বাংলাট্রিবিউন: সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে নির্যাতন করে দেশব্যাপী সমালোচিত হওয়া ফৌজদারি মামলার আসামি এস এম রাহাতুল ইসলামকে আবারও তার দায়িত্ব ফিরিয়ে দিয়ে পুরস্কৃত করেছে সরকার। ওএসডি থাকা এই সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় মামলা ও সাংবাদিক আরিফের দায়ের করা ফৌজদারি মামলা থাকার পরেও তাকে সম্প্রতি বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে ফের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি, ফৌজদারি মামলা থাকার পরেও তাকে দিয়েই পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে মধ্যরাতে বাসার দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার ঘটনার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি।

কুড়িগ্রামের তদানীন্তন জেলা প্রশাসকের নামে একটি সরকারি পুকুরের নামকরণ ও অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার কারণে ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে নারকীয় নির্যাতন চালানো হয় সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানের ওপরে। সে রাতে ডাকাতদের মতো ঘরের দরজা ভেঙে স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের সামনে তাকে মারধর করতে করতে তুলে নিয়ে যায় জেলা প্রশাসনের কথিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর ক্রসফায়ারে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে এসে বিবস্ত্র করে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।

সম্প্রতি বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডের তরমুজের আড়তে  জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন বিতর্কিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলাম। (ছবি: বাংলা ট্রিবিউন)সম্প্রতি বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডের তরমুজের আড়তে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন বিতর্কিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলাম। (ছবি: বাংলা ট্রিবিউন)

এতেও থামেনি নির্যাতন। পরে মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আরিফের বিচার করা হয় এবং তার কাছে আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে মধ্যরাতেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এই প্রহসনের বিচারের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছিলেন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও তার সঙ্গে ছিলেন এই রাহাতুল ইসলাম। তার সঙ্গে এ ঘটনায় আরও জড়িত ছিলেন কুড়িগ্রামের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন  ও আরডিসি নাজিম উদ্দিনসহ  তাদের নির্দেশ পালন করা অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

ওই রাতেই বাংলা ট্রিবিউনসহ অন্য গণমাধ্যমগুলোতে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হলে এবং দেশজুড়ে সাংবাদিকসহ সচেতন মানুষদের আন্দোলন শুরু হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় পরদিন ঘটনাস্থলে যান রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। তার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসক পারভীন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাতুলসহ ওই চার কর্মকর্তাকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। আর জামিনে ছাড়া পান সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগান।

দেশজুড়ে আলোচিত এমন একটি ঘটনায় অভিযুক্ত এই চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেখানে উচ্চ আদালত মামলা চলবে বলে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন তাদের একজন রাহাতুল ইসলামের আবারও দায়িত্বে ফেরা এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পরিচালনা করায় আবারও কেউ ভুক্তভোগী হয় কিনা সে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় মামলা চলমান অবস্থাতেই কোনও এক অজ্ঞাত প্রক্রিয়ায় ওএসডি অবস্থা থেকে সম্প্রতি বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেছেন অভিযুক্ত এস এম রাহাতুল ইসলাম।

বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র ও নগরীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ভিডিও ফুটেজ দেখে জানা গেছে, একটি ফৌজদারি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও যোগদানের পর থেকে থেকে রাহাতুল ইসলামকে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন।

ওই সাক্ষাৎকার দেখার মাধ্যমেই সাংবাদিক নির্যাতনকারী রাহাতুল ইসলামের বরিশাল জেলা প্রশাসনে যোগদানের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। এরপর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নিজস্ব ওয়েব সাইটেও তার নাম, পদবি ও ছবিও পাওয়া যায়। তবে তিনি কবে যোগদান করেছেন এ বিষয়টি এখনও পরিষ্কার হওয়া যায়নি।

 সাংবাদিক আরিফকে নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের সেই চার কর্মকর্তা। ছবিতে ডানে রাহাতুল।

এ ব্যাপারে বরিশালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাতুল ইসলামকে তার বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে বলেন, ‘এটা আমার অথরিটির কাছ থেকে জানেন।’

ফৌজদারি মামলার আসামিকে দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা কতটা আইনসিদ্ধ এ প্রশ্নের জবাবে বরিশালের জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মামলায় তিনি অপরাধী প্রমাণিত না হবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল পাওয়ার (নির্বাহী ক্ষমতা) থাকবে। তার তো ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল পাওয়ার আছে। সরকার তার ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল পাওয়ার যতক্ষণ সিজ করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ম্যাজিস্ট্রেট।’

 

সাংবাদিক আরিফুল ইসলামসাংবাদিক আরিফুল ইসলাম

জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলায়  গত বছরের শেষদিকে  কুড়িগ্রামে আরডিসি নাজিম উদ্দিন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাতুল ইসলামের জেরার মুখোমুখি হন ভুক্তভোগী সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম। সেখানে রিন্টু বিকাশ ঘটনা স্বীকার করলেও নাজিম ও রাহাতুল ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে দাবি করতে থাকেন এবং নানা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করেন। সেসময় দায়িত্বশীল অন্য কর্মকর্তারা তাদের অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বাদ দেওয়ার আহ্বান জানালেও তারা সেসব বিষয় নিযেই কথা বলেন। এরপর গত ডিসেম্বরে  একই মামলায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম ও তার স্ত্রীকে সচিবালয়ে ডেকে নিয়ে  মামলার আসামি সুলতানা পারভীনের মুখোমুখি করা হয়। সেখানে সুলতানা পারভীনও অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং সাংবাদিক দম্পতিকে ব্যক্তিগত আক্রমণের চেষ্টা চালান। এসব নিয়ে গণমাধ্যমগুলোতে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। তবে এ বিভাগীয় মামলায় রায়  হয়েছে কিনা তা ভুক্তভোগী জানেন না। তবে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে তার দায়ের করা ফৌজদারি মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন এখনও নিম্ন আদালতে জমা পড়েনি।

উল্লেখ্য, সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে নির্যাতন ও তার সাজার বৈধতা নিয়ে গত ১৫ মার্চ অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের তদানীন্তন নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট দায়ের করেন। রিট আবেদনে টাস্কফোর্সের নামে ভ্রাম্যমাণ আদালতে আরিফুল ইসলামকে অবৈধ সাজা ও আটক করা কেন সংবিধান পরিপন্থী হবে না, তাকে ৫০ লাখ টাকা কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়।

এছাড়াও রিটে কুড়িগ্রামের ডিসি, সিনিয়র সহকারী কমিশনার, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে তাদের ভূমিকার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তলবের নির্দেশনা চাওয়া হয়। একইসঙ্গে আরিফের বিরুদ্ধে করা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মামলার নথি এবং টাস্কফোর্স পরিচালনার নথি তলবের নির্দেশনা চাওয়া হয়। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত আরিফুল ইসলামকে রিট আবেদনে পক্ষভুক্ত হতে নির্দেশ দেন। এরপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুলসহ ওই মামলার আদেশ দেন।

উচ্চ আদালতের এ নির্দেশের পর গত বছরের ৩১ মার্চ কুড়িগ্রামের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলামকে অভিযুক্ত করে কুড়িগ্রাম সদর থানায় মামলা করেন আরিফুল ইসলাম রিগান। যদিও এ মামলা দায়েরের এক বছর অতিবাহিত হলেও একজন অভিযুক্তকেও গ্রেফতার করেনি পুলিশ।

তবে বেশ কয়েক মাস ধরে তাদের জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ দায়িত্বে (ওএডি) ন্যস্ত করে রাখা হয়েছে। এরইমধ্যে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে নিয়োগ পেলেন এস এম রাহাতুল ইসলাম।

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম জানান, বেআইনিভাবে দলবদ্ধ হয়ে বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ, মারপিট করে সাধারণ ও গুরুতর জখম, অপমানের লক্ষ্যে অসম্মান, হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ, ক্ষতিসাধন, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান এবং এসব কাজে সহায়তা ইত্যাদি বিষয়ে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

 সাংবাদিক আরিফের শরীরে আঘাতের চিহ্ন (ফাইল ছবি)

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, যে কোনও ক্রিমিনাল মামলার তদন্ত করতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সিআরপিসি, ১৭২ ধারা অনুসারে আবশ্যকভাবে কেস ডায়রি (সিডি) লিপিবদ্ধ করতে হয় এবং ওই সিডিতে আসামিকে গ্রেফতারের জন্য যে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা উল্লেখ করতে হয়। আসামিকে গ্রেফতার করতে না পারলে তাকে (আসামিকে) অবশ্যই পলাতক হিসেবে সিডিতে উল্লেখ করতে হবে। সে অনুযায়ী জিআর ৮৩/২০২০(কুড়ি) নম্বর মামলার (সাংবাদিক আরিফুলের করা মামলার) আসামিরা যেহেতু গ্রেফতার হননি সেহেতু তারা ওই সিডি অনুসারে পলাতক আসামি। সেই পলাতক আসামি রাষ্ট্রের সরকারি কোনও পদে চাকরি করলে তাকে অবশ্যই গ্রেফতারের জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুড়িগ্রাম সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. গোলাম মর্তুজার কাছে অভিযুক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মামলার তদন্তে পলাতক দেখানো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে পরে জানাতে পারবো।’

প্রসঙ্গত, কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন একটি পুকুর সংস্কার করে নিজের নামে নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। রিগান এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। এছাড়া জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েও রিপোর্ট করতে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। এ বিষয়গুলো জানতে পেরে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে সতর্ক করা হয়। এরপর গত বছরের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে বাড়িতে হানা দিয়ে মারধর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় রিগানকে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •