বার্তা পরিবেশক :

কক্সবাজার, সোমবার ৮ মার্চ ২০২১- আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাসমূহ বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে নারী ও কন্যা শিশুদের নেতৃত্ব ও অবদানকে স্মরণ করছে। মহামারীকালে পরিবার এবং কমিউনিটির সুরক্ষায় তাদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এবছরে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ”নেতৃত্বে নারী: কোভিড পরবর্তী বিশ্বে সাম্যের আগামী” যা কক্সবাজারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সম্প্রদায়ের নারী কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা কোভিড-১৯ মোকাবেলা ও সাড়াদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা কমিউনিটি সংগঠক, কমিউনিটি হেল্থ ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করেছেন, সচেতনতামূলক বার্তাগুলো ছড়িয়ে দিয়েছেন, মাস্ক তৈরি করেছেন এবং এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কাজ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৭০% এর বেশী স্বেচ্ছাসেবী ও স্বাস্থ্য কর্মী নারী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং ল্যাবরেটরি সুপারভাইজার ডঃ আদনিন মৌরিন যিনি ২৬ জনের একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তিনি বলেন- ”গত এক বছর ধরে সারা বিশ্বের মতো কক্সবাজারেও কোভিড পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য কর্মী, কমিউনিটি সংগঠক, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন পেশায় নারীরা অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। এখন ভেবে দেখুন জেন্ডার সংশ্লিষ্ট সংকীর্ণ ধারণাগুলো মুছে নারী অধিকার বজায় রেখে বিজ্ঞানের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কত কিছু অর্জন করা সম্ভব।”

তা সত্ত্বেও, কোভিড-১৯ মহামারী বিভিন্ন ভাবে বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা নারী এবং কন্যাশিশুদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাদের চলাফেরা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, স্বনির্ভরতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত করার মতো বিষয়গুলো বিদ্যমান জেন্ডার সংক্রান্ত ঝুঁকিসমূহ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। উপরন্তু, নারী মানবাধিকার কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের সম্প্রদায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে হয়রানি এবং হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই চলমান সমস্যা ক্যাম্পে সেবাসমূহ সরবরাহকে প্রভাবিত করছে, কেননা শরণার্থী স্বেচ্ছাসেবীরা নিরাপত্তার কারণে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকছেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো বলেন- “প্রতিদিন আমরা নারী এবং কন্যাশিশুদের তাদের পরিবার, সম্প্রদায় এবং দেশের জন্য অনবদ্য অবদান লক্ষ্য করি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যে তারা তাদের নিরাপত্তাজনিত কারনে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। নারী এবং কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। যাতে তারা যথাযথভাবে ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং নেতৃত্ব প্রদানে ভূমিকা পালন করতে পারেন। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

২০২০ সালের অক্টোবর মাস থেকে জেন্ডার বিষয়ক ভূমিকা এবং দায়িত্বের উপর একটি তাৎক্ষনিক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং আশেপাশের স্থানীয় জনগণের উপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব চলমান বৈষম্য ও অসমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধী এবং ট্রান্সজেন্ডার নারীরাদের জন্য এই সমস্যা প্রকট। নারী এবং কন্যাশিশুদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুযোগ কমে যাওয়ার কারনে বিনাবেতনে সেবামূলক কাজে বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এমনকি তাদের বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি বেশি। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে যা জরুরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সক্ষমতা হারাচ্ছে।

সাক্ষাৎকার নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী বলেছেন যে, কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা পেতে হলে তাদের সাবান, মাস্ক এবং অন্যান্য সামগ্রী কেনার অনুমতি প্রয়োজন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা নারী জানিয়েছেন যে, কোভিড উপসর্গ থাকলে তাদের চিকিৎসা কেন্দ্র বা আইসোলেশন সেন্টারে যেতে অনুমতি প্রয়োজন হয়। সাধারণভাবে বিশ্লেষণের ফলাফল দেখাচ্ছে যে, সেবাসমূহ পৌছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকায় জেন্ডার বিষয়ক ঝুঁকির মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ বাংলাদেশের নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তার জন্য মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো অতিরিক্ত তহবিলের আবেদন করেছে। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী এবং কন্যাশিশুদের সম্পৃক্ত করতে সক্রিয় পদক্ষেপ এবং নেতৃত্বের ভূমিকায় তাদের ক্ষমতায়িত করতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আরো বেশি নারীবান্ধব কেন্দ্র তৈরি নারীদের একত্রিত হওয়ার জন্য অতিরিক্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিজেদের লক্ষ্য এবং কর্মসূচি নির্ধারনে ভূমিকা রাখতে পারে। এই কেন্দ্রগুলোতে নারী এবং কন্যাশিশুরা যে কোন সময় সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য যেতে পারেন। যেখানে তারা তথ্য, শিক্ষা, বিনোদনমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সহায়তা ও সেবা পেতে পারেন। ক্যাম্পে নারী সিআইসি এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা এবং প্রভাব তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কক্সবাজারে মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমে নারী ও কন্যাশিশুদের নেতৃত্ব প্রদান এবং অর্থবহ সমতাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। এভাবে একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়েই কোভিড-১৯ এর পরবর্তী বিশ্বে একটি সমতাভিত্তিক ভবিষ্যত বিনির্মান সম্ভব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •