বিদেশ ডেস্ক:
মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পদায়ের পক্ষ থেকে যে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তার তোয়াক্কা করছে না অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলকারী গোষ্ঠী। উল্টো সেনা সদস্যদেরকে বিদেশি হুমকি মোকাবিলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছে তারা। এদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকার পরও ভয় উপেক্ষা করে রবিবারও (২১ মার্চ) চলছে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ। এদিন মনিওয়া শহরে পুলিশের গুলিতে নতুন করে এক বিক্ষোভকারী নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান শুরু থেকেই দেশটির জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। ব্যাপক দমন-পীড়ন ও নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ উপেক্ষা করে রাস্তায় নামছে মানুষ। প্রতিদিন বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। শনিবার (২০ মার্চ) রাতে মিয়ানমারজুড়ে অন্তত ২০টি জায়গায় মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে প্রধান শহর ইয়াঙ্গুন থেকে শুরু করে উত্তরে কাচিন রাজ্য কিংবা দক্ষিণের কাউথং শহরের ছোট ছোট কমিউনিটি পর্যন্ত এ বিক্ষোভের আঁচ লেগেছে।

সংবাদমাধ্যম মিজিমাতে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে মান্দালয় শহরে চিকিৎসাকর্মীরাসহ শত শত মানুষ রবিবার সূর্য ওঠার আগেই বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে তারা স্লোগান দিতে থাকেন, ‘সামরিক সরকারকে ব্যর্থ করাই আমাদের দাবি, আমাদের দাবি….ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের দাবি, আমাদের দাবি।’

কিছু কিছু স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মোমবাতি হাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরও যোগ দিতে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার তিন আঙুলের বিক্ষোভ স্যালুটের প্রতীক তৈরি করতে মোমবাতি ব্যবহার করেছেন।

রবিবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভ আরও জোরালো হতে থাকে। মনিওয়াতে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড তৈরি করে স্লোগান দিতে থাকেন। তাদেরকে হটাতে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে পুলিশ। তখন একজন নিহত হয়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে মাথায় গুলিবিদ্ধ হতে দেখা গেছে। ওই ভিডিওতে আরও গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো। তখন লোকজনকে ‘স্নাইপার স্নাইপার’ বলে চিৎকার করতে শোনা গেছে। এক চিকিৎসককে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয়রা আহতদের জন্য রক্ত চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।

রবিবার বিক্ষোভে সহিংসতা নিয়ে জান্তা সরকারের কোনও মুখপাত্রের বক্তব্য জানা যায়নি বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স। এর আগে তারা দাবি করেছিল, প্রয়োজন হলেই কেবল শক্তির প্রয়োগ ঘটায় নিরাপত্তা বাহিনী।

অ্যাসিসটেন্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী রবিবারের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে মোট নিহত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা অন্তত ২৪৮ জনে দাড়িয়েছে। সেনাবাহিনীর তরফে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হ্ওয়ার দাবি করা হয়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলো শুরু থেকেই মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ও সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকা আসিয়ান জোটের সদস্যরাও মুখ খুলতে শুরু করেছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো আঞ্চলিক নেতা হিসেবে সবচেয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার তিনি বলেছেন, সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। আসিয়ান সভাপতিকে জরুরি বৈঠক আহ্বান জানাবেন বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন জানিয়েছেন, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারে তিনি মর্মাহত। সিঙ্গাপুরও তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছে। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পিছু হটার কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে না এখন পর্যন্ত। তারা এখনও ক্ষমতা দখলের পক্ষে সাফাই গাইছে।

সামরিক অভ্যুত্থানের সেনা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাং শনিবার কোকো আইল্যান্ড পরিদর্শন করেছেন। সেখানে সামরিক কর্মকর্তা ও নার্সদের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন কেন তাকে ক্ষমতা দখল করতে হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সমালোচনা করেছেন। বিক্ষোভে নিহতের ঘটনাটিকে নৃশংস সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ঐক্যবদ্ধ আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টার টম অ্যান্ড্রুজ জনগণের ওপর নির্মম হামলার জন্য সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির আহ্বান জানিয়েছেন। টুইটারে তিনি লিখেছেন, বিশ্বের উচিত অর্থ ও অস্ত্র প্রাপ্তি বন্ধ করে জবাব দেওয়া।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিকভাবে এতো চাপ সত্ত্বেও মিয়ানমারের জান্তা সরকারের মধ্যে কোনও নমনীয় হওয়ার লক্ষণ নেই। শনিবার কোকো আইল্যান্ডস সফরে গিয়ে জেনারেল মিন অং হ্লাং সেনা সস্যদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে তাদের দায়িত্ব হলো বহির্বিশ্বের হুমকি থেকে দেশকে সুরক্ষা দেওয়া।

মিয়ানমারের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র কিয়েমনে গুরুত্ব সহকারে সু চি’র বাবা ও দেশটির স্বাধীনতার নায়ক অং সানের একটি উদ্ধৃতি প্রকাশ করেছে। ১৯৪৭ সালে তিনি বলেছিলেন: ‘বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর অপমানের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং এর জন্য আত্মদান করাই সবার দায়িত্ব।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •