সিবিএন ডেস্ক:

সর্বাত্মক লকডাউনে আদালত বন্ধ থাকায় মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার কার্যক্রম কিছুটা স্থবির হয়ে রয়েছে। একজন আসামি এখনো পলাতক। তবে বিচারকাজ শুরুর অন্যান্য কাজ এগিয়ে রয়েছে। আদালত খুললে এই মামলার কাজও শুরু হবে।

গত ৮ এপ্রিল বিচারিক আদালতে আলোচিত এই মামলার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু করোনার প্রকোপ বাড়ায় দেশে সরকারের বিধিনিষেধ জারির কারণে সেদিন আর কার‌্যক্রম চলেনি।

এরই মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে মামলার সব নথিপত্র কক্সবাজার জেলা জজ আদালতে পৌঁছেছে। পাবলিক প্রসিকিউটর জানান, করোনার বন্ধের কারণে নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন হয়নি। মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে, আদালত তা মঞ্জুর করেনি।

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে মেজর সিনহা হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তখন ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তাতে আলোচিত সিনহা হত্যা মামলা গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত তদন্ত ও অভিযোগপত্র দায়েরের মাধ্যমে তা বিচারিক পর‌্যায়ে চলে যায়।

সিনহার বোনের করা মামলার আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘করোনায় আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমানে মামলার কার্যক্রম থেমে আছে। এ ছাড়া আর কোনো বাধা নেই। আদালত চালু হলে মামলার কার্যক্রম নিজস্ব গতিতে শুরু হবে।’

গত বছরের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। তখন নিহতের গাড়ি থেকে কিছু ইয়াবা, গাঁজা ও মদ উদ্ধারের কথা বলে পুলিশ। দায়ের করা হয় একাধিক মামলা। কিন্তু ঘটনার পরদিনই পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’ ক্ষোভ প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়, গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জনগণও প্রতিবাদী হয়।

ওই বছরের ৫ আগস্ট এই ঘটনায় নয়জন পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন মেজর (অব.) সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার। আদালত মামলাটি আমলে নেয় এবং টেকনাফ থানাকে মামলাটি নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। আসামিরা আদালতে দ্রুত আত্মসমর্পণ করেন। মামলার তদন্তভার পাওয়া র‌্যাব র‌্যাব হত্যাকাণ্ডের চার মাস দশ দিন পর কক্সবাজার আদালতে ২৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়। র‍্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম চার্জশিটে সিনহা হত্যার ঘটনাটি ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ বলে উল্লেখ করেন।

গত ৮ এপ্রিল এই মামলার দিন ধার্য ছিল জানিয়ে সিনহার বোনের আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মামলায় একজন আসামি পলাতক রয়েছেন। আর বাকি আসামিরা কারাগারে আটক। পলাতক আসামির বিচারের জন্য যেসব নিয়ম আছে, যেমন- ওয়ারেন্ট, পেপার পাবলিশড- এগুলো সব শেষ হয়েছে। দেড় সপ্তাহ আগে ফাইল ট্রান্সফার হয়ে জজকোর্টে গেছে। ওখানে নরমাল যে ট্রায়াল প্রসিডিউর আছে, সেভাবে বিচারকাজ শুরু হবে।’

কোনো পলাতক আসামির বিচার পরিচালনা করতে হলে আদালত থেকে সমন জারি করা হয়। তাতেও আসামি হাজির না হলে হুলিয়া জারি, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। যদি তাতেও আসামি হাজির না হয় তাহলে তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ শুরু হয়। সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশের কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক। তার অনুপস্থিতিতে এখন বিচার শুরু করতে আইনগত আর বাধা নেই বলে জানান আইনজীবী।

আটক আসামিদের জামিন চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিনহার বোনের আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, তারা অনেকবার জামিন চেয়েছেন। কিন্তু আদালত তা মঞ্জুর করেনি। করোনায় আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমানে মামলার কার্যক্রম থেমে আছে। এ ছাড়া আর কোনো বাধা নেই।’

মামলাটি বিচারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে ফাইলপত্র জজকোর্টে এসেছে জানিয়ে পিপি ফরিদুল আলম বলেন, ‘তবে তা আদালতে উপস্থাপন হয়নি। করোনায় আদালত বন্ধের কারণে এখনো কিছু করা যায়নি। আসামিপক্ষ বেশ কবার জামিন চেয়েছে। তবে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় আসামিদের জামিন দেননি আদালত।’

পুলিশসহ মোট অভিযুক্ত ১৫ জন

সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় র‌্যাব। এতে মোট ১৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয় হয়। তাদের মধ্যে নয়জন টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য, তিনজন এপিবিএনের সদস্য এবং তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি। এর মধ্যে পুলিশের কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক। আর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার ১৪ জনই কারাগারে আছেন।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১২ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। শুধু ওসি প্রদীপ এবং কনস্টেবল রুবেল শর্মা আদালতে জবানবন্দি দেননি।

র‌্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা ৮৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেন। বিভিন্ন ধরনের আলামত ও ডিজিটাল কন্টেন্ট আমলে এনে হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযোগপত্র দেন তিনি।

কারাগারে রয়েছেন যারা

মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারসহ অভিযুক্ত ১৪ জন কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা হলেন- বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, তার দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

 

তদন্ত যা বের হয়

অভিযোগপত্র সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৭ জুলাই সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সিফাত ও রুফতি নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে তাদের জিম্মি দশা, অত্যাচারের ঘটনা মেজর সিনহাকে জানায়। এসব জানতে পেরে সিনহা পীড়িত হন।

আরো জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ ওসি প্রদীপের কথিত রাজ্য ছিল। মূলত তার স্বেচ্ছাচারিতা, আইন অমান্য করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা এবং তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সিনহা ও তার সঙ্গীরা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওসি প্রদীপ সরকারি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করতেন এবং ইয়াবাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানতে ক্যামেরা ও ডিভাইসসহ সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত থানায় যান। র‌্যাবের অভিযোগপত্রে বলা হয়, থানায় তাদের অনতিবিলম্বে টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে যেতে বলা হয়। তা না হলে ‘তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেব’ বলে হুমকি দেন প্রদীপ। ওসি প্রদীপের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণেই ষড়যন্ত্র করে মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয় বলে জানায় র‌্যাব।

ঘটনার দিন সকাল থেকেই সিনহার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘বৃক্ষরোপণ’ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, মেজর সিনহা রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন। শামলাপুর এপিবিএন পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদকে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী।

এর কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনো মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন। এ সময় ওসি প্রদীপ সিনহার ‘মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে’ বিকৃত করার চেষ্টা করেন। এর পরই সিনহার মৃত্যু হয়। পরে লোক দেখানোভাবে তাকে একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। -ঢাকাটাইমস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •