মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার জেলায় করোনা সংক্রামণ আশংকাজনক ভাবে বাড়ছে। অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে সার্বিক করোনা পরিস্থিতি। গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে নমুনা টেস্ট করে কক্সবাজার জেলায় গড়ে প্রতিদিন ৪০ জনের অধিক করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে কক্সবাজারে করোনা সংক্রামণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশংকা পোষন করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনা সংক্রামণ প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে জড়িত অভিজ্ঞ একজনর মন্তব্য হলো-হোম আইসোলেসনে যেসব করোনা রোগী আছেন, তারা কতটুকু আইসোলেসন মানছেন-সেটা একটা সুষ্ঠু পর্যবেক্ষনের বিষয়। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি থাকতে হবে। কারণ দেহে করোনা শনাক্ত হওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী হোম আইসোলেসনে রয়েছেন। অনেক রোগী ‘আইসোলেসন’ কি, আদৌ সেটাও জানেনা। আক্রান্তরা অবাধে মিশে যাচ্ছে পরিবারের সদস্য ও গণমানুষের সাথে, পাবলিক স্পেসে। আক্রান্তদের বেশির ভাগের করোনার উপসর্গ না থাকায় সাধারণ লোকজন করোনা রোগীকে চিহ্নিত করতে পারছেন না। করোনা সংক্রামণের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা একেবারে কমে গেছে। স্বাস্থবিধির কোন বালাই নেই। এ বিশেষজ্ঞের মতে, আক্রান্তদের অধিকাংশকে সরকারী উদ্যোগেই প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসনে নিয়ে আসা দরকার। যারা হোম আইসোলেসনে থাকবেন তাদের যথাযথ সম্পূর্ণ আইসোলেসন সুনিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক টিম আবার কন্ট্রাক ট্রেসিং শুরু করলেও তা আরো জোরদার এবং ব্যাপকতা বাড়াতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসন সেন্টার। জেলার অন্যান্য জায়গাতেও জরুরী ভিত্তিতে কন্ট্রাক ট্রেসিং শুরু করতে হবে। কক্সবাজার জেলায় করোনা সংক্রামণ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষককে সময় থাকতে আরো বেশী তৎপর হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এই অভিজ্ঞজন।

এদিকে, শুধুমাত্র মঙ্গলবার ৬ এপ্রিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে কক্সবাজার জেলার ৭২ জন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এনিয়ে, মঙ্গলবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮ শত ৩৩ জন পৌঁছেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৮৪ জন করোনা রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃতদের মধ্যে ১০ জন রোহিঙ্গা শরনার্থী। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার ১’২৪%।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. সাকিয়া হক এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার ৬ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলা ৩ হাজার ৩৫৩ জন করোনা আক্রান্ত রোগী নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে। যা জেলার মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর প্রায় অর্ধেক। ৩৪৮ জন রোহিঙ্গা শরনার্থী সহ মোট ১ হাজার ১২ জন করোনা রোগী নিয়ে উখিয়া উপজেলা দ্বিতীয় শীর্ষে অবস্থানে রয়েছে। ১০৩ জন রোহিঙ্গা শরনার্থী সহ মোট ৬৪১ জন করোনা রোগী নিয়ে টেকনাফ উপজেলা তৃতীয় শীর্ষে অবস্থানে রয়েছে। ৫৯৩ জন করোনা রোগী নিয়ে চকরিয়া উপজেলা চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। ৪৭২ জন করোনা রোগী নিয়ে রামু উপজেলা পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। ৪২৯ জন করোনা রোগী নিয়ে মহেশখালী উপজেলা ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। ২৩৬ জন করোনা রোগী নিয়ে পেকুয়া উপজেলা সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। ৯৭ জন করোনা রোগী নিয়ে কুতুবদিয়া উপজেলা অষ্টম অবস্থানে রয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৫ হাজার ৯৩১ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন। আক্রান্তের তুলনায় সুস্থতার হার ৮৭’৭২%।

এদিকে, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে একই সময় পর্যন্ত সন্দেহজনক করোনা রোগীর নমুনা টেস্ট করা হয়েছে মোট ১ লক্ষ ২৩ হাজার ১৪৮ জনের। তারমধ্যে, কক্সবাজার জেলার নাগরিকদের নমুনা ৭১ হাজার ৪১৬ জনের। রোহিঙ্গা শরনার্থীদের নমুনা ৩৪ হাজার ৮৮১ জনের। চট্টগ্রাম জেলার নাগরিকদের নমুনা ১১ হাজার ৯৬ জনের এবং বান্দরবান জেলার নাগরিকদের নমুনা ৫ হাজার ৭৫৫ জনের।

এদিকে, মঙ্গলবার ৬ এপ্রিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে ৫৫৩ জনের নমুনা টেস্ট করে ৮১ জনের টেস্ট রিপোর্ট ‘পজেটিভ’ পাওয়া গেছে। বাকী ৪৭২ জনের নমুনা টেস্ট রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ আসে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহজাহান নাজির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মঙ্গলবার শনাক্ত হওয়া ৮১ জন করোনা রোগীর মধ্যে ১ জন আগে আক্রান্ত হওয়া পুরাতন রোগীর ফলোআপ টেস্ট রিপোর্ট। ৩ জন বান্দরবান জেলার এবং ৫ জন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার নতুন রোগী। অবশিষ্ট ৭২ জন করোনা শনাক্ত হওয়া নতুন রোগীর সকলেই কক্সবাজারের রোগী। তারমধ্যে, শুধুমাত্র কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৪৬ জন, রামু উপজেলায় ২ জন, উখিয়া উপজেলায় ৫ জন, টেকনাফ উপজেলায় ৩ জন, চকরিয়া উপজেলায় ৭ জন, পেকুয়া উপজেলায় ৪ জন এবং মহেশখালী উপজেলার ৫ জন রোগী রয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে গত ৫ এপ্রিল পর্যন্ত হোম আইসোলেসনে রয়েছেন ৫১৩ জন, প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেসনে রয়েছেন ১৫২ জন। তারমধ্যে, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেসনে রয়েছেন ৩৬ জন, রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেসনে রয়েছেন ৩ জন, ফ্রেন্ডশিপ SARI হাসপাতালে রয়েছেন ১৫ জন, রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আইসোলেসন সেন্টার সমুহে রয়েছেন স্থানীয় জনগণ ৮৬ জন এবং রোহিঙ্গা শরনার্থী রয়েছেন ১২ জন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •