আব্দুর রহমান খান:
নেপালে নির্বাচিত সরকারের পতন হয়েছে। করোনা সংকট আর দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মাঝে টানাপোড়নে টালমাটাল হয়ে উঠেছে হিমালয় কন্যা নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি।

সোমবার ( ১০ মে) পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। বিরোধী শিবিরের নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওয়িস্ট সেন্টার) – দুটো দলই প্রধানমন্ত্রী ওলির ওপর অনাস্থা এনেছে। এমনকি ওলির নিজের দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউনিফাইড মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) আইনপ্রণেতারাও ভোটদানে বিরত ছিলেন। নেপালের জনতা সমাজবাদী দলের আইনপ্রণেতাদের একাংশ ওলির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

দেশটিরে ২৭১ সদস্য-বিশিষ্ট পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয় পেতে প্রধানমন্ত্রী ওলির প্রয়োজন ছিল ১৩৬ ভোট । কিন্তু ওলির পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৯৩ জন ; বিপক্ষে ভোট পড়েছে ১২৪টি, আর ১৫ জন আইনপ্রণেতা ভোটদানে বিরত থাকেন।

এ অবস্থায় শিগগিরই দেশটির প্রেসিডেন্ট নতুন সরকার গঠনের জন্য অন্য দলকে আহ্বান জানিয়েছেন।

২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নেপালে সরকার গঠন করেছিলেন ওলি। নতুন সংবিধান গ্রহণের পর দেশটিতে তিনিই প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (মাওয়িস্ট সেন্টার) আইনপ্রণেতাদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন ওলি। এর মধ্য দিয়ে পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ওলির জোটের।

নেপালে করোনা সংকট
নেপালে এ দফার রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে করোনা সংকটকে। ভারতের মত মারাত্মক পরিস্থিতির শিকার নেপাল। ভয়াবহভাবে সংক্রমিত ভারত থেকে হাজার হাজার নেপালি পরিযায়ী শ্রমিক দেশে ফেরার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে নেপালে সংক্রমনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটিতে সংক্রমণের হার এখন ৪৭ শতাংশ যা বিশ্বের মধ্যে শীর্ষ কাতারে ।

সোমবার (১০ মে) নেপালে একদিনে ৮,৭৭৭ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ সনাক্ত হয়েছে। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা চার লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালে আইসিইউ এবং অক্সিজেন অভাবে রোগী মারা যাচ্ছে। দেশটির স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পরেছে।

ওদিকে হিমালয়ের বেস ক্যাম্প থেকে সম্প্রতি করোনাক্রান্ত ৩০ জন পর্বতারোহীকে উদ্ধারের পর এভারেস্ট চুড়ায় নেপালের সাথে পার্থক্য রেখা তৈরী করে দিয়েছে ওপারের দেশ চীন।

স্বাস্থ্যখাতে এমন বিপর্যয়কর অবস্থার জন্য দায়ী করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ওলির নেতৃত্বাধীন সরকারকে। বিরোধীদের অভিযোগ স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি এবং সময়মত করোনা ভ্যাক্সিন সংগ্রহ করতে ব্যর্থতার জন্য দায়ী কে পি ওলির সরকার।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, নেপালের বর্তমান সকংকটের মুল কারন রাজনৈতিক।

নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং মাওবাদী কম্যুনিস্ট নেতা পুষ্প মকমল দাহালের নেতৃত্বাধীন কম্যুনিস্ট পার্টি অব নেপাল ( মাওবাদী কেন্দ্র) রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে ওলি সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে পার্লামেন্টে সংখ্যা গরিষ্টতা হারায় ওলি। মাওবাদীদের অভিযোগ ওলি সংবিধান লঙ্ঘন করেছে এবং তার সাম্প্রতিক কর্মকান্ড দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বিপদাপন্ন করে তুলেছে।

এর আগে গত বছর কে পি ওলি দেশের প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিয়ে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তা আবার বহাল করা হয়।

এরকম অবস্থায়, মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল এবং নেপালি কংগ্রেস পার্টির নেতা শের বাহাদুর দেওবা যৌথভাবে অলি সরকারের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং অলি সরকারের পতন ঘটায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, ওলির আমলে নেপালের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব বেড়েছে অনেকাংশে। আর ভারত-চীনের মাঝে পড়ে টালমাটাল হয়েছে কাঠমান্ডুর রাজনীতি।

গত বছর জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীন -ভারতের উত্তেজনার মাঝে ভারতের সাথে নেপালের পুরানো সীমান্ত সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।

এসয় চীন -ভারত সীমান্তের কাছাকাছি নেপালের কালাপানি এলাকায় ভারত সৈন্য সমাবেশ ঘটায় এবং নেপালদের ভুমি ব্যবহার করে রাস্তা নির্মান করে তা চালু করে দেয় নেপালের অনুমতি ছাড়াই। আর এ নিয়ে নেপালের সাথে ভারতের সীমান্ত উত্তেজনা প্রকাশ্য রূপ নেয়। ভারতের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ দেখা দেয় নেপালে।

এ অবস্থায় নেপাল সরকার কালাপানি অঞ্চলকে দেশের মানচিত্রে সুস্পষ্ট করে নতুন মানচিত্র ছাপে নেপাল সরকার । ওলির নেতৃত্বাধীন নেপালি পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট তা অনুমোদন করে।

এর আগে ২০১৫ সালে চীন-ভারত বাণিজ্য চুক্তিতে কালাপানি অঞ্চলের লিপুলেখ গিরিপথকে নেপাল-ভারত-চীনের ত্রিসঙ্গম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে নেপালের সাথে কোনও পরামর্শ করা হয়নি বলে নেপাল তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছে। আর প্রলধানমন্ত্রী ওলি ঘোষণ করেন কালাপানি অঞ্চলে ভারত কর্তৃক দখল করা নেপালি ভূমি পুনদ্ধার করা হবে। ওলির এমন ঘোষণা ভারত যে ভালভাবে নেয়নি সেটা নয়া দিল্লী জানিয়ে দিয়েছে। তবে বিষয়টি এখন আর নেপাল-ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে চীনের স্বার্থ জড়িয়ে পরায় তা ত্রিমুখী সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

এ অবস্থায় চীন না ভারত – কোন প্রতিবেশীর কী ধরনের বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক বা সীমান্ত প্রভাব কতটা নেপালকে উদ্বুদ্ধ বা উত্তেজিত করবে তার উপর নির্ভর করছে দেশটির আগামীদিনের আভ্যন্তরীণ শান্তি ও অগ্রগতি ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •