মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী

২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর, শনিবার রাত সাড়ে ১১ টার মতো হবে। ফেসবুকে চোখ বুলাতেই দেখতে পেলাম-বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল স্বপরিবারে কক্সবাজার এসেছেন। তাঁর ফেসবুক আইডি-তে কক্সবাজার বীচে বেড়ানোর কিছু ছবি ভাসছে। চিন্তা করলাম, তাঁরা কোথায় উঠেছেন, সেটা পরদিন রোববার সকালে মোবাইল ফোনে জেনে নিয়ে কোর্ট সময়ের পর তাঁর সাথে একটু সৌজন্য সাক্ষাত করবো। আমি অপদার্থ ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল স্যারকে মোবাইল করার মতো সময় তিনি আর দেননি। তিনি নিজেই রোববার ২৫ অক্টোবর সকাল ১০ টার দিকে আমার সিনিয়র কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মো: ছৈয়দ আলমকে ফোন করে জানালেন ‘আমি এখন কক্সবাজারে আছি। কক্সবাজারের বিজ্ঞ আইনজীবী বন্ধুদের সাথে একটু দেখা করতে চাই।’ ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এর প্রচন্ড আগ্রহ দেখে এডভোকেট মো: ছৈয়দ আলমও তাঁকে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি এলাকায় চেম্বারে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই তিনি এডভোকেট মো: ছৈয়দ আলম এর চেম্বারে চলে আসলেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞ আইনজীবী বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়ের পর কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির প্রধান ভবনে গিয়ে আইনজীবীদের সাথে দেখা সাক্ষাত করতে থাকেন। পরে তিনি আইনজীবী সমিতির সম্মেলন কক্ষে গিয়ে আইনজীবীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে ঘন্টাখানেক মতবিনিময় করেন। খোলামেলা মতবিনিময়ে তিনি আইনজীবীদের মর্যাদা সুরক্ষা, পেশাগত ন্যায্য অধিকার আদায়, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দলমতের উর্ধ্বে উঠে আইনজীবীদের ঐকবদ্ধ থাকা, আইনজীবী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীতা সহ সার্বিক বিষয়ে অত্যন্ত দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সাথে তাঁর মত পেশ করেন।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতিতে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল পদার্পন করার ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যে তাঁর পরিবারের সদস্যরা এবং একই সাথে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কাঁপানো এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেত্রী, কক্সবাজারের মেয়ে, বর্তমানে ঢাকায় বসবাসরত রুবানা কাফি ঝর্ণা আপা’র পরিবারের সদস্যরা ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল’কে মোবাইলে অসংখ্যবার কল করছিলেন। কারণ পূর্ব নির্ধারিত প্ল্যান অনুযায়ী তাঁরা সকলে উখিয়ার ইনানীতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে হোটেল লবি’তে অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন। কিন্তু অসাধারণ আইনজীবী বান্ধব, প্রচুর মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল মোবাইল ফোনের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, শুধু কক্সবাজারের আইনজীবীদের মনের কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তাঁর মূল্যবান মত প্রকাশ করছিলেন।

মতবিনিময় শেষে অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি ত্যাগ করার সময় আমি অধম ও আমার সিনিয়র এডভোকেট মো: ছৈয়দ আলম তিনি ও তাঁর সাথে বেড়াতে আসা সকলকে আমার কুঁড়েঘরে একটু আসার জন্য তাড়াহুড়ো করে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি জানালেন, রোববার ইনানী থেকে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। সোমবার ২৬ অক্টোবর বিকেল ৩ টায় তাঁদের কক্সবাজার থেকে ঢাকামূখী ফ্লাইট এর টিকেট করা রয়েছে। এই টাইট সিডিউলের মধ্যে তিনি কোন চিন্তা না করেই বললেন-‘হ্যা আপনার বাড়িতে যাবো, যদিও ফ্লাইট মিচ করার যথেষ্ট আশংকা আছে’। তিনি বললেন, হোটেল থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে চেক-আউট হবো, বেলা একটায় আপনার বাড়িতে যাবো, আড়াইটার দিকে বিমানবন্দরে যাবো। আমি অপদার্থ মনে মনে খুবই বিস্মিত হলাম। সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির আমি একজন অতি নগণ্য ভোটার। কোন যোগ্যতা আমার নেই। আমি তাঁকে আবার বললাম, ২৬ অক্টোবর সোমবার দূর্গাপুজা’র প্রতিমা বিসর্জ্জন আছে। বেলা একটা হতে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিমা বিসর্জ্জন এর গাড়ি গুলো সমুদ্র সৈকতের দিকে আসতে থাকায় কক্সবাজার শহরে একটু বেশী জ্যাম লেগে যায়। এটা জানানোর পরও ফ্লাইট মিচ করার প্রচন্ড ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তিনি আমি অপদার্থের কুঁড়েঘরে আসতে আবারো ‘হ্যাঁ’ জানালেন। আমার মতো একজন অতি সাধারণ আইনজীবীর আবদার রক্ষা করতেই নিঃসন্দেহে তাঁর এই রাজি হওয়া। তবে আমি শংকিত ছিলাম তাঁরা ফ্লাইট মিচ করবেন কিনা-এ ভয়ে।

যেমন কথা, তেমন কাজ। প্রচন্ড ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তিনি ও তাঁর সফরসঙ্গীরা সকলেই সোমবার বেলা একটার দিকে অধমের কক্সবাজার শহরের এবিসি ঘোনা বাড়িতে হাজির। আমার বাড়িতে আগে থেকেই আমার অনুরোধে আসা এডভোকেট মো: ছৈয়দ আলম, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জিয়া উদ্দিন আহমদ, আমার ছোট ভাই ব্যারিস্টার আবুল আলা ছিদ্দিকী, ইউনিয়ন ব্যাংকের উখিয়া শাখার ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহেদ উল্লাহ তাঁদেরকে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে একেবারে সাদামাটা অভ্যর্থনা জানালেন। অভ্যর্থনা জানানো আমার পরিবারের এই ৪ ব্যক্তি সহ আমার পরিবারের সকল সদস্যকে তিনি যেভাবে সম্মান ও ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন, তাতে তাঁরা রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিলেন। সম্মান দেখানোর সর্বোচ্চটাই তিনি উজাড় করে বিলিয়ে দিয়েছিলেন আমার পরিবারের সদস্যদের মাঝে। আমার বাড়ি থেকে সেদিন তাঁরা বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট ছাড়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে ভাগ্যিস কোনরকমে ফ্লাইটটিতে তাঁরা উঠতে পেরেছিলেন।

আমি আগেই বলেছি, স্বপ্নবাজ ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল ও তাঁর সফরসঙ্গীদের যথার্থ আপ্যায়ন ও উপযুক্ত কদর দেখানোর কোন যোগ্যতা ও প্রস্তুতি আমি অধম এর নেই ও ছিলোনা। আমার পক্ষে তা কখনো সম্ভবও নয়। তারপরও তিনি মানুষকে কত বেশি সম্মানিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেন, তিনি কত বড় মনের মানুষ, তার প্রমাণ হলো, তিনি সেদিন ২৬ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকা হজরত শাহজালাল (র:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে তাঁর আইডি-তে কক্সবাজারের কিছু ছবি দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সে স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরলাম-
“বিদায় কক্সবাজার।
কক্সবাজারে তিন দিনের পারিবারিক ভ্রমণের বিদায় পর্বটা স্মরণীয় করে দিলো, সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিজ্ঞ সদস্য, কক্সবাজারের অতি পরিচিত মুখ এডভোকেট আবু সিদ্দিক ওসমানী ও তার পরিবার। এমন আন্তরিকতাপুর্ণ আতিথেয়তা ভুলার নয়। ভালো থাকবেন সবাই।”

কোভিড-১৯ এর হিংস্র থাবায় পুরো বিশ্বের মতো সারাদেশ যখন ক্ষত বিক্ষত, তখনও জীবনের প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে অদম্য সাহসী ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রতিদিন সুপ্রীম কোর্ট অঙ্গনে এসে সমিতির সদস্যদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। সমিতির দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিনের জন্যও তিনি বারে অনুপস্থিত থাকেননি। সমিতির আইনজীবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ২ টি বিখ্যাত হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। সুপ্রীম কোর্টে আইনজীবীদের কল্যাণে হেলথ ক্যাম্প করেছেন। আমি, আমার মা, আমার সহধর্মিণী, আমার সন্তান সহ একসাথে আমার পরিবারের ৮ সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সার্বক্ষনিক খোঁজ খবর নিয়েছেন। আমাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার স্বাস্থ্য বিভাগ সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। আমার মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যদের তাঁর সমবেদনা জানানোতে আমরা অভিভূত ছিলাম।

অপ্রতিরোধ্য এ মানুষটি তরুণ আইনজীবীদের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ আইনী সেমিনারের ব্যবস্থা করেছেন অনেক। আইনজীবী পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য পারিবারিক মিলনমেলা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রথমবারের মত আইনজীবীদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার করেছেন। মাত্র এক বছরে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সার্বিক কার্যক্রম আধুনিকায়ন করে উন্নত রাষ্ট্রের মডেলে পরিণত করেছেন-সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি অঙ্গনকে। তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন-“পদ ব্যক্তিকে নয় বরং ব্যক্তি পদকে অলংকৃত করে।”

সদা কর্মপাগল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল নামক এই মানুষটি হলো-আসলে সাধারণ আইনজীবীদের অত্যন্ত সুহৃদ, মেধা ও মননে একজন সুশীল ব্যক্তিত্ব, সদা সহাস্যমুখ, নির্ভীক, আইনজীবীদের পেশাগত মান উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সদা ব্রত ও আধুনিক ধারার সফল কারিগর, মুক্ত মনের আইনজীবী, সময়ের সাহসী উচ্চারণ। মানবতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যাঁর পদচারনা প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহুর্ত।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও পেশাগত মান উন্নয়ন, আইনজীবীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে, বারের গতিশীলতা চলমান রাখতে, দূর্নীতিমু্ক্ত বার ও বেঞ্চ চলমান রাখতে, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ১০ ও ১১ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ব্যাক্তি স্বার্থ এবং দলমতের উর্ধ্বে উঠে যিনি নিজেকে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত রাখেন, ম্যান অফ কমিটমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী মুখ, সেই ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস (কাজল) এর চলার পথে আমরা কি একটু সারথি হতে পারিনা? মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •