আবদুর রহমান খান

প্রাচীন ভারতে মৌর্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক। তার বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে বাংলা পর্যন্ত । খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ সাল সম্রাজ্যলোভী অশোকের শক্তিশালী বাহিনী পর্যুদস্ত করেছিল সমৃদ্ধশালী স্বাধীন রাজ্য কলিঙ্গ ।

ইতিহাস বলে প্রায় ১ লক্ষ মৌর্য সৈনিক ও ১ লক্ষ ৫০ হাজার কলিঙ্গ সেনার প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে বিজয় হয়েছিল সম্রাট অশোকের।

যুদ্ধে জয়ের পর অশোক পেয়েছিল কলিঙ্গের মৃত্যুপুরী, লাশের স্তূপ, স্বজন হারানোর আর্তনাদ। এই ভয়াবহ পরিণাম দেখে অশোক এতটাই মর্মাহত হন যে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন আর কখনো অস্ত্র স্পর্শ করবেন না ; যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না৷

এরপর সম্রাট অশোক বৈদিক ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। সেই সাথে তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের যুদ্ধ নীতি রদ করেন ও অহিংসার বাণী প্রচারে মনোনিবেশ করেন৷ বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলিতে নির্মান করেন বৌদ্ধ বিহার। অহিংসার বাণী খোদাই করে হাজার হাজার প্রস্তর স্তম্ভ স্থাপন করেন রাজ্যের গুরুত্বপুর্ন স্থানে। এরকম একটি ‘অশোক স্তম্ভ’ আজ ভারতের জাতীয় প্রতীক হয়ে রয়েছে।

একবছর স্থায়ী কলিঙ্গের যুদ্ধে আড়াই লক্ষ মানুষের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে দারুণ মর্মাহত সম্রাট আশোক “মহামতি অশোক” -এ রূপান্তরিত হয়েছিলেন।

কিন্তু আজকের আধুনিক ভারতে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমনে এ যাবত প্রায় দু’কোটি মানুষ আক্রান্ত হওয়া এবং দু’লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যুতেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কোন অনুশোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

‘সুপার স্প্রেডার’ নরেন্দ্র মোদি

ভারতের হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর স্থান সংকুলান হচ্ছে না। অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে রোগী। চারদিকে মৃত্যুশোক, স্বজন হারানোর আহাজারি , চব্বিশ ঘণ্টা জ্বলছে চিতার আগুণ। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার স্থানগুলোও সর্বোচ্চ যে পরিমাণ মৃতদেহ দাহ করতে পারে, তার চেয়েও অনেক বেশি লাশ যাচ্ছে সেখানে।

নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা বারাণসীর দুইটি প্রধান শ্মশান ঘাটে দিনে ৮০ থেকে ৯০টি মরদেহ দাহ করা হতো। কিন্তু গত এক মাস ধরে দিনে ৩০০ থেকে ৪০০টি মৃতদেহ পোড়ানো হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে তুলছে করোনার নয়া স্ট্রেন। গবেষকদের দাবি, এই স্ট্রেন ১৫ গুণ বেশি ভয়ঙ্কর! যার প্রকোপে তিন-চার দিনের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন রোগীরা! আরো ভয়ের কথা, এই স্ট্রেন অনায়াসে সংক্রমিত করে ফেলছে তরুণ প্রজন্মকে।

করোনাক্রান্ত ভারতে বাঘ-সিংহ

ভারতের করোনা পরিস্থিতির ভয়াভহতার মধ্যে গত ২৪ এপ্রিল হায়দরাবাদের নেহেরু জুলজিক্যাল পার্কের ৮ টি সিংহের শরীরে করোনা সংক্রমণ সনাক্ত হয়েছে। এর আগে বাঘের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

ভারতের করোনা পরিস্থিতিকে নিয়ে মোদী সরকারের কর্মকান্ডকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিশিষ্ট লেখিকা ও অধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়।

ইন্ডিয়ান মেডিকেল এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. নভজোৎ দাহিয়া প্রধানমনত্রী নরেন্দ্র মোদিকেই ‘সুপার স্প্রেডার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

করনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট । গত ২৭ এপ্রিল মাদ্রাস হাইকোর্ট বলেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য এ প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে দায়ী। সম্ভববতঃ এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার করা উচিত।

ইতোমধ্যে, ভারতজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে অক্সিজেন না পেয়ে মারা যাচ্ছেন অনেক কোভিড-১৯- আক্রান্ত রোগী। এ নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদের হাইকোর্ট ।

আদালত মঙ্গলবার ( ৪ মে) বলেছেন, শুধু অক্সিজেন না পেয়ে হাসপাতালে করোনা রোগীর মৃত্যু একধরনের অপরাধ, যা ‘গণহত্যার চেয়ে কম নয়’। এ হত্যার দায় কর্তৃপক্ষের, যারা অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাপনা করছে।

বারানসিতে জ্বলছে চিতা

ভারতে এখন কোভিডের যে তাণ্ডব চলছে, তার অন্যতম প্রধান শিকার হিন্দু তীর্থস্থান বারাণসী এবং তার আশপাশের অঞ্চল। শুধু বারণসী শহরে নয়, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের প্রত্যন্ত গ্রামেও। চিকিৎসা ছাড়াই ঘরে বসে ওই সব গ্রামের বাসিন্দারা মারা যাচ্ছেন।

বারাণসীতে হাসপাতাল অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে বেড পাচ্ছেন না, অক্সিজেন নেই, অ্যাম্বুলেন্স নেই। এমনকি কোভিড টেস্টের ফল পেতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে।

উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এই অঞ্চলের ক্রুদ্ধ বাসিন্দাদের অনেকে এখন খোলাখুলি প্রশ্ন করছেন, এই চরম দুঃসময়ে তাদের এমপি নরেন্দ্র মোদি, যিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তিনি লাপাত্তা কেন?

বিরোধী দল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা গৌরব কাপুর বলেন, ‘স্থানীয় বিজেপি নেতারাও গা ঢাকা দিয়েছেন। তাদের ফোন বন্ধ। অথচ এই সময় হাসপাতালে বেডের জন্য, অক্সিজেনের জন্য তাদের সাহায্য প্রয়োজন। পুরো অচলাবস্থা চলছে এখানে। মানুষজন ভীষণ রেগে আছে। সমস্ত দায় প্রধানমন্ত্রীর, আর কারও নয়। তাকে এই দায় নিতে হবে। গত দেড় মাস বারাণসীতে এবং ভারতে যত মৃত্যু হয়েছে তার দায় প্রধানমন্ত্রীর।’

৫ মে বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে , বারাণসীর অবস্থা খুব শিগগিরই ভালো হওয়ার কোনও লক্ষণ তো নেই-ই, বরং আরও খারাপ হচ্ছে। শহরের পরিস্থিতি সঙ্গীন। সেই সঙ্গে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রামে-গঞ্জে যেখানে চিকিৎসা সুবিধা নেই বললেই চলে।

সমালোচকরা এখন বলছেন, সরকার জীবন ও জীবিকা কোনওটাই বাঁচাতে পারছে না। বারাণসী জেলা প্রশাসন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কিছু সময়ের জন্য কারফিউ জারি করছে। আতঙ্কে অনেক দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। ফলে হাজার হাজার মানুষের কাজ নেই। অন্যদিকে ভাইরাস এখনও ছড়িয়ে পড়েছে।

মোদী মেড ডিজাস্টার

গতমাসে পশ্চিমবঙ্গে এক নির্বাচনী জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ভারতের করোনা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেছেন,এটা গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া মেড ডিজাস্টার , এটা মোদী মেড ডিজাস্টার।

গতবছর যখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয় তখন মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে মোদী সরকার । এতে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক আটকা পড়েন । তারা কর্মহীন হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের গ্রামে ফিরে গেছেন। পথেই মারা গেছেন অনেকে। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই সিদ্ধান্ত করোনা ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করেছে সরকারকে।

২০২০ সালের জুনে যখন ভারতে সবকিছু খুলে দেয়া হয় তখনই আবার করোনা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। জানুয়ারিতে করোনা সংক্রমণ অনেক কমে আসে। এ সময় মোদি ভারতের সফলতা জোর গলায় বলতে থাকেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তিনি বলেন, কার্যকরভাবে করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করে তার দেশ বড় এক বিপর্যয় থেকে ভারতের মানবতাকে রক্ষা করেছে। তার দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে তারই ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দল থেকে বলা হয়, তিনি কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতকে গর্বিত এক বিজয়ী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০২০ সালের মার্চে ৩০০০ মানুষের অংশগ্রহণে মুসলিমদের তাবলীগ জামাত সমাবেশে হয়েছিল। সেখান থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে মোদী সএরকার সরকার দায়ী করেছিল মুসলিমদের। যদিও আদালতও এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।

এ বছর মধ্য মার্চে পরিস্থিতি উল্টে গেল । এ সময় গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচে যোগ দেন হাজার হাজার মানুষ। সেখানে ভাবখানা এমন ছিল যে, করোনা সংক্রমণ কিছুই না। এরও পরে গঙ্গায় কুম্ভমেলায় যখন লাখ লাখ হিন্দু ধর্মীয় মানুষের সমাবেশ ঘটে তখন মোদি এবং তার রাজনৈতিক মিত্ররা তাদেরকে স্বাগত জানায়। এপ্রিল মাস জুড়ে কুম্ভমেলায় লাখো মানুষ গঙ্গাস্নানে সমবেত হন।

এরপর পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচনী র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেছেন মোদী ও তার দল বিজেপির বড় বড় নেতারা। তাতে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ হয়েছিল। তাদের খুব কম মানুষের মুখেই ছিল মাস্ক।

ভারতের জন্য পাকিস্তানি গান

করোনার (Covid-19) দ্বিতীয় ঢেউয়ে পর্যুদস্ত ভারতের চরম সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ ওষুধ, অক্সিজেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ভারতের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে ।

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে অক্সিজেনের অভাবে রাস্তায় মানুষের মৃত্যু এবং সৎকারের সুযোগ না পাওয়া মানবদেহ কুকুর ছিড়ে খাচ্ছে যেন ভারতের আসল চিত্র তুলে ধরেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বেসামাল ভারত। ইতিমধ্যে জারতিসংঘ সহ ৪০টির বেশি দেশ থেকে ভারতকে সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকার যে অক্সিজেন প্লান্ট ও ট্যাংকার এবং ওষুধসামগ্রী সরবরাহ করছে, সামাজিক মাধ্যমে ভারতের কূটনীতিকরা তার সরাসরি প্রশংসা করছেন।

এর মাঝেই কঠিন করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতের পাশে থাকার বার্তা দিয়েই গান গাইলেন পাকিস্তানি গায়ক জিশান আলি এবং নৌমান আলি।

ভারতের বিখ্যাত সুরকার তথা মিউজিক ডিরেক্টর এ আর রহমানের গাওয়া ‘আরজিয়া’ (Arziyan) গানটির দু একটা শব্দ পরিবর্তন করে জিশান-নৌমানরা গাইলেন – ”হসলা না হারো ইয়ে ওয়াক্ত ভি টাল জায়েগা, রাত জিতনি ঘানি হো ফির সবেরা আয়েগা।” যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়- আশা ছেড়ে দিও না। এটাও কেটে যাবে। রাত যতো গভীর হোক, ফের সকাল আসবে।

ফেসবুকে গানের ভিডিওটি পোস্ট করেন নৌমান আলি। ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে তাঁদের সেই গানের ভিডিও। নেটদুনিয়ায় অনেকেই পাকিস্তানি গায়কদের এই প্রয়াসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অনেক ভারতীয় ফেসবুক ইউজার কমেন্টে তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

( ০৫ মে ২১ )

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •