান থাকলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ লোহাজাতীয় পুষ্টি থাকে না। কিন্তু‘ তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণিরা তরল বমি বা মল নির্গত করার মাধ্যমে সাগরে প্রয়োজনীয় লোহা সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিমির বমিতে সাগরের পানির তুলনায় প্রায় এক কোটি গুণ লোহা থাকে। তিমিরা তাদের পাকস্থলীর বদহজমকৃত অংশ বমি বা মল আকারে সাগরের পানিতে ছাড়ে, যেগুলো সাগরে প্রয়োজনীয় ফাইটোপ্লাংক্টন বায়োমাস উৎপাদন করতে সাহায্য করে।

এক গবেষণায় জানা যায়, তিমিরা প্রজাতিভেদে দৈনিক ২.৯৪ কেজি থেকে ১৫.৯ কেজি পর্যন্ত নাইট্রোজেন সাগরে নির্গত করে থাকে। এমনকি একটি নীল তিমির একবারের তরল বমি থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত ন্ইাট্রোজেন সাগরের পানিতে যুক্ত হয়।

এছাড়া তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণিরা মহাসাগরের Top Predator বা সর্বোচ্চ শিকারী হিসাবে সাগরে পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করে। তারা মাছ খেয়ে মাছ কমানোর চেয়ে বেশি পরিমাণে বড় মাছ উৎপাদনে ভূমিকা রেখে মানুষের অিিমষের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

বিশ^নেতারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনও যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। যে কারণে জলবায়ুগত পরিবর্তনের ভবিষ্যত প্রভাব নিয়ে তারা খুবই উদ্বিগ্ন। তাই সাগরের পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি কমানো তথা কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণিদের সংরক্ষণে আমাদের সকলেরই সচেতন হওয়া উচিত। আর এটি আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই খুব প্রয়োজনীয়।

তিমি ও তিমি জাতীয় প্রাণীরা Mammalia শ্রেণির  Cetacea বর্গভুক্ত একদল জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। Cetacea বর্গটি Odontoceti ও Mysticeti নামের দুটি উপবর্গে বিভক্ত। প্রথম উপবর্গে দাতওয়ালা ৭২ টি ছোট আকারের তিমি, ডলফিন ও পরপয়েজ এবং দ্বিতীয় উপবর্গে ব্যালিন প্লেটযুক্ত ও দাঁতবিহীন ১০ প্রজাতির ফিল্টার ফিডার বৃহৎ তিমি অর্ন্তভুক্ত। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (খি্রঃ পঃূ ৩৮৪-৩২২ অব্দ) তিমি জাতীয় প্রাণির অন্যতম প্রাথমিক সমীক্ষক। সুইডিস জীববিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস তিমি ও ডলফিনকে প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে শনাক্ত করেন। Wildlife Conservation Society (WCS) এর সর্বশেষ জরীপ মতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১২ প্রজাতির সিটাসিয়ান বা জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। যার মধ্যে ৪ প্রজাতির তিমি, ৭ প্রজাতির শুশুক (ডলফিন) ও এক প্রজাতির পরপইস। বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরে বিশে^র বিপন্ন স্তন্যপায়ী জায়ান্টদের সুরক্ষার জন্য সামুদ্রিক জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল (হট স্পট) হিসাবে সনাক্তকৃত ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ এর ১,৭৩৮ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকাকে Marine Protected Area (MPA) বা সামুদ্রিক সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •