সিবিএন ডেস্ক:
দেশের ৬৪টি জেলায় ছোট-বড় টুরিস্ট স্পট রয়েছে এক হাজার ৬৭৫টি। আকর্ষণীয় স্পট প্রায় অর্ধশত। এসব স্পটে পর্যটকের নিরাপত্তায় কাজ করছেন প্রায় এক হাজার ৩০০ টুরিস্ট পুলিশ। বর্তমানে ৩২টি জেলায় ১০৪টি টুরিস্ট স্পটে ৭৩টি অফিসের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে সংস্থাটি। সে সব স্পটে ২৪ ঘণ্টায় পেট্রোলিং এর মাধ্যমে নিরাপত্তা দিচ্ছেন তারা।

২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর যাত্রা শুরু হয় টুরিস্ট পুলিশের। টুরিস্টদের নিরাপত্তার পাশাপাশি হোটেল-মোটেলের নিরাপত্তা এবং জনগণকে সচেতন করতে নানা ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে সংস্থাটি। কিন্তু আগে কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে তদন্ত করার ক্ষমতা ছিল না তাদের। ২০২০ সালের ৩ জুন ২২ ধরনের তদন্তের ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে টুরিস্ট পুলিশ বিধিমালা ২০২০ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে দেওয়া হয় তদন্ত ক্ষমতা।

বিধিমালা অনুযায়ী, কেবল পর্যটকদের ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করছে তারা। পর্যটকদের আনাগোনা বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দর্শনীয় স্থানগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে টুরিস্ট পুলিশ। যেকোনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, পর্যটকরা যেনও হয়রানির শিকার না হয়, বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকরা যেনও শঙ্কাহীন ভ্রমণ করতে পারে, সে বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশিদের কাছে টুরিস্ট স্পটগুলোর তথ্য তুলে ধরতে এয়ারপোর্টগুলোতে নিজস্ব ডেস্ক চায় টুরিস্ট পুলিশ। এই ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে এবং পর্যালোচনা চলছে। কোনও বিদেশি বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে পৌঁছালেই, বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে জানাসহ নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হবে তাদের কাছে। এয়ারপোর্টগুলোতে টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা থাকবেন নিরস্ত্র অবস্থায়। বিদেশিদের কাছে ইতিবাচক বিষয় তুলে ধরাই হবে তাদের কাজ। দ্রুত এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে ইতিবাচক সারা পাওয়া যাবে বলে মনে করছে টুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তারা।

টুরিস্ট পুলিশের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটগুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন ২ কোটি ৬০ লাখের মতো। এই সময় সমুদ্রে নেমে পানিতে তলিয়ে যাওয়া থেকে ২৭ পর্যটককে উদ্ধার করে টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। এছাড়া ঘুরতে এসে হারিয়ে যাওয়া ৫০ শিশুকে উদ্ধার করেছে তারা। পর্যটকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি অভিযোগসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে ২৩ জনকে। আর এই (২০২১ সাল) বছরের শুরুতেই জানুয়ারি মাসে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীর ভিড় ছিল প্রায় ৪১ লাখের মতো।

পর্যটকদের সেবায় টুুরিস্ট পুলিশ
বর্তমানে টুরিস্ট পুলিশের তদন্তে থাকা তিনটি মামলা রয়েছে। এই তিনটি মামলাই কক্সবাজার এলাকার। ২০২০ সালে ৩১ অক্টোবর ছিনতাইয়ের একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তদন্ত শুরু করে টুরিস্ট পুলিশ। এই বিষয়ে টুরিস্ট পুলিশের (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) শাখার পুলিশ সুপার ইব্রাহিম খলিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটন এলাকায় পর্যটকের দেহ ও সম্পত্তি বিষয়ে কোনও ঘটনা ঘটলে টুরিস্ট পুলিশ তার তদন্ত করবে। পর্যটকরা যে কোনও সমস্যায় পড়লে টুরিস্ট পুলিশ হটলাইন: +৮৮০১৩২০১৬৩৬৯৯ নম্বর ছাড়াও মোবাইল অ্যাপস Hello Tourist-এ অভিযোগ বা পরামর্শ জানাতে পারছেন।’

টুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার (ট্রেনিং অ্যান্ড ওরিয়েন্টেশন) আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা তদন্ত কাজে মাঠে থাকবেন। তদন্তের জন্য তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। টুরিস্ট পুলিশের আওতাধীন বর্তমানে ৩২টি জেলায় ঢাকায় এবং মাঠপর্যায়ে চলছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।’

পাহাড়, সমুদ্র সৈকতগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে টুরিস্ট পুলিশের। স্বল্প লোকবল নিয়েও কাজ করে যাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে এলাকায় রয়েছে চারটি টুরিস্ট পুলিশ হেল্প ডেক্স, পেট্রোলিং, বিচ কেন্দ্রিক রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি। এছাড়া সমুদ্র সৈকত নামতে জোয়ার-ভাটার সময় পর্যবেক্ষণ করছে দায়িত্বরত টুরিস্ট পুলিশ সদস্যরা।

এছাড়াও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্পট যেমন- বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, সেন্ট মার্টিন, টেকনাফসহ বেশ কিছু এলাকাতে রয়েছে টুরিস্ট পুলিশের বিশেষ নজরদারি।

টুরিস্ট পুলিশ প্রধান ডিআইজি মোর্শেদুল আনোয়ার খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা পেট্রোলিং চালিয়ে যাচ্ছে। প্রো-একটিভ পলিসি নিয়ে কাজ করছে টুরিস্ট পুলিশ। বাহিনীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আধুনিক সরঞ্জাম সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগুচ্ছে। এছাড়া পর্যটন কেন্দ্রগুলো হোটেল মোটেলে পর্যটকদের তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ডাটাবেজ তৈরির কাজও চলছে।’

যে সব মামলার তদন্তে টুরিস্ট পুলিশ:
২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর কক্সবাজারে হোটেলে ফেরার সময় এক পর্যটক ছিনতাইয়ের শিকার হন। সেই ঘটনার সময় পাশে থাকা টুরিস্ট পুলিশের পেট্রোল টিম তিন ছিনতাইকারীসহ একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে আটক করে। পরবর্তীতে কক্সবাজার সদর থানা একটি মামলা দায়ের করা হয়। এই ছিনতাইয়ের মামলার মধ্য দিয়ে প্রথম তদন্তভার গ্রহণ করে টুরিস্ট পুলিশ। এছাড়া অন্য দুটি মামলার মধ্যে একটি ছিনতাই মামলা, অন্যটি সৈকতে পর্যটককে আহত করার ঘটনায় মামলা। এছাড়াও আদালতের নির্দেশে সাতটি সিআর (কমপ্লেইন রেজিস্টার) মামলা তদন্ত করছে কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশ।

টুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার জিললুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত করার ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে কক্সবাজারে তিনটি মামলা হয়। সেই তিনটি মামলার তদন্ত চলছে, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। হোটেল কেন্দ্রীক দালালদের দৌরাত্ম থামাতে নজরদারি রয়েছে। যেকোনও তথ্য পেতে ও অভিযোগ জানাতে কক্সবাজারের লাবনী সৈকত ছাড়াও শহরের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে টুরিস্ট পুলিশের হেল্প ডেস্ক।’

উদ্ধার কাজ কিংবা পেট্রোলিংয়ে রয়েছে যেসব যানবাহন:
পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশের রয়েছে বিচ রেস্কিউ মোটরসাইকেল, স্যান্ড সাপোর্ট ভেহিকেল, পোর্টেবল ফোল্ডিং বোট, স্পিড বোর্ড, ওয়াটার বাইক, মোটরসাইকেল, মিনিবাস, ডাবল কেবিন ও মাইক্রোবাস। এছাড়াও আরও উন্নত উদ্ধার সরঞ্জাম আনতে কাজ চলছে। সেগুলো যুক্ত হলে আরও দক্ষতা বাড়বে টুরিস্ট পুলিশের। -বাংলা ট্রিবিউন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •