সিবিএন ডেস্ক:
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের শীর্ষ নেতারা ঢাকা সফর করছেন। এর মধ্যে মালদ্বীপ ও নেপালের রাষ্ট্রপতি এবং ভুটান ও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সফর করেছেন। আজ শুক্রবার (২৬ মার্চ) ঢাকা আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবারের সফরটি উৎসবে যোগদানের জন্য হলেও এরমধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যতটুকু করা সম্ভব বাংলাদেশ করছে। এবারে মোটামুটি সবার সঙ্গে আলোচনায় যে জিনিসটি বড় আকারে এসেছে সেটি হচ্ছে কানেক্টিভিটি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

অর্থনীতির এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ কী ভাবছে, কেন কানেক্টিভিটির ওপর জোর দিচ্ছে, কীভাবে এগুতে চাইছে সে বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ দ্রুত তার অবকাঠামো সক্ষমতা যেমন মাতারবাড়ি, পায়রা, পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে এবং এর সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজার খুঁজছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর যদি আন্তঃঅঞ্চল সহযোগিতার মনোভাব থাকে তবে পশ্চিমা নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। গত ২০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের মধ্যে বৈঠকে পশ্চিমা নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য কানেক্টিভিটি ও বাণিজ্য বিষয়টি আলোচনায় জোরালোভাবে এসেছে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের যে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে সেটির সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার করতে হলে শুধু বাংলাদেশের বাজার যথেষ্ট না। এর জন্য গোটা অঞ্চলের সমৃদ্ধির জন্য এগুলো ব্যবহার করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চ প্রবৃদ্ধি। এটি অর্জনে অনেক বাধা আছে। যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোহিঙ্গার মতো ইস্যু রয়েছে। এছাড়া কোভিডের মতো কোনও স্বাস্থ্য সংকট বা অংশীদার দেশগুলোতে অর্থনৈতিক শ্লথগতির ঝুঁকিও রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি শিল্পোন্নয়ন না হয় তবে এই উৎপাদনের অনেকটি অব্যবহৃত থেকে যাবে। এটি আমাদের দ্রুত বুঝতে হবে। আমাদের বিদ্যুৎ, বন্দর, অভ্যন্তরীণ নদীপথসহ অন্যান্য অবকাঠামোর সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পুরো অঞ্চলকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে।’

ওপরে নেপাল ও ভুটান, একপাশে আছে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং উত্তর প্রদেশও বেশি দূরে নয়। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য। এছাড়া মিয়ানমার দিয়ে আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেতে পারি যেখানকার বাজার অনেক বড় বলে তিনি জানান।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এর পাশাপাশি যদি আমাদের প্রতিবেশীদের একই ধরনের মনোভাব থাকে অর্থাৎ বিনিয়োগ বা বাণিজ্যের জন্য পশ্চিমামুখি না হয়ে আন্তঃঅঞ্চল যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে গোটা অঞ্চলের জন্য লাভজনক হবে।’

শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলারের ওপর। শ্রীলঙ্কান ব্যবসায়ীরা নিজেদের দেশে বিনিয়োগ না করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। কারণ এটি তাদের কাছে লাভজনক মনে হয়েছে। আমরা ইথিওপিয়া বা আর্জেন্টিনায় বিনিয়োগ না করে আঞ্চলিক বিনিয়োগ করতে পারি।’

চালিকা শক্তি
এই অঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম যেমন সার্ক, বিমসটেক বা আইওআরএ রয়েছে এবং এই সবকটির সদস্য বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এর পাশাপাশি রয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশন। আমাদের অনেক অংশীদার-যেমন ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে কোনও নিরাপত্তা উপাদান গোটা বিষয়টিকে যেন বিতর্কিত না করে ফেলে। তবে এর অর্থনৈতিক লাভের বিষয় যেমন অবাধ চলাচলসহ অন্যান্য জিনিস আমরা মেনে নিয়েছি। এছাড়া আমরা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে (বিআরআই) আছি। এই সবগুলো চালিকা শক্তি যদি আমরা কাজে লাগাই তবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।’

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়া যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কিছু সুবিধা হারাবে এবং এর জন্য বিভিন্ন ধরনের অগ্রাধিকার বা মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চুক্তি করতে চাইছে সরকার। এটি আজকের জন্য নয় বরং ভবিষ্যৎে যাতে আমাদের অসুবিধা না হয় সেটির জন্য এই বাণিজ্য ব্যবস্থা বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশের শক্তি
বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিশাল মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় যাদের ক্রয় করার ক্ষমতা আছে এবং একটি বড় যুব জনগোষ্টি। এই শক্তিগুলি অনেক দেশের নাই।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘কোভিড পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পাঁচ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এটিকে যদি বাংলাদেশের মৌলিক শক্তি হিসাবে ধরে নেওয়া যায় তবে এর সঙ্গে আরও পাঁচ বা ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অন্য কোনও খাত থেকে প্রয়োজন হবে মোট ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য।’

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক গুণ বাড়বে যদি এর বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু, মাতারবাড়ি বা পায়রা বন্দর বা বে টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হয় বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এর জন্য আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বগামি রাখতে হলে নতুন নতুন পথ খুঁজতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তি, পাট বা মানব সম্পদ উন্নয়ন করতে হবে। মানব সম্পদ শুধু বিদেশে পাঠানোর জন্য নয় বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য দরকার।’ -বাংলা ট্রিবিউন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •