মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার জেলায় করোনা সংক্রামণ আশংকাজনক ভাবে বাড়ছে। অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে সার্বিক করোনা পরিস্থিতি। বিশ্বস্ত সুুুুত্র মতে, গত এক সপ্তাহে অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৫ জন করোনা রোগী মারা গেছে। এরমধ্যে ১ এপ্রিল ১ জন, ৫ এপ্রিল ২ জন এবং ৭ এপ্রিল ২ জন। করোনা আক্রান্ত হয়ে জেলা সদর হাসপাতালে মারা যাওয়া ৫ জনের মধ্যে ৩ জন মহিলা ও ২ জন পুরুষ। এদের মধ্যে ১জন চকরিয়ার, ১ জন সদর উপজেলার ঈদগাহ এলাকার, ১জন ঝিলংজা ইউনিয়নের, ১ জন কক্সবাজার শহরের কলাতলীর এবং ১ জন টেকনাফের রঙ্গীখালীর। এনিয়ে, কক্সবাজার জেলায় মোট ৮৮ জন করোনা রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃতদের মধ্যে ১০ জন রোহিঙ্গা শরনার্থী। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার ১’৩৬%।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহজাহান নাজির বলেছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে এবারের মৃত্যু গুলো গতবারের চেয়ে একটু ভিন্নতা রয়েছে। যেমন- গতবছর শহরের রোগীদের মৃত্যুর হার বেশী ছিল, এবার গ্রামের রোগীর মৃত্যুর হার বেশি। গতবার পুরুষের সংখ্যা বেশী ছিল, এবার মহিলার সংখ্যা বেশী।

গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে নমুনা টেস্ট করে প্রতিদিন গড়ে কক্সবাজার জেলার ৫৪’৫৭ জন রোগীর করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। তারমধ্যে, ১ এপ্রিল ৪৮ জন, ২ এপ্রিল ২০ জন, ৩ এপ্রিল ৪৯ জন, ৪ এপ্রিল ৫৫ জন, ৫ এপ্রিল ৮১ জন, ৬ এপ্রিল ৭২ জন এবং ৭ এপ্রিল ৫৭ জন। গত এক সপ্তাহে মোট ৩৮২ জনের দেহে করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। এভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে কক্সবাজারে করোনা সংক্রামণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশংকা পোষন করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনা সংক্রামণ প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে জড়িত অভিজ্ঞ একজনের মন্তব্য হলো-হোম আইসোলেসনে যেসব করোনা রোগী আছেন, তারা কতটুকু আইসোলেসন মানছেন-সেটা একটা সুষ্ঠু পর্যবেক্ষনের বিষয়। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি থাকতে হবে। কারণ দেহে করোনা শনাক্ত হওয়া প্রায় ৭৮ শতাংশ রোগী হোম আইসোলেসনে রয়েছেন। অনেক রোগী ‘আইসোলেসন’ কি, আদৌ সেটাও জানেনা, বুুুঝেনা। আক্রান্তরা অবাধে মিশে যাচ্ছে পরিবারের সদস্য ও গণমানুষের সাথে, পাবলিক স্পেসে। নিজ নিজ পেশাতে অন্যান্যদের সাথে মিশে কাজ করছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগের করোনার উপসর্গ না থাকায় সাধারণ লোকজন করোনা রোগীকে চিহ্নিত করতে পারছেন না। করোনা সংক্রামণের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা একেবারে কমে গেছে। প্রশাসনও আগের মতো আক্রান্তদের বাড়ি, অবস্থান ‘লকডাাউন’ করে না দেওয়ায় এ বিষয়ে উদাসীন হয়ে উঠেছেন সংক্রামিতরা। কোথাও স্বাস্থবিধির কোন বালাই নেই।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, কক্সবাজার জেলায় ৭ এপ্রিল কোভিড শনাক্ত হওয়া অসুুস্থ রোগী আছে মোট ৭২৫ জন। এরমধ্যে মাত্র ১৫৯ জন প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসনে আছে। বাকী ৫৬৬ জন করোনা রোগী নিজ নিজ দায়িত্বে হোম আইসোলেসনে রয়েছে। হোম আইসোলেসনে থাকা ৫৬৬ জনের মধ্যে প্রায় ২ শত করোনা শনাাক্ত হওয়া রোগী কোথায় আছে, কেমন আছে, তার হদিস নেই। জেলায় করোনা সংক্রামণ প্রতিরোধে কর্মরত একজন গবেষক এ বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন।

এ বিশেষজ্ঞের মতে, আক্রান্তদের অধিকাংশকে সরকারী উদ্যোগেই প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসনে নিয়ে আসা দরকার। যারা হোম আইসোলেসনে থাকবেন তাদের যথাযথ সম্পূর্ণ আইসোলেসন সুনিশ্চিত করতে হবে সরকারি উদ্যোগে। এছাড়া, কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক টিম আবার কন্ট্রাক ট্রেসিং শুরু করলেও তা আরো জোরদার করতে এবং ব্যাপৃত করতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসন সেন্টার। জেলার অন্যান্য জায়গাতেও জরুরী ভিত্তিতে কন্ট্রাক ট্রেসিং শুরু করতে হবে। কক্সবাজার জেলায় করোনা সংক্রামণ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষককে সময় থাকতে আরো বেশী তৎপর হওয়ার ও জরুরী পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন এই অভিজ্ঞজন। বুধবার ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮ শত ৯০ জন পৌঁছেছে। জেলায় করোনা আক্রান্ত রোগীর মধ্যে শুধু সদর উপজেলার রোগী রয়েছে ৩৩৭৯ জন। যা জেলার মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক।

এদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসনে থাকা করোনা রোগীদের মধ্যে ৮ এপ্রিল বিকেল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে রোগী ভর্তি আছে ৪৬ জন। এদের মধ্যে, ১০ জন আইসিইউ-তে এবং ৮ জন এইসডিইউ-তে। ১৮ জনের মধ্যে প্রায় সকলের অবস্থা ক্রিটিকাল। প্রায় সবার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭৫ এর নীচে। আইওএম এর সহায়তায় ৩ জন চিকিৎসক নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালের চাদের উপরে থাকা করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ‘রেড জোন’ টি গত ৬ এপ্রিল হতে আবার চালু করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক জানান, ২৫০ বেডের এ হাসপাতালে সবসময় প্রায় ৪ শত রোগী ভর্তি থাকে। করোনা আক্রান্তদের জরুরী চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ক্রিটিকাল রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে। একেতো চিকিৎসক স্বল্পতা, তার উপর করোনা রোগীর চাপে তারা রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছেন। তার মতে, যে উপজেলার রোগী সে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করোনা ওয়ার্ডে, ডুলাহাজারা খৃষ্টান মেমোরিয়াল হসপিটালে অথবা রামু ও চকরিয়া ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া উচিত। আবার রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ১৩ টি SARI আইসোলেসন সেন্টারে ৯৬৪ টি বেড রয়েছে। আরো ৩ টি SARI আইসোলেসন সেন্টার চালুর অপেক্ষায় আছে রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে। এগুলো সব এনজিও দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সেখানে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাও বেশী। জেলা সদর হাসপাতালে রোগীর চাপ কমানোর জন্য রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে থাকা SARI আইসোলেসন সেন্টারে হোষ্ট কমিউনিটির রোগী রেফার করা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নতুবা জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা যেকোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে বলে তিনি আশংকা পোষন করেছেন। এছাড়া, ক্রিটিকাল করোনা রোগীদের জন্য জেলা সদর হাসপাতালের কিছু ভেন্টিলেটর বেড সবসময় ফ্রী রাখা দরকার।

এদিকে, গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৬ হাজার ২৩ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন। আক্রান্তের তুলনায় সুস্থতার হার ৮৭’৪২%।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •