দিলরুবা সরমিন

আব্দুল মতিন খসরু আজ বছরের শুরুতেই আপনার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো! সুপ্রিম কোর্ট বারের এবার সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন আপনি। নির্বাচিত হওয়ার জন্য আপনাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এই দুঃসময়ে এতটা ধকল সম্ভবত আপনার শরীর সহ্য করতে পারেনি। সময়টা এখন বড়ই খারাপ। এই করোনা সামান্য একটু সুযোগ পেলেই শরীরে ঢুকে নিজের বিস্তার ঘটাচ্ছে। কারোই রক্ষা নাই এর হাত থেকে। নিজেকে নিজে বাঁচানোর চেষ্টা করা ছাড়া আর কী করার আছে? স্বার্থপর এই অসুখ মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আত্মার সাথে, রক্তের সাথে, জন্মের সাথে, জীবনের সাথে কিছুই মানছে না এই অসুখ। অশুভ অসুস্থ সময় পার করছি আমরা। আমরা আইনজীবীরা আর আগের মত নেই। আমরাও বদলে গিয়েছি। এখন সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক বা সম্মান বোধ আর আগের মত নেই। আমরা সবাই জানি। আইনজীবীদের বারগুলো আর আগের মত নেই যে চোখ বন্ধ করে সবাই আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদীরকেই ভোট দেবে। আইনজীবীদের মধ্যে ভাগাভাগি, রেষারেষি, দলাদলী, নানাবিধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন। তাই এবার বার নির্বাচনে আপনাকে পরিশ্রমও করতে হয়েছে অনেক।

আব্দুল মতিন খসরুর সাথে আমার পরিচয় আইনজীবী হিসাবে। একজন উঁচু মাপের আইনজীবী হিসাবেই তিনি আমার কাছে বরাবর মনে হয়েছে। ১৯৯৬- ২০০১ মেয়াদে তিনি ছিলেন আইনমন্ত্রী। তখন তাঁর রাজনৈতিকভাবে গ্রহণীয় অনেক কাজের কথা তো সবারই মনে আছে। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার বিচারে যে বাধা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাঝ দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল; আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিয়েই তিনি তা বাতিল করেন। তাঁর সময়ের অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কাজের মাঝে একটা কাজ হলো সরকারি লিগ্যাল এইড আইন-২০০০ প্রণয়ন করা। এই কাজের মাঝে তিনি আইনজীবী সমাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সরকারিভাবে বিনামূল্যে আইনী সহায়তা কর্মসূচী একদিকে যেমন বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠির আইনী সহায়তা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়েছে, তেমনি অনেক আইনজীবীর মাঝেও খানিকটা প্রোবোনো এটিচ্যুড ডেভেলপ করিয়েছে। পাশাপাশি এটা আইনজীবীদের ও বাড়তি সম্মান ও উপার্জন হিসাবেও কাজ করেছ।

আমার অভিজ্ঞতায় অবশ্য আব্দুল মতিন খসরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গ্রামীন আদালত বিল। এই কাজের মাধ্যমে আব্দুল মতিন খসরু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আদালতপাড়ায় অহেতুক ঘোরাঘুরি, বিচারের দীর্ঘসূত্রীতার হাত থেকে সকলকে রেহাই দেওয়া, সালিস যোগ্য, আপোষ যোগ্য বিষয় নিয়ে অহেতুক মামলা না করা, মামলার জট কমানো থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি বেসরকারি সাহায্য সংস্থাকে আইনী বিচারিক সালিসী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্তকরণ করা, অর্থাৎ উন্নয়নের সকল পর্যায়ে জনগণের সম্পৃক্ততা চেয়েছিলেন। গ্রামীণ আদালত বিল কোনো আলোর মুখ দেখল না, কেনো আওয়ামী লীগ বা বিএনপি সরকারের মনের মতো হলো না সেটা আজও অজ্ঞাত ।

আব্দুল মতিন খসরু বাংলাদেশের কাজীদের সনদ নিবন্ধনের মধ্য দিয়েও আরেকটি প্রশংসনীয় ও চিরস্মরণীয় কাজ করেছেন। এর ফলে কাজীদের কাজের দায়াবদ্ধতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের কাজের মান ও পেশাদারিত্ব বেড়েছিলো। একজন আইন মন্ত্রীর কাজই হলো আইন ও আইন অঙ্গনের উন্নয়নের জন্য কাজ করা। যা আব্দুল মতিন খসরু যথাযথভাবে করার চেষ্টা করেছেন। যতটুকু পারেননি ততটুকু আমাদের দেশের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণে।

সেই সময় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি আব্দুল মতিন খসরুর চিন্তা ভাবনা ছিল ভীষণ বৈচিত্র্যময় এবং আধুনিক। গণমুখী এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি বিশ্বাসী। বহুদিন সরকারে এবং দলে থাকার পর, তিনি যখন হাল ধরলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তখনই তাঁকে চলে যেতে হলো! মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাই কি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য?

লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •