বেশ ক বছর আগের কথা। এক স্বজনের বিয়ের পারপাসে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এক বাসায় গেছি। গিয়ে দেখি যাঁর কাছে গেছি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগেরই সিনিয়র বোন। দীর্ঘাঙ্গী, রূপবতী ও প্রাণোচ্ছ্বল সেই বোনটি এখনো আগের মতোই আছেন, শুধু চোখের নিচে একটু কালসিটে। ঐ এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন তিনি। স্বামীর সূত্রে তিনি উঁচু সোসাইটির মানুষ।
বিভাগের ছোটভাই পেয়ে কী যে খুশি তিনি! প্রতিষ্ঠানটির পাশেই ডুপ্লেক্স টাইপের বাসায় তাঁর বাস। নিচের বসার ঘর থেকে পুবদিকে মুক্ত আকাশ দেখা যায়। অভিজাত বনানীর সুউচ্চ অট্টালিকার সারি দৃষ্টির গোচরে। নিজের হাতে চা নিয়ে এসে আপা হাপুস হুপুস গল্পে মেতে উঠলেন। মনে হলো কথা শোনার মানুষ পান না কতদিন। কাজেই শ্রোতার ইচ্ছা-অনিচ্ছার দিকে তাকানোর অবকাশ তার নেই। তিনি কথা বলে যেন ভারমুক্ত হতে চান। আমি তাঁকে ভারমুক্ত করতে হু হা করে যাই। একসময় তিনি বলে উঠেন, ঐ যে উঁচু এপার্টমেন্টগুলো দেখছ, আমার ইচ্ছে করে সেগুলো গুড়িয়ে দেই। প্রতিটি ফ্লাট প্রতিটি এপার্টমেন্ট দোজখের মিনি সংস্করণ। ঐ দোজখে জ্বলছে স্ত্রীরূপী অভিশপ্ত নারীরা। কিন্তু সোসাইটিতে তারা সেজেগুজে স্বামীদের হাত ধরে হাসিমুখে চলেন। ঐ সামাজিক হাতধরাটুকুতেই স্বামীর কাছ থেকে তাদের প্রাপ্তি সীমাবদ্ধ। দিনের পর দিন রাতের পর রাত অনেক নারী স্বামীর সান্নিধ্য সুখ বঞ্চিত। কোনো স্বামী রাতে ঘরে ফিরে কোনো স্বামী ফিরে না। ঐ এপার্টমেন্টগুলোতে অসংখ্য রক্ষিতার বাস। অনেক স্বামী মজে থাকে রক্ষিতার প্রেমে, ঘরে ক্রন্দনগোজারি করে রাত কাটায় তাদের প্রেমময়ী স্ত্রী। তিনি বলেন, আজকাল উচ্চবিত্ত শ্রেণির নারীদের বেপথু হওয়া নিয়ে অনেক কাহিনি চাওড়। কিন্তু সবাই খারাপ নয়। কিছু নারী বেপথু হয়, এমনকি এসকর্ট সার্ভিসে হাত বাড়ায় মূলত স্বামীর উপেক্ষাজনিত ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা থেকে। বাঙালি মেয়েরা স্বামীসোহাগী, ধার্মিক ও সংসারী তা সে ধনী হোক আর গরিব।
চোখ ছল ছল করে আপা বলেন, সমাজের নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির নারীরা সবচেয়ে দুঃখী। নিম্নবিত্ত নারীরা তবু স্বামীর সাথে ঝগড়া করতে পারেন, প্রয়োজনে মারামারিও রাস্তার ওপর করেন, কিন্তু সোসাইটি, পারিবারিক সম্মান ও সন্তানদের কথা ভেবে উঁচু শ্রেণির নারীরা সবকিছু চেপে থাকেন। সুখে থাকার অভিনয় করে যান। এই অভিনয় করে যাওয়া যে কত কষ্টের তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আমি বলি, মধ্যবিত্তদের মুরোদ নেই বলে ভালো আছে বুঝলেন আপা। তাদের মনেও যে দেওয়াল টপকানোর খুসখুসানি নাই তা কিন্তু বলা যাবে না। আপা বলেন, ঠিক। তিনি বলেন, অধিকাংশ পুরুষের আর্থিক সঙ্গতি যত বাড়ে তত বাড়ে স্ত্রীর বঞ্চনা। বলতে গেলে স্বামীর অর্থবিত্তের সমানুপাতিক স্ত্রীর কষ্ট। গাড়ি হয় বাড়ি বা ফ্লাট হয় কিন্তু হারিয়ে যেতে থাকে স্বামীর সোহাগ, ভালোবাসার পরশ। আপা বলেন, অনেক স্ত্রী স্বামীকে হারিয়েছে স্বামী মিশনে যাওয়ার ফলে। মিশন থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ফিরার পর কেউ কেউ স্ত্রীর কাছে অচেনা হয়ে উঠেছেন। নতুন ফ্লাট নতুন বন্ধু। স্ত্রী যেন বড়ই পুরানো ও বেমানান সেখানে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বসুন্ধরার আনভীরের সাথে তার অপরূপা স্ত্রীর ছবির পাশাপাশি তার বান্ধবী মুনিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ ছবি দেখে সেই আপার কথা বেশ মনে পড়ছে। বাংলাদেশের সমস্ত সম্পদের একটি বড় হিস্যার যিনি মালিক তার স্ত্রী হয়েও কী হতভাগিনী না আনভীরপত্নী! রক্ষিতাগামী স্বামীর অরক্ষিত এক দু:খিনী এবং অপমানজর্জর স্ত্রী তিনি। স্বামীর বিপুল সম্পদ থাকার পরেও তিনিই আসলে সবচেয়ে নি:স্ব এক মানবী। আমার মনে প্রশ্ন জাগছে দুনিয়াতে মুনিয়াই কি একমাত্র বান্ধবী ছিল আনভীরের? মনে তো হয় না। পিকে হালদারের যদি ৭০জন বান্ধবী থাকতে পারে তাহলে আনভীরের একটাতে পোষাবে কেন? বহুগামিতার কথাই যখন এল একজন চ্যাম্পিয়নের গল্প বলি। তিনি ছিলেন উপকূলীয় এক এলাকার জনপ্রতিনিধি। ব্যাংক-বিমা-ব্যবসার পাশাপাশি তার একাধিক পত্রিকাও ছিল। একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন শ্রদ্ধেয় এক সিনিয়র ভাই, যিনি ছিলেন আমার বার্তাসম্পাদক। তিনি গল্পটি শুনিয়েছেন। শুধু আমি নই সহকর্মীদের অনেকেই শুনেছেন। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে নাকি সেই চ্যাম্পিয়ন আমার সেই সিনিয়র ভাইয়ের হাত ধরে বেদনার্ত কণ্ঠে আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ভাই রে শরীরটা বিগড়ে গেল। অল্পের জন্যে মনে হয় টার্গেট ফিলাপ হলো না। বড় আফসোস থাকল মনে। তাঁর অপূর্ণ টার্গেট কী ছিল জানেন? -এক হাজার ভিন্ন ভিন্ন নারীর সঙ্গসুখ লাভ! শেষতক তার আশা পূরণের আগেই ওপরওয়ালা ডেকে পাঠান তাকে।
আমরা কথায় কথায় পশ্চিমা দুনিয়ার অবাধ যৌনতার নিন্দায় মেতে উঠি। বিভিন্ন সোর্সের পরিসংখ্যান দিয়ে দেখাই সেখানে একজন পুরুষ জীবনে গড়ে কয়জন নারীর সঙ্গসুখ নিয়ে থাকেন। ঐ কথিত ইহুদি নাসারাদের হিসেবটা আমরা জানি কারণ ওরা সত্যকে স্বীকার করে, ওখানে গবেষণা হয়, রাখঢাকের ভণ্ডামি তারা করে না। ভেতরে ভেতরে আমাদের দেশ যে তাদের ছাড়িয়ে গেছে সেটা স্বীকার করতে আমরা কুণ্ঠিত হই। রক্ষণশীলতা আর লেবাসি ধর্মভীরুতার আড়ালে যে সমাজটা পচেগলে বীভৎস রূপ ধারণ করেছে আমরা স্বীকার করি বা না করি, সেটাই সত্যি। যৌনতাবিষয়ে ট্যাবুটাই কেবল টিকে আছে। হারিয়ে গেছে মূল্যবোধের সবটুকু।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষের যৌনদুর্বৃত্তপনাকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। মনে করে একআধটু বদামায়েশি না করলে আর বেটা ছেলে হলো কীভাবে। আর ধনী মানুষ হলে তো কথাই নেই। ধন বৃদ্ধির সাথে বায়োলজিক্যাল ধনের বৃদ্ধি সমানুপাতিক না হলেও অঙ্গটার যথেচ্ছ ব্যবহারকে অনেকে মনে করে স্বাভাবিক কিংবা অধিকার। পুরুষের নৈতিকতাশূন্য যৌনবিকার বা হাইপার সেক্সুয়ালিটির শিকার হতে হতে অনেক নারী পুরুষদেরই ফাঁদে ফেলার পথ বেছে নিয়েছে। যৌনতাকে শরীরী বিনিয়োগ ভেবে নিজেই হয়ে উঠেছে যৌনপণ্য। অনেকের কাছে ভোগ ও অর্থাগমের উপায় এখন যৌনতা। পুরুষের বহুগামিতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে অনেক নারী। সামান্য বেতনের চাকুরি করা ছেলে যখন সম্পদের পাহাড় গড়ে তখন যেমন কোনো বাবা-মা পুত্রের অর্থের উৎস খুঁজে না তেমনি অনেক অর্থলোভী বাবা মা কন্যার বিলাস-ব্যাসন-অর্থের উৎসও খুঁজে দেখেন না। বড়লোকের কামপিপাসা মিটাতে গিয়ে অকালে ঝরে যাওয়া মুনিয়া নামক কলেজে পড়া ময়েটি যে লাখ টাকা ভাড়ার বাসায় একা থাকত সেটি কি তার পরিবারের সদস্যদের ভাবায়নি? বয়সবিচারে মেয়েটিকে সুপথে পরিচালিত করার দায় এড়াতে পারবে কি তার পরিবার? নাকি মেয়েটির অনৈতিক আয়ের উচ্ছিষ্টভোগে তারা লালায়িত ছিল? আমি মনে করি মুনিয়াকে আগে মেরেছে তার পরিবার, পরে অন্যরা।
কয়েক বছর আগে মগ বাজার এলাকার একটি হোটেলে পুলিশ রেইড দেয়। সেখানে ধরা পড়ে দুই ডজন নারী-পুরুষ। ইত্তেফাক পত্রিকা ধৃত নারীদের জবানিভিত্তিক একটি রিপোর্ট করেছিল। তাতে দেখানো হয় যে, ঐ নারীদের সবাই পেশাদার যৌনকর্মী নয়। তাদের মধ্যে একজন উচ্চবিত্তের সন্তান। সে অর্থের প্রয়োজনে হোটেলে আসেনি। ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীর সাহচর্য নেওয়া তার নেশা। এজন্যে সে নিজে টাকা খরচ করতেও রাজি। কয়েকজন ছিল সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তারা পরিবারের ওপর চাপ কমাতে এবং শপিং ও বাড়তি হাত খরচা যোগাড় করতে এ পথে নেমেছে। একজন ছিলেন মধ্যবিত্ত ঘরের গৃহবধূ, দু-সন্তানের জননী। স্বামীর একার আয়ে সংসারে টানাপড়েন। সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে তিনি এই পথে নেমেছেন স্বামীর অনুমতি নিয়েই। নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকাসহ নানা স্থান হতে আদিম ব্যবসায়ের আখড়া উঠিয়ে আমরা যেন শরীরের এক স্থানের ঘা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দিয়েছি।
কিছুদিন থেকে আমার সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ ছেলেটির সাথে ড্রয়িং রুমে বসতে বিশেষ করে টিভি দেখতে ভীষণ অস্বস্তিতে আছি। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো মামুনুল হকের বিষয়ে যেভাবে চব্বিশ ঘন্টা আদিরসঘন আলোচনা-সমালোচনা করছে তা এই রোজার দিনে শুনতে খুব রুচিতে বাধছিল। কাল যখন বসুন্ধরা-মুনিয়া ইস্যু হাজির হলো তখন ভাবলাম, এবার মনে হয় ট্র্যাক চেঞ্জ হবে। ইফতারির পর টিভি দেখতে গিয়ে দেখলাম, না আমার ধারণা ঠিক নয়। নামের আদ্যক্ষরে ‘স’ আছে এমন একটি চ্যালেন মনে হয় শপথ করে এসেছে আনভীর বা বসুন্ধরার নাম মুখে নেবে না বলে। পুলিশের বরাত দেওয়ার সময় পুলিশ বসুন্ধরা ও অভিযুক্তের নামোচ্চারণ করলেও চ্যানেলটি ‘একটি শিল্পগ্রুপ’ এর বাইরে কিছু বলল না। সোশাল মিডিয়া না থাকলে গোটা মিডিয়াগোষ্ঠী ভাসুরের নাম নিত না, নিশ্চিত।
মুনিয়াকে অনেকে রক্ষিতা বলে গালি দেবেন কিন্তু তার চেয়ে বড় গালি দেওয়া উচিত আমাদের মিডিয়াকে যারা অপরাধীদের রক্ষক। যারা চোখে ঠুলি পরে আছে। পেশাদারিতা, নৈতিকতা ও সত্যাশ্রয়ের বদলে যারা তোষামুদিতে আত্মবিক্রীত। যাদের কাছে বিজ্ঞাপন আর অর্থের কাছে সকল দায়বদ্ধতা পরাজিত। বাংলাদেশে সামগ্রিক পতনের মধ্যে সাংবাদিকতা পেশাটি সবচেয়ে বেশি পতিত। এই পেশায় জীবনের ১০ বছর কাটিয়েছি, ভাবতেই লজ্জা লাগে।
পতনের খাদ থেকে উঠে দাঁড়ানোতেই জীবনের সাফল্য। আমাদের সকল ক্লেদ ও পাপের পঙ্ক থেকে উঠে আসতে হবে। নশ্বর জীবনের এই ক্ষণিক ভোগের নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের চিরায়ত মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তা ও পরকালের কথা স্মরণ করতে হবে। পরিবারকে করে তুলতে হবে শুদ্ধ জীবনবোধ লালনের মন্দির। যাতে কোনো পরিবারেই মুনিয়ার মতো আর কোনো দুর্ভাগা সন্তানের জন্ম না হয়।
মুনিয়াকে নিন্দা করা বা গালি দেবার আগে একবার সমাজের দিকে তাকান। তার পরিবারের দায়িত্বের কথা ভাবুন। মুনিয়ার অন্ধকার দুনিয়া গড়ে দিয়েছে আমাদের অন্ধকার সমাজ। মুনিয়া আসলে এই পতনমুখী সমাজের বলী। ধনিকশ্রেণির সীমাহীন কামলোলুপতার শিকার নির্বোধ মেয়ে মুনিয়া।

– লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহিত। লেখকের নাম পাওয়া যায়নি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •