সিবিএন ডেস্ক:

একসময় যে হেফাজতে ইসলামকে খুশি রাখার জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেই সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণে আনাই এখন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম লক্ষ্য। আস্থাশীল নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠনটিকে আগের মতো বোঝাপড়ার মধ্যে নিতে চায় সরকার। এই লক্ষ্যে বর্তমান হেফাজতের নেতাদের গ্রেপ্তার, চাপ প্রয়োগ এবং ভেতরে-ভেতরে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চলছে।

সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এই চিন্তা ও তৎপরতার কথা জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, সরকার মনে করছে, হেফাজতে পছন্দমতো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সংগঠনটি পরবর্তী সময়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এ জন্য সরকারের একটা পক্ষ প্রয়াত আমির শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীসহ তাঁর অনুসারীদের বা অপেক্ষাকৃত উদারপন্থীদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে চাইছে। তবে সরকারের ভেতর আরেকটি পক্ষটি বলছে, আনাস মাদানী বা বাবুনগরী—কোনো পক্ষকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাবে না। তাই কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, হেফাজতের বিষয়ে সরকার আর কোনো দুর্বলতা দেখাবে না। তাদের সংঘাত-সহিংসতার যে প্রাপ্য, তা বুঝিয়ে দিতে হবে। কারণ, তারা সুযোগ পেলেই আঘাত করে।

২০০৯ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম প্রথম দৃশ্যমান হয়। তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীদের সম-অধিকার দিয়ে প্রণীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার বিরোধিতায় মাঠে নামে তখন। এক বছর পর তারা আবার রাস্তায় নামে জাতীয় শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। তবে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরের অবস্থানকে কেন্দ্র করে। এরপর দীর্ঘ সময় হেফাজতকে সন্তুষ্ট রাখা বা সংগঠনটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কাজ করে গেছে সরকার। হেফাজতের শীর্ষ নেতারাও সরকারের প্রতি আস্থা রাখার ঘোষণা দেন বিভিন্ন সময়।

সম্পর্কের পূর্বাপর
সরকার, আওয়ামী লীগ ও ১৪-দলীয় জোটকেন্দ্রিক বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে অভিযানের সময় হেফাজতের তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় আটকা পড়েন। সেখান থেকেই হেফাজতের নেতৃত্বের একটা অংশের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ তৈরি হয়। এরপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, প্রতিনিধিরা হেফাজত নেতাদের সঙ্গে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বৈঠক করেন। অন্তত তিনজন মন্ত্রী, একজন মেয়র, জন পাঁচেক সাংসদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল হাটহাজারী মাদ্রাসায়।

২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি ময়দানে হেফাজত আয়োজিত দুই দিনব্যাপী শানে রিসালত সম্মেলনে সংগঠনের আমির শাহ আহমদ শফী বলেছিলেন, ‘হাসিনা সরকার, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ—সবাই আমাদের বন্ধু। এদের সঙ্গে কোনো আদাবত (শত্রুতা) নাই। কেউ যদি বলে, হাসিনা সরকার, ছাত্রলীগ আমাদের দুশমন, এটা বোঝাটা ভুল হবে।’

২০১৭ সালের শুরুতে হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে পাঠ্যবইয়ে ২৯টি বিষয় সংযোজন ও বিয়োজন করে সরকার। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির দুটি পাঠ্যবই ছাপা হওয়ার পর জাতীয় পাঠ্যক্রম সমন্বয় কমিটির নজরে আসে যে হেফাজতের দাবি অনুসারে দুটি লেখা বাদ পড়েনি। তত দিনে প্রায় ১৫ লাখ বই ছাপা হয়ে যায়। পরে সেগুলোও বাতিল করে সরকার।

২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ আহমদ শফীসহ কয়েক শ আলেমের উপস্থিতিতে গণভবনে এক অনুষ্ঠানে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরের বছর ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে আইন পাস করে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান করা হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •