সিবিএন ডেস্ক:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিকল্প নেই বলে শুরু থেকেই বলে আসছেন। তবে মাস্ক পরায় এখনো অনীহা দেখা যায় অনেক মানুষের মধ্যে। মাস্ক পরতে বাধ্য করাতে বেশকিছু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও প্রতিদিন প্রতিটি পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও নেই। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে মাস্ক পরতে বাধ্য করাতে পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পুলিশ বলছে, এটি ভালো উদ্যোগ। প্রতিটি পয়েন্টেই তাদের উপস্থিতি থাকায় নাগরিকদের মাস্ক পরা নিশ্চিত করার বিষয়টি তারা ভালোভাবে তদারকি করতে পারবে। তবে অনেকেরই আশঙ্কা, এই বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহারও হতে পারে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে প্রচলিত আইনেই জনগণকে মাস্ক পরানোসহ অন্যান্য বিধিনিষেধ পালন করানো সম্ভব। আর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণ কেন নির্দেশনা মানে না— সেই কারণটি খুঁজে বের করা জরুরি। জনগণের কাছে সঠিক স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে এবং তাদের সঠিকভাবে সচেতন করে তোলা গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিয়ম মানবে।

পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জনগণের মাস্ক পরার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশ পরিদর্শক থেকে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হবে। এই ক্ষমতা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আইন সংশোধনের মাধ্যমে এই ক্ষমতা অর্পণ করা হবে পুলিশকে।

সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদ্যমান আইনের কোনো ধারা বা উপধারায় এ সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করে করোনা মোকাবিলায় পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দিতে কাজ চলছে। শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

পুলিশের হাতে এমন ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের অধ্যাপক হাফিজা সুলতানা। তিনি বলেন, এর আগে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এ ধরনের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে সেই ক্ষমতারও অপব্যবহার হবে।

প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত রাখার বিষয়টি উল্লেখ করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তাই এটি নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে কেবল জনস্বার্থ বিবেচনায় এটি করা হয়তো ঠিক হবে না। প্রশাসনের সব পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে যেন ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট না হয়। বিচারিক ক্যাডার, প্রশাসনিক ক্যাডার, পুলিশ ক্যাডারসহ অন্যান্য যারা আছে, তাদের সবাইকে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ডা. মুশতাক বলেন, মানুষকে শাসন না করে তাদের কথায় কনভিন্স করা দরকার। মানুষকে শাসন ঠিকভাবে করা হচ্ছে না বলে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না— বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। শাসন প্রয়োজন তখনই যখন অধিকাংশ মানুষ নিয়ম মানলেও কিছু মানুষ তা ভাঙবে। যেখানে অধিকাংশ মানুষই উদাসীন, সেখানে আগে তাদের বোঝাতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাসহ সামাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে মানুষকে বোঝানোর জন্য। সারা বাংলাদেশে পুলিশ দিয়ে সেটা সম্ভব না।

পুলিশও কি সব জায়গায় মাস্ক পরছে বা স্বাস্থ্যবিধি মানছে— এমন প্রশ্নও রাখছেন ডা. মুশতাক। তিনি বলেন, শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশসহ সবার ওরিয়েন্টেশন দরকার। পুলিশ থাকবে সহায়তার জন্য। কিন্তু তার আগে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধিটা বোঝাতে হবে। তা না করে কোনো আইন প্রয়োগ করেই লাভ তেমন হবে না।

জনগণকে সচেতন করার বিষয়ে জোর দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও দেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামও। তিনি বলেন, যখন যেটা করা প্রয়োজন সেটা না করে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়াটা আসলে একটু কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। মানুষ যে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, তা কেন মানছে না— সেটা কি বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে? বস্তি এলাকায় মানুষেরা করোনা বিষয়ে উদাসীন। কেন? কারণ তাদের আমরা স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, তাদের আগে বোঝাতে হবে। এরপর প্রয়োজনে সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে আইন প্রয়োগ করা যাবে।

অবশ্য পুলিশ বিচারিক ক্ষমতা পেলে কিছু কাজ হবে— এমনটি মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। বিষয়টি মনিটরিংয়ে জোর দিচ্ছেন তিনি। বলেন, পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার কথা শুনছি। অনেকে এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলছেন। তবে আমি মনে করি, পুলিশকে এরকম ক্ষমতা দেওয়া হলেও তা যেন কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষকে মাস্ক পরানোর জন্য আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ কথা শুনছে না। এটি (পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া) সরকারের ভালো উদ্যোগ বলে মনে করছি। এটি হলে পুলিশ আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবে।

পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, পুলিশ যখন এই কাজ শুরু করবে, তখন কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে। পুলিশের প্রত্যেক কাজের জবাবদিহি রয়েছে। এই কাজেও জবাবদিহিতা থাকবে। কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন, সেজন্য টিম কাজ করবে। -সারাবাংলা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •