সিবিএন ডেস্ক:
যে ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, যে ভাষণ গোটা বাঙালি জাতিকে উজ্জ্বীবিত করেছিল একযোগে এবং সর্বোপরি যে ভাষণের কারণে বাঙালি পেল একটি স্বাধীন ভূখণ্ড-সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে পেরোতে হয়েছে অজস্র চড়াই-উৎরাই। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই এই ভাষণ প্রচার কার্যত নিষিদ্ধ ছিল।

যে ভাষণ শুনলে এখনও মানুষ শিহরণে আপ্লুত হয়, দীর্ঘদিন তা দেশের মানুষকে শুনতে দেওয়া হয়নি। ভাষণটির ভিডিও সংস্করণ তো টানা একুশ বছর কেউ দেখেইনি। অডিও শুনতেও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল পদে পদে। সম্প্রচারের সময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মাইক। ভাষণ প্রচারের ‘অপরাধে’ কারাবরণও করতে হয়েছিল অনেককে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছে। ওই সময় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ যেমন প্রকাশ্যে করা যায়নি, তেমনি বাংলার মাটিতে সম্প্রচার করা যায়নি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা ২১ বছর কার্যত কারারুদ্ধ ছিল কালজয়ী এ ভাষণ।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোর ওপর ভাষণ প্রচারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ছিল। মাঝে ৫ বছর (১৯৯৭-২০০১) বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা তাঁর ভাষণ প্রকাশ্যে সম্প্রচার করতে পারলেও ২০০২ সাল থেকে আবারও পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায় ভাষণ প্রচার।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মানুষ আবার প্রাণভরে ভাষণটি শুনতে পায়। সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে ভাষণের ভিডিও সংস্করণও সম্প্রচার হতে শুরু করে। ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দেরিতে হলেও ভাষণটির ধার বুঝতে পারে আন্তর্জাতিক মহল। আর তাই ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।

৭ মার্চসহ বিভিন্ন দিবসে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের এখন ভাষণটি শোনানো হচ্ছে। এ ভাষণ নিয়ে নানা গান, গল্প, কবিতা লেখা হচ্ছে। আঁকা হচ্ছে অজস্র ছবি। পাঠ্যপুস্তকে ঠাঁই পাওয়ার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে গবেষণাও হচ্ছে ভাষণটি নিয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো দাপ্তরিক ভাষায় ইতোমধ্যে অনুবাদ করা হয়েছে। এ ভাষণের হাত ধরেই মূলত মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে নতুন প্রজন্ম। উদ্বুদ্ধ হচ্ছে দেশপ্রেমে।

সরকার ইতোমধ্যে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছর থেকেই পালিত হচ্ছে ‘ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ’। দিনটিতে সরকারি, বেসরকারি, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে নানা অনুষ্ঠানের।

এ বিষয়ে সাবেক ছাত্রনেতা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘এখন যেভাবে প্রাণখুলে ভাষণটি বাজাতে পারছি, জাতির পিতাকে হত্যার পর তা পারিনি। নানা বাধা, হুমকি-ধামকির মুখোমুখি হতে হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও সাবেক ছাত্র নেতা মুকুল বোসও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর ভাষণটি যে আমরা একেবারেই বাজাতে পারিনি তা নয়। আমরা শুনেছি। তবে, ভাষণটি বাজাতে গিয়ে অনেক কষ্ট হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমাদের বাজাতে হয়েছে। ভাষণের রেকর্ডও সহজে পাওয়া যেত না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত এই ভাষণের ভিডিও কেউই দেখতে পাইনি। তখন বিটিভিই ছিল একমাত্র সম্প্রচারমাধ্যম। এই দীর্ঘ ২১ বছরে বিটিভিতে একদিনের জন্যও ভাষণটি সম্প্রচার হয়নি। গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন সন্ধ্যায় প্রথমবার বিটিভিতে বঙ্গবন্ধুর চেহারা দেখি, ভাষণের ভিডিও দেখি। আমার অনেক শিক্ষার্থী পরে আমাকে জানিয়েছে যে, তারা এ ধরনের একজন নেতার কথা শুনে অভিভূত, বিষ্মিত। -বাংলা ট্রিবিউন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •