সিবিএন ডেস্ক:
করোনা মহামারিতে বদলে গেছে জীবনের সন্তুষ্টির ধারা। এই ভাইরাস বয়স্কদের করেছে উৎফুল্ল। আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকা সত্ত্বেও প্রবীণরা ছিলেন হাসিখুশি। তবে তরুণদের একটি কঠিন বছর পার করতে হয়েছে। তাদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে কয়েকটি ধনী দেশের নারীদেরকে। এবারের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই রিপোর্টের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকার শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড। আর বাংলাদেশের অবস্থান ৬৮তম।

এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণে ২৭ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু দেখেছে বিশ্ব। শুধু তা–ই নয়, মহামারির ধাক্কা লেগেছে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে। এ কারণেই এবারের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে প্রাধান্য পেয়েছে করোনা মহামারি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) ওই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এটি টেকসই উন্নয়ন নেটওয়ার্কের সুখবিষয়ক নবম বার্ষিক প্রতিবেদন। শনিবার (২০ মার্চ) বিশ্ব সুখ দিবসে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে। তবে তার আগে প্রতিবেদনটির আংশিক প্রকাশ করা হয়েছে। আংশিক এই প্রতিবেদনে ৯৫টি দেশের নাম ছিল।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক বিশ্লেষক ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্যালপ এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে। আর মহামারিসংশ্লিষ্ট তথ্যের উৎস ব্রিটিশ ইন্টারনেটভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভের আইসিএল-ইউগভ বিহেভিয়ার ট্র্যাকার প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ডের পরেই রয়েছে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের নাম। তালিকায় যে ৯৫টি দেশের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে সবচেয়ে তলায় রয়েছে জিম্বাবুয়ে। এই দেশটির ওপরেই রয়েছে তানজানিয়া, জর্ডান, ভারত ও কম্বোডিয়া।

করোনা মহামারির কালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পার্ক হা-ইয়ংয়ের মন-মেজাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু ঘটেনি। গত বছর করোনা উদ্বেগে বেশিরভাগটা সময় তিনি ঘুমিয়েই কাটিয়েছেন। সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক তাকে গ্রাস করেছিল। মহামারিতে তার স্বাধীনতা নাটকীয়ভাবে খর্ব হয়েছে। সরকার নির্ধারণ করেছে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত বা ক্লাসে উপস্থিত হতে পারবেন কিনা। সময় কাটানোর পরিকল্পনা করতে না পেরে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়া নিয়ে তার উদ্বেগ শুরু হয়েছে।

রাজনীতিক ও কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে বলছেন, কীভাবে করোনা মহামারি জনগণের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। তবে বেশিরভাগ মানুষের জন্য এগুলো হলো বিমূর্ত বিবেচনা। তারা প্রতিদিন যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান সেটিই হলো মেজাজ। সেটিই তার উদ্বিগ্ন বা ব্যথিত হওয়ার অনুভূতি। সেখান থেকেই জানা যায় তারা সৌভাগ্যবান, উৎফুল্ল ও আশাবাদী কিনা। ২০ মার্চ বিশ্ব সুখী দিবস উদযাপনে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশন নেটওয়ার্ক চেষ্টা করেছে মহামারিতে এসব চিহ্নিত এবং কীভাবে তা পাল্টে গেছে তা খতিয়ে দেখতে।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা গ্যালাপের মূল প্রশ্নটি ছিল এমন: মানুষকে এমন একটি সিঁড়ি কল্পনা করতে বলা হয়েছে, যাতে রয়েছে দশটি ধাপ। প্রত্যাশিত সবচেয়ে ভালো জীবনের জন্য সিঁড়ির শীর্ষ ধাপ এবং নিচের ধাপ হলো সবচেয়ে খারাপ জীবনের জন্য। জানতে চাওয়া হয়, আপনি নিজেকে কোন ধাপে রাখবেন? এবারের জরিপে প্রশ্নটির উত্তর ছিল অবাক করার মতো। যেখানে দেখা গেছে, বেদনাময় এক মহামারিতে বিপর্যস্ত পৃথিবী প্রায় আগের মতোই সুখী, প্রায় যেমন সুখী ছিল মহামারির আগে। ৯৫টি দেশের গড় স্কোর ছিল ৫.৮৫। ২০১৭-১৯ সালে যা ছিল ৫.৮১।

জরিপ অনুযায়ী, ২০২০ সালে ২০১৭-১৯ এর তুলনায় ৬০ বছরোর্ধ্বদের মধ্যে সুখ বেড়েছে শূন্য দশমিক ২২ পয়েন্ট। সুখী দেশ হিসেবে সামনের সারিতে থাকা ব্রিটেনে মহামারির আগে মানুষের বয়স অনুসারে সুখের চিত্র ছিল ইংরেজি আদ্যক্ষর ‘ইউ’ এর মতো। বেশিরভাগ ধনী দেশেও এমন প্রবণতা। মানুষের প্রাপ্ত বয়স্ক জীবন শুরু হয় হাসিখুশিতে, মধ্য বয়সে এসে ভাটা পড়ে। ৫০ পার হলে আবার হাসিখুশি। আর যদি কেউ আরও বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকেন তাহলে বিষণ্নতার কবলে পড়েন।

দেখা গেছে তরুণরা মধ্যবয়সীদের তুলনায় কম সন্তুষ্ট, আর মধ্যবয়সীরা বয়স্কদের তুলনায় কম। ভিডিও কনফারেন্স সফটওয়্যারের কারণে অনেক বয়স্ক মানুষ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পেরেছেন। যা অনেক সময় ছিল মহামারির আগের তুলনায় ভালো। যেসব দেশে লকডাউন হয়েছে সেসব দেশের প্রবীণরা আনন্দিত ছিলেন দেশের মানুষ তাদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করছে বলে।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের একজন গবেষক ও ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার অর্থনীতিবিদ জন হেলিওয়েল প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেছেন, বয়স্করা নিজেদের সুস্থ মনে করছেন আগের চেয়ে বেশি। গত বছর ৬০ বছরের বেশি বয়স্কদের মধ্যে গড়ে ৩৬ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা রয়েছে। তিন বছর আগের তুলনায় তা কম (৪৬%)। নারীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সমস্যা ৫১ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪২ শতাংশ। তার মতে, বাস্তবে হয়ত বয়স্করা এতোটা সুস্থ না। কিন্তু করোনা তাদের মানসিক অবস্থা পাল্টে দিয়েছে। তারা করোনার মতো প্রাণঘাতী রোগকে পাশ কাটাতে পেরেছেন বলে নিজেদের সুস্থ মনে করছেন।

এদিকে তরুণদের জন্য সময়টা ছিল সত্যিই কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০-২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্ব ছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬.৩ শতাংশ, দুই মাস পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫.৬ শতাংশে। গত মাসে আবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯.৬ শতাংশ। কয়েকটি ধনী দেশের নারীও পার করেছে বিপন্ন সময়। তারা বেশিরভাগ সময় সেবা খাতে কর্মরত , যা মহামারিতে বন্ধ ছিল। যখন স্কুল বন্ধ ছিল, তখন তাদের শিশুদের যত্ন নিতে হয়েছে। তাদের ব্যস্ত সামাজিক জীবনেও প্রভাব পড়েছে। সে সময় বন্ধুদের হারানোর মহামারি পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও কঠিন হয়েছে।

মহামারিতে সুখী দেশের তালিকায় ব্রিটেনের অবনমন হলেও জার্মানির উন্নতি হয়েছে। তবে মহামারির আগে সুখী দেশের তালিকায় যেসব দেশ শীর্ষে ছিল তারা নিজেদের অবস্থানেই রয়েছে। সর্বোচ্চ র‍্যাংকিং অর্জন করা তিনটি দেশ হলো ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ডেনমার্ক। এই তিনটি দেশ ২০১৭-১৯ সময়কালেও শীর্ষ চারে ছিল। তিনটি দেশই করোনা মোকাবিলা করেছে।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের গবেষকরা দাবি করেননি, করোনা মোকাবিলায় সুখের ইতিবাচক কোনও ভূমিকা রয়েছে। তবে তাদের যুক্তি, যেসব দেশে টেকসই জাতীয় সুখ রয়েছে সেগুলো করোনা মোকাবিলার জন্য ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। আস্থাই এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। গ্যালাপের সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, নিউ জিল্যান্ডের মতো যেসব নর্ডিক দেশ করোনা মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়েছে সেগুলোতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আগন্তুকদের প্রতি মানুষের অনেক বেশি আস্থা রয়েছে। এসব দেশের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, তাদের মানিব্যাগ যদি কোনও প্রতিবেশী কুড়িয়ে পান তাহলে সেটা ফেরত পাবেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের এবারের স্কোর ৫ দশমিক ২৮০। ২০১৭-১৯ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৭তম। তখন স্কোর ছিল ৪ দশমিক ৮৩৩।

আফ্রিকার দেশ লেসোথো, বতসোয়ানা, রুয়ান্ডা ও জিম্বাবুয়ে রয়েছে তালিকার শেষের দিকে। তবে তাদের পরে রয়েছে আফগানিস্তান। এই বছর এসব দেশকে সবচেয়ে অসুখী দেশ হিসেবে তালিকায় তুলে ধরা হয়েছে।

একমাত্র ইউরোপবহির্ভূত দেশ হিসেবে শীর্ষ দশ সুখী দেশের তালিকায় আছে নিউ জিল্যান্ড। যদিও গতবারের তুলনায় একধাপ অবনতি হয়ে তালিকায় ৯ম স্থানে রয়েছে দেশটি। দুই ধাপ উন্নতিতে তালিকায় ২১তম স্থানে অবস্থান করছে ফ্রান্স। যুক্তরাজ্য ১৩ তম থেকে ১৭তম স্থানে নেমেছে এবং একধাপ অবনত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান করছে তালিকার ১৯ নম্বরে।

সূত্র: দ্য ইকনোমিস্ট, এনডিটিভি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •