*প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ ৬ টাকা , বিক্রি হচ্ছে ৩ টাকা ২৫ পয়সা
*প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা-লবণ আমদানি করা হবে না

 

তোফায়েল আহমদ :

শিল্প কারখানায় ব্যবহারের মিথ্যা তথ্যে বিদেশ থেকে আমদানির কারণে দেশে উৎপাদিত লবণের দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে গেছে। মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি লবণের উৎপাদন খরচ হচ্ছে ৬ টাকা। অথচ চাষী এক কেজি লবণ বিক্রি করে পাচ্ছে মাত্র ৩ টাকা ২৫ পয়সা। এভাবে টানা ৪ বছর ধরে লবণ শিল্পে বিরাজ করছে চরম দুর্দিন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ী একমাত্র দেশীয় লবণ শিল্পটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং সোডিয়াম সালফেটের নাম দিয়ে বিদেশ থেকে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে ঢালাও লবণ আমদানি বন্ধ করা না হলে আগামী মৌসুমে কোনো লবণ চাষী মাঠে নামবে না।

এসব বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আমিন আল পারভেজ জানান- ‘লবণের বিরাজমান সংকটজনক পরিস্থিতি নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় দেশের শিল্প কারখানা এবং দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষার বিষয়টি নিয়েই এমন সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত ওই সভায় শিল্প সচিব কে এম আজম প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, এখন থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য রঙিন এবং তরলিকৃত সোডিয়াম সালফেট আমদানি করা হবে।
সেই সঙ্গে যেকোনোভাবেই শিল্প কারখানার নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি বন্ধেরও সুপারিশ করা হয়। কেননা শিল্প কারখানার নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করা হলে ট্যাক্সের পরিমাণ অনেক কম। আর এতে করে সরকারের রাজস্ব যেমনি ক্ষতি তেমনি দেশীয় লবণ শিল্পের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে। তবে এখনো পর্যন্ত এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় লবণ শিল্পে দুর্গতি লেগেই রয়েছে বলে জানান স্থানীয় লবণ চাষীরা।

দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদন কেন্দ্র হচ্ছে কক্সবাজারের ৬টি উপকূলীয় উপজেলা কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ৭টি উপজেলায় লবণ উৎপাদনযোগ্য প্রায় ৭০ হাজার একর উপকূলীয় জমি রয়েছে। উৎপাদিত লবণের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে দিন দিন লবণ চাষ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১৬ হাজার একর জমিতে বন্ধ হয়ে গেছে লবণ চাষ।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প সংস্থা-বিসিকের কক্সবাজারস্থ লবণ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৫৪ হাজার ৬৫৪ একর জমি লবণ চাষের আওতায় এসেছে। গেল বছরের উৎপাদন মৌসুমেও লবণ চাষের আওতায় উপকূলীয় জমির পরিমাণ ছিল ৫৭ হাজার ৭২২ একর জমি। গত এক বছরেই ৩ হাজার একর জমির চাষ কমে গেছে। লবণ চাষীরা একটানা গত ৪ বছর ধরেই তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। ২০১৭ সাল থেকে লবণের দাম পড়ে যাওয়ায় উপকূলের চাষীরা তাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্যের পেশাটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

কক্সবাজারের মাঠ পর্যায়ের চাষী, জমির মালিক, ব্যবসায়ী ও লবণ মিল মালিকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হ‌ওয়ার পর থেকেই উপকূলের লবণ চাষীদের ভাগ্যের দুয়ার খুলে যায়।

এ প্রসঙ্গে তারা জানান, বিগত সরকারগুলোর আমলে একদিকে চোরাই পথে ঢুকে পড়ত বিদেশি লবণ অপরদিকে ঢালাও আমদানিও করা হতো। ফলে দেশীয় লবণ শিল্পটি পড়েছিল মুখ থুবড়ে। ২০১৭ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মাত্র ৬০ হাজার মেট্রিক টন লবণ কম উৎপাদন হওয়ার সুযোগ নিয়ে দেশের লবণ আমদানি সিন্ডিকেট কয়েক লাখ টন লবণ বিদেশ থেকে আমদানি করে ফেলে। সেই থেকে নানা কৌশলে সিন্ডিকেটটি তৎপর হয়ে পড়ে আমদানিতে। ফলে রীতিমতো দুর্ভাগ্য নেমে আসে লবণ চাষীদের ওপর।

এ প্রসঙ্গে মহেশখালী-কুতুবদিয়া সংসদীয় এলাকার সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক বলেন-‘ যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চিত লবণ চাষীদের দুর্দশার কথা গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢালাও লবণ আমদানি বন্ধের নির্দেশনা দেন। এরপরই লবণ চাষীদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয়।’

তিনি জানান, পরবর্তীতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শিল্পকারখানা বিশেষ করে গার্মেন্ট কারখানায় ব্যবহারের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং সোডিয়াম সালফেটের আড়ালে বিদেশ থেকে বন্ডের মাধ্যমে ব্যবহার্য লবণ আমদানি করায় নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে লিকুইড অথবা রঙিন সোডিয়াম সালফেট আমদানির ব্যবস্থা করা হলে দেশীয় লবণ শিল্পটি ধ্বংসের পথ থেকে রক্ষা পাবে।

লবণ চাষীরা গত কয়েক বছর ধরে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চলতি মৌসুমের প্রথম দিকে চাষীরা মাঠেও নামতে রাজি ছিল না জানিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা জানান, বিষয়টি আমি প্রধানমন্ত্রীর গোচরিভূত করলে তিনি তাৎক্ষণিক গুরুত্বসহকারে নেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী জানান, লবণ কিছুতেই আমদানি করা হবে না। চাষীদের রক্ষার জন্য যা যা করতে হয় আমি তাই করব। তিনি আমাকে নির্দেশনা দিয়ে বলেন, স্ব স্ব এলাকার চাষীদের কাছে তাঁর (প্রধানমন্ত্রী) ম্যাসেজটি পৌঁছে দিয়ে চাষীদের যাতে আশ্বস্ত করা হয় এবং তাদের মাঠে নামানোর তাগিদ দিতেও বলা হয়।

অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা আরো জানান, লবণ সংক্রান্ত বিরাজমান সমস্যা নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়ে চাষীদের মাঠে নামানোর জন্য আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, এমপি আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানকেও প্রধানমন্ত্রী অনুরূপ তাগিদ প্রদান করেন।

বিসিকের কক্সবাজারস্থ উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিজিএম) জাফর ইকবাল ভুঁইয়া জানান, গত ২ মে পর্যন্ত ১৫ লাখ ৫ হাজার মে. টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি সপ্তাহেই প্রায় ২ লাখ টন করে উৎপাদন হচ্ছে। তবে মঙ্গলবারের হালকা বৃষ্টিপাতে উৎপাদন সামান্য ব্যাহত হতে পারে। লবণের জাতীয় চাহিদা হচ্ছে ২২ লাখ মেট্রিক টন। তাপমাত্রার তীব্রতা অব্যাহত থাকলে ১৮ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবারও সম্ভাবনার কথা জানান তিনি। ডিজিএম জানান, মাঠ পর্যায়ে লবণের উৎপাদন খরচই হচ্ছে মণপ্রতি ২৪০ টাকা অর্থাৎ এক কেজিতে ৬ টাকা। আর সেই লবণ চাষীদের বিক্রি করতে হচ্ছে মণে (সর্বোচ্চ দাম) ১৬৩ টাকা অর্থাৎ কেজি প্রতি ৩ টাকা ২৫ পয়সা করে।

মহেশখালী দ্বীপের লবণ চাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আনোয়ার পাশা চৌধুরী বলেন-‘ আমার ২০০ কানি লবণ উৎপাদন যোগ্য জমি রয়েছে। ফি বছর কানি প্রতি ২০/২৫ হাজার টাকা বর্গা লাগিয়ে থাকি। কিন্তু লবণের দাম পড়ে যাওয়ায় চাষীরা জমি বর্গা নিয়ে পোষাতে পারছে না।’ তিনি জানান, মৌসুমের এক বছর আগেই চাষীরা জমির আগাম বর্গার টাকা দিয়ে ফেলে জমির মালিককে। কিন্তু আগামী মৌসুমের জন্য এবার কোনো চাষী জমি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে না।

কুতুবদিয়া দ্বীপের কৈয়ারবিলের চাষী নুরুল হোসাইন বলেন, তিনি এবার ৪ কানিতে চাষ করে সাড়ে তিন লাখ টাকা ঘাটতি দিয়েছেন। জমির বর্গা, পলিথিন, পানির সেচ, মজুরের বেতন এবং পরিবহন খরচ মিলে বিক্রির চেয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। তাই আগামী মৌসুমে লবণের মাঠ করবেন কিনা তিনি এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
কক্সবাজারের টেকনাফ সাবরাং এলাকার লবণ জমির মালিক ও লবণ চাষী মোহাম্মদ শফিক মিয়া জানান- ‘আমাদের এলাকায় এবার মৌসুমের এ সময় পর্যন্ত প্রতি কানিতে ২৫০ মণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদিত লবণ বিক্রি করার পর কানি প্রতি ঘাটতি রয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা করে।’

কক্সবাজারের অন্যতম লবণ ব্যবসায়ী আবদুল শুকুর সিআইপি বলেন, তিনি গোমাতলী এলাকায় বিশাল একটি লবণ মাঠে ফি বছর চাষ করে আসছেন। এবারের পরিস্থিতি এমনই খারাপ যে, উৎপাদিত লবণ তিনি বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত গুদামজাত করে রাখছেন। তিনি বলেন, সরকারের কাছে সমস্যা সমাধানের পথ রয়েছে একদম সহজ। দেশে কত শিল্প কারখানা রয়েছে এবং এসবে কি পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট ব্যবহারের জন্য দরকার ঠিক সেই পরিমাণ আমদানি করা হলেই তো দেশীয় লবণ শিল্পটা রক্ষা করা যায়।

ব্যবসায়ী আবদুল শুকুর সিআইপি বলেন, ভারতে লবণের উৎপাদন খরচ একদম কম। বলতে গেলে আট আনা পড়ে কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ। তদুপরি সেখানকার লবণ সাদা এবং ঝরঝরে বেশি। শিল্প কারখানার নামে আমদানি করা হলে ভারতীয় লবণের এখানে কেজি পড়বে আড়াই টাকা। তাই প্যাকেটজাত কম্পানিগুলো মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে। এসব কম্পানিগুলো গত ৪/৫ বছর ধরে কক্সবাজারে উৎপাদিত লবণ ক্রয় করছে না। এ কারণেই বাজারে লবণের দাম পড়ে গেছে। প্যাকেটজাত লবণের ক্ষতিকারক দিকগুলোও ভোক্তারা একবারও চিন্তা করে না। কক্সবাজারে উৎপাদিত অর্গানিক লবণ বাদ দিয়ে ভোক্তারা ছুটছে কেমিক্যাল লবণের দিকে।

কেবল চাষীরা নয় লবণ ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরাও রয়েছে ক্ষতির মুখে। ইতিমধ্যে কক্সবাজারের ইসলামপুর লবণ শিল্প কেন্দ্রের ৭০টির মধ্যে ৪০টি লবণ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। কক্সবাজার জেলা লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামশুল আলম আজাদ জানান- ‘বিদেশ থেকে শিল্প কারখানায় ব্যবহারের নামে এনবিআর এর অনুমতি নিয়ে গত ২ বছরে ৯ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন লবণ আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা লবণ প্যাকেটজাত করা লবণ কম্পানিগুলো ব্যবহার করার কারণেই মাঠের লবণের দাম পড়ে গেছে।’

তিনি জানান, সারা দেশে প্রতি কেজি ভোক্তা পর্যায়ে ৩০/৪০ টাকা করে লবণ বিক্রেতা কম্পানিগুলো আগে কক্সবাজারের মাঠ পর্যায়ে লবণ ক্রয় সেন্টার খুলে বসত। কিন্তু তারা এখন মাঠ থেকে লবণ ক্রয় বন্ধ করে দিয়েছে। এসব কম্পানিগুলো শিল্পকারখানার আড়ালে আমদানি করা বিদেশি লবণ প্যাকেটজাত করে বিক্রি করে আসছে। এতকাল কক্সবাজারের লবণ দিয়েই ডিটারজেন্ট তৈরি হয়ে আসছে। গার্মেন্ট কারখানায় ব্যবহার হয়ে আসছেও কক্সবাজারের লবণ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কক্সবাজারের লবণ তারা নিচ্ছে না। বিসিকসহ সরকারি বেসরকারি পর্যায়েও এসবের তদারকি নেই।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, শিল্প কারখানার নামে আমদানি করা সোডিয়াম ক্লোরাইড দেশীয় লবণের চেয়েও দাম কম পড়ে এবং সাদাও বেশি বিধায় দেশীয় উৎপাদিত লবণ বাদ দিয়ে কম্পানিগুলো এসব প্যাকেটজাত করে বিক্রি করে থাকে।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য কেবল লিকুইড সোডিয়াম সালফেট আনার ব্যবস্থা করা হলে ব্যবহার্য লবণ আমদানি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে তেমনি দেশীয় লবণ নিয়ে জাতীয় চাহিদাও মিটানো সম্ভব হবে।

-কালেরকন্ঠ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •