সিবিএন ডেস্ক:
সরকারের কঠোর নজরদারি ও তদারকির অভাব তো আছেই, বাজার দর নিয়ে সরকারের কোনও সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয় না। বাজার চলে তার ‘নিজের নীতিমালা’। অথচ যে কোনও পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সংক্রান্ত দর নির্ধারণ কমিটি। যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে গঠিত। এর বাইরে কয়েকটি পণ্যের দর ঠিক করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদফতর।

সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দর নির্ধারণ কমিটি চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সয়াবিন ও পামতেলের দর ঠিক করে দেয়। এর আগে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর চালের দর ও ২০ অক্টোবর আলুর দর নির্ধারণ করে দিয়েছিল কৃষি বিপণন অধিদফতর। পরে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি পেঁয়াজসহ রসুন, সরিষা, মসুর ডাল, ফুলকপি, বাধাকপি, শসা, টমেটো, কাঁচা পেঁপে, ঢেঁড়স, শিম, বেগুন, কাঁচামরিচ এবং লাউ এই ১৪টি পণ্যের দর নির্ধারণ করার বিষয়টি চূড়ান্ত করলেও সিদ্ধান্ত হয়নি কৃষি মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু নির্ধারিত দরে আলু, সয়াবিন তেল, চাল কোনওটাই ক্রেতারা বাজারে পায়নি।

কারণ ব্যখ্যা করে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারের কঠোর নজরদারি ও সুষ্ঠু মনিটরিংয়ের অভাবে কখনোই বাজারদর সংস্তান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না। এ ক্ষেত্রে সরকারের দক্ষতা ও জনবল স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন তারা।

দর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বেফাঁস কথাবার্তা বা মন্তব্যকেও দায়ী করেন তারা।

জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সংস্থার বাজার মনিটরিং টিম কাজ করলেও তাতে সুফল আসে না। এসব টিম বাজারে অভিযান চালিয়ে ফিরে যাওয়ার পরই বাজার আগের মতো হয়ে যায়। বিশেষ সময় ছাড়া অনেক সংস্থার টিম বাজারেই নামে না। বেশিরভাগ সময় এসব মনিটরিং টিম ঘুরে ফিরে একই বাজারে অভিযান চালায়। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ বা কর্মকর্তা না পাওয়ার বিষয়টিও গণমাধ্যমকে জানানো হয়।

জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বিশেষ উপলক্ষে বিশেষ করে রোজা, ঈদ ও কোরবানির সময় নিত্যপণ্যের মজুদ, দর, সরবরাহ ও আমদানি নিয়ে বৈঠক হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এসব সভায়, প্রধানমন্ত্রীর দফতর, কৃষি, বাণিজ্য, অর্থ, সড়ক, নৌ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ পুলিশ, বিজিবি, আনসার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক, টিসিবি, ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশন, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, এনএসআই, ডিজিএফআই, সিআইডি, ডিবি, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, কৃষি বিপণন অধিদফতর, বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন, কারওয়ানবাজার, মৌলভীবাজার এবং শ্যামবাজারসহ পাইকারি বাজার সমিতির নেতারা, খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিনিধি, বিভিন্ন পণ্যের আমদানিকারক, মিল মালিক, সরবরাহকারীসহ ভোক্তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারাও উপস্থিত থাকেন।

সুবিশাল এ সব সভায় গণমাধ্যমকর্মীরা থাকেন একেবারেই উপেক্ষিত। বৈঠকের ছবি নেওয়ার জন্য ১০-১২ মিনিট টেলিভিশন সাংবাদিকদের সময় দেওয়া হয়। পরে তাদেরও বের করে দেওয়া হয় বৈঠক থেকে। কখনও কখনও বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অনেক সময় তা-ও হয় না। বড়জোর মন্ত্রণালয় থেকে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। অনেক সময়ই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তড়িঘড়ি সংবাদ সম্মেলন শেষ করে দেওয়ারও রেকর্ড রয়েছে।

সভা শেষে কমিটির সভাপতি বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত মূল্য অবিলম্বে কার্যকর হবে। কিন্তু বাজারে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র।

মন্ত্রণালয়ের দর নির্ধারণী কমিটি খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন সর্বোচ্চ ১১৭ টাকায় বিক্রির কথা বললেও এখন হচ্ছে ১৪০ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদফতরের নির্ধারিত দর অনুযায়ী প্রতিকেজি সরু মিনিকেট চাল ৫১ টাকা ৫০ পয়সা ও ৫০ কেজির বস্তা দুই হাজার ৫৭৫ টাকা, মাঝারি মানের চাল প্রতিকেজি ৪৫ টাকা ও ৫০ কেজির বস্তা দুই হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি করার কথা থাকলেও সে দামে এখন চাল বিক্রি হচ্ছে না।

এসব বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করলে সরকারের লোকজন বলেন, দর নির্ধারণ করে না দিলে পণ্যের দাম আরও বাড়তো। তখন বাজার নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে যাবে।

নীতি নির্ধারকদের এ ধরনের বেফাঁস মন্তব্যর কারণেও বাজার হুট করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়। বাণিজ্যমন্ত্রী যখন বলেন, প্রতিকেজি পেঁয়াজ ৫৫ টাকার নিচে বিক্রি সম্ভব নয়, তখন ব্যবসায়ীরা কেনও ৫০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করবেন? জিজ্ঞাসা সংশ্লিষ্টদের।

যদিও এখন পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩০ টাকায়, তবু গত ১ নভেম্বর অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড প্রদানকালে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীদের মুনাফা, আমদানিকারকদের কমিশনসহ সব হিসাব করলে পেঁয়াজের দাম ৫৫ টাকার নিচে নামানো সম্ভব নয়।

একইভাবে তেল ও চিনির ক্ষেত্রে যখন ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত তোলেন, তখন মন্ত্রী-সচিবরাও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দর বাড়লে দেশে কমবে কিভাবে? কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তখন মন্ত্রী সচিবদের তার উল্টোটা বলতে শোনা যায় না। এ সময় যথারীতি ব্যবসায়ীরা পুরনো বুলি আওড়ে বলেন, দাম কমার প্রভাব বাজারে পড়তে মাস দুয়েক সময় লাগবে। মন্ত্রী-সচিবরাও তখন তাদের সঙ্গে সুর মেলান।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহম্মদ ইউসুফ জানিয়েছেন, বাজারে সব সময় মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম থাকে। এরাই বাজারকে অস্থির করে। এদের কারণে উৎপাদনকারী ও ক্রেতা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকারের নানা উদ্যোগ এবং অভিযানেও তা ঠেকানো যায় না।

তিনি আরও বলেন, সরকার আলু ও চালের যে দর ঠিক করে দিয়েছে তা শতভাগ কার্যকর না হলেও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াটা ঠেকিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি আবারও জানিয়েছেন, সরকার সব সময়ই নিত্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে চায়। কিন্তু আমদানিনির্ভর পণ্যে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে আমরা টিসিবিকে সচল রেখেছি। রোজায় এর বিক্রি বাড়বে। -বাংলা ট্রিবিউন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •