সিবিএন ডেস্ক:
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা ফেরানো নিরাপদ করতে সে দেশে বাড়তি বোমারু বিমান ও যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

পেন্টাগন বলছে, তারা আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে। এবং চলতি বছরের ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। তাই, এই সেনাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে ভারি যুদ্ধাস্ত্র বিশেষ করে বোমারু বিমান ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হবে। তালেবান ঘাঁটিতে নতুন করে হামলা বা অভিযানের কোনো পরিকল্পনা থেকে এসব উড়োজাহাজ পাঠানো হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জন কিরবি। বরং মার্কিন অংশীদার ও আফগান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে তাঁরা নিরাপদ রাখতে চাইছেন বলে তিনি জানান।

এদিকে, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি জানান, আফগানিস্তানে আড়াই হাজার মার্কিন কর্মকর্তা এবং ১৬ হাজার বেসামরিক ঠিকাদারকে নিরাপদ রাখতে ছয়টি ‘বি-ফিফটি টু’ দূরপাল্লার বোমারু বিমান ও ১২টি ‘এফ-এইটিন’ যুদ্ধবিমান পাঠানো হচ্ছে।

আফগানিস্তান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলছেন, এর মাধ্যমে একটি অন্তহীন যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো। বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের সেনাবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেনা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলবে। যদিও এমন এক সময়ে সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে, যখন দেশটিতে নতুন করে সংঘর্ষ বাড়তে শুরু করেছে।

গত বছর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তালেবানের এক চুক্তি অনুযায়ী, এ বছর ১ মে’র মধ্যে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সেনাদের ওপর হামলা বন্ধ রাখতে হবে তালেবান বাহিনীকে।

তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত মাসে এই সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানে সেনা উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। এ বছর ‘নাইন ইলেভেন’ হামলার ২০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সেটিকে ঘিরে কোনো ধরনের নিরাপত্তাজনিত হুমকির কথা মাথায় রেখে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করার তারিখ বাড়ানো হয়।

এদিকে, সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সময়ে কোনো ধরনের আক্রমণের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন জেনারেল স্কট মিলার।

অন্যদিকে, চুক্তি সত্ত্বেও তারিখ পিছিয়ে দেওয়া সম্পর্কে তালেবানের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘চুক্তির লঙ্ঘন দখলদার বাহিনীর (পশ্চিমা সেনা) ওপর তালেবান যোদ্ধাদের যেকোনো ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিগত সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’

তবে কোনো ধরনের আক্রমণে যাওয়ার আগে তালেবান যোদ্ধারা তাদের নেতাদের নির্দেশের অপেক্ষা করবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সেনা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা বড় ধরনের হামলা এড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী কেন?
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারসহ তালেবানদের আরও দুটি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এই হামলার জন্য ইসলামপন্থি জঙ্গি বাহিনী আল কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করা হয়। সে সময় আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা উগ্র ইসলামপন্থি বাহিনী তালেবান ওসামা বিন লাদেনকে নিরাপত্তা দিয়েছিল এবং তাঁকে মার্কিন বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করতে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

নাইন ইলেভেন হামলার এক মাস পর আফগানিস্তানে বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন মিত্র দেশগুলো এতে যোগ দেয় এবং দ্রুতই তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর জোট ন্যাটোর সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে অবস্থান করছে।

কিন্তু, তাতে তালেবান শক্তি অদৃশ্য হয়ে যায়নি কিংবা তাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। তখন থেকে আফগান সরকারের পতন ঠেকাতে এবং তালেবানের হামলা প্রতিহত করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

এখন মার্কিন ও ন্যাটো সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার ফলে তালেবানের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো কারণ থাকবে না বলে ধরে নিচ্ছে অনেকে।

তবে, সবাই এত ইতিবাচক মনোভাব রাখতে পারছেন না।

কাবুলে একটি বেসরকারি রেডিওতে কর্মরত মিনা নওরোজি বলছেন, ‘অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আমরা আবারও তালেবানের সেই কালো অধ্যায়ে ফিরে যাব।’

‘তালেবানরা যেমন ছিল, তেমনই আছে। তারা বদলে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল এখানে তাদের উপস্থিতি আরও এক-দুই বছর বাড়ানো’, যোগ করেন মিনা নওরোজি।

বিবিসির পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সংবাদদাতা সিকান্দার কিরমানি বলছেন, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু আফগান সরকার ও জঙ্গিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে রয়েছে, তাই সংঘাত যে চলতে থাকবে, সে আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •