আবদুল মালেক

ভাষা বলতে আমরা মূলত মাতৃভাষা বুঝি, যে ভাষায় কথা বলে আমার মা, বাবা আমার আত্মজরা এবং প্রাণের সুর ও টান সেখানে মিলেমিশে একাকার। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, প্রাণের ভাষা, এ ভাষার রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। এ ভাষাকে ঘিরে আমাদের যে ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং আত্মাহুতির বর্ণিল ইতিহাস, তা শুধু আমাদের চেতনার আত্মপ্রকাশ নয়, সেখানে রয়েছে আমাদের স্বাধিকার এবং আত্মচেতনার বহিঃপ্রকাশ, যে সংগ্রাম ও চেতনার মধ্যে দিয়ে আমরা আজ স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। সত্যি কথা বলতে কী, একুশ আমাদের বাঙালি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং পরিচয়ের জায়গা কে সুদৃঢ় করেছে।

আজ সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে, বিশ্বের মানুষ বাংলা ভাষা সম্পর্কে জানে এবং অনেক বিদেশি গবেষক এ ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছে এবং করছে। ১৯৫২ সালের দিকে জিন্নাহ সাহেব যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বাঙালিকে দেখিয়ে ছিলেন সেখান থেকে বাঙালি তার মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে গিয়ে সংগ্রামে জড়িয়ে পড়লো, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে সংঘটিত হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আমরা স্বাধীন হলাম। উল্লিখিত কথাগুলো আমাদের সবারই জানা আমি এখানে একটু অন্য প্রসঙ্গে বলতে চাই। যেটা আমাকে ভাবায় এবং মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আজ প্রায় ৬৬ বছর পার করেছি, ভাষা সংগ্রাম আমাদের চেতনার এবং ইতিহাসের মৌলিক উপাদান; অবিচ্ছেদ্য অংশ আমাদের প্রাণের এবং প্রণতির। সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাস অনেক বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষের সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতহাস। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির আশীর্বাদে সমস্ত পৃথিবী এখন উন্মুক্ত; সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে বিল গেটস এবং মার্ক জাকারবার্গ; সমগ্র পৃথিবী আজও আমেরিকান উপনিবেশের বেড়াজালে আবদ্ধ, অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির কথা বলে তারা আমাদের ওপর নব্য সাম্রাজ্যবাদের ধারায় ঘারের ওপর বসে আছে। আমরা তথা সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এখন মার্কিনিদের জালের ভেতর থেকে বের হতে পারিনি এবং সেই প্রেক্ষাপটকে ঘিরেই সমগ্র বিশ্বে যে নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছে সেখান থেকে আমরা বিছিন্ন নই। আমাদের স্বপ্ন যে তরুণ প্রজন্ম এবং তারুণ্য তা আজ অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আটকে গেছে, তাদের ভেতর সৃষ্টি হয়েছে এক নব্য বিশ্বসংস্কৃতির ধারা, যা আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করছে এবং জারিত করছে আমাদের মৌলিক ভাবনার মূল বিষয়গুলো থেকে।

আপনারা ভাবতে পারেন আমি ভাষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কেন মাথাব্যথার কারণ ঘটাচ্ছি; ঘটনা সেটা নয়। আপনি যখন শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন তখন খুব সহজেই আপনাকে উপড়ে ফেলা যাবে, সেই উপড়ানোর কাজটি সহজ করছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। আমাদের তরুণ প্রজন্ম আজ বই পড়া ভুলে গিয়ে অধিকাংশ সময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত এবং বর্তমানে সেটা বিশ্বের সমাজবিজ্ঞানীদের এবং সাইকিয়াট্রিস্টদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্য কথা বলতে কী, সত্যিকারের মানুষ হতে গেলে আমাদের আলোকিত হতে হবে, আর সে জন্য প্রয়োজন প্রচুর পাঠাভ্যাস অর্থাৎ বইপড়া। কবি সিকদার আমিনুল হক তো বলেই গেছেন- যে ছেলে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী পড়েছে, অপুর সংসার পড়েছে সে কোনো সন্ত্রাসী হতে পারে না। আমাদের এ তরুণ প্রজন্মের বই না পড়ার কারণে তারা ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আজকে সারা দেশে বাংলা সাহিত্য পাঠন এবং পঠন সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। ফলে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম এবং তাদের চেতনার জায়গায় যে ধস নামছে, সেটার ভয়াবহতা আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি।

আজ দেখুন আপনি আপনার পাশের লোকটির সঙ্গে কথা না বলে মোবাইলে চ্যাট করছেন দূরের কোনো অচেনাজনের সঙ্গে। শুধু সাময়িক মজার জন্য, আমি সেটাকে আনন্দ বলবো না। আনন্দ হলো মানুষের আত্মার স্বতঃস্ফূর্ততার বহিঃপ্রকাশ। মজার ঘটনা হলো, আজ যারা শিক্ষত যুবসমাজ তাদের প্রায় সত্তরভাগ ছেলেমেয়ে ভালোভাবে শুদ্ধ এবং ভুল বানান ছাড়া বাংলা লিখতে পারে না। তাদের যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন গর্ব করে বলবে বাংলাটা আমার ভালো আসে না! মোদ্দাকথা হলো, যারা নিজের ভাষা ঠিকমতো জানে না তারা ইংরেজি ভাষা ভালো করে কীভাবে জানবে? নিজের মায়ের নাম ভালোভাবে বলতে না পেরে যদি শাশুড়ির নাম ভালোভাবে জানি, সেটা অন্যের কাছে নিজেকে যেমন ছোট করা হবে তেমনি নিজের পূর্বপুরুষদের ছোট করা হবে। বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের কোনো মাথাব্যথা নেই; কারণ একটাই, এ ভাষা জেনে বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমাদের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্য হলো মোটামুটি পড়াশোনা শিখে বিদেশে পাড়ি দেওয়া। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ আছে যারা ইংরেজি ভালো জানে না এবং সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা নেই বরং তারা নিজের ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চা করে আজ বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ হয়ে গেছে।

আমি এখানে ইংরেজি ভাষাকে ছোট করে দেখছি না, দেখছি আমাদের ভাবনার এবং মৌলিক চেতনার জায়গাটা। এ অবস্থার জন্য আমরা শুধু তরুণ প্রজন্মকে দোষারোপ করলে হবে না, দোষী আমাদের অভিভাবকরাও। সত্যিকার অর্থে বাংলাভাষা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই, সবাই কেমন যেন এ ভাষাকে ব্রাত্যজনের ভাষা মনে করে। বলতে দ্বিধা নেই, অনেক বড় বড় সরকারি বে-সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন, (সবাই নয়, তাদের সংখ্যা দিন দিন কমছে) যাদের অফিসিয়াল নোটে কিংবা লেখায় অনেক বানান ভুল, তাদের কাছে এটা মামুলি ব্যাপার কিন্তু তারা যে খুব ভালোভাবে ইংরেজিটাও জানে তা কিন্তু নয়। এ হলো আমাদের ভাষাপ্রীতি ও দেশপ্রেম। দেশের সরকার মাতৃভাষাকে সর্বজনীন করার জন্য রীতিমতো আইন করেছে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতে রায় হয় ‘বাংলা ভাষার প্রচলন আইন’ নামে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত অধ্যাপক এবং দেশের কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান বলেন, যখন আইন ছিল না তখন মানুষ ভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে এবং প্রাত্যহিক জীবনে বাংলা ব্যবহার করেছে। তার মতে বাংলা ভাষার প্রতি উদাসীনতা বাড়ছে, এর মূল কারণ সদিচ্ছার অভাব। ১৯৮১ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ (বাবাকো ) প্রতিষ্ঠা হয়। সেই কোষের কার্যক্রমও চলছে ঢিমেতালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাবাকো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৪টি আইন, বিধি ও অধ্যাদেশ প্রমিতকরণ করেছে। এছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ৫৪টি আইন ও অধ্যাদেশ প্রমিতকরণ করেছে।

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক বলেন, বাংলার ব্যবহার নিয়ে সর্ব ক্ষেত্রে অদ্ভুত রকমের উদাসীনতা, অবহেলা ও সদিচ্ছার অভাব লক্ষ করা যায়। তা না হলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও বাংলার ব্যবহার কমে যেতো না। পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকে আজকের চেয়ে বেশি বাংলা ব্যবহার করা হতো।

বর্তমানে প্রমিত বাংলা থাকলেও বর্তমান প্রজন্ম বাংলার সেই প্রকৃত প্রমিত রূপকে বিকৃত করে অন্য এক হাইব্রিড ভাষা সৃষ্টি করছে, যা কাম্য নয়। ভাষার রূপান্তর ঘটবে, পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম, আমরা সেটা উপেক্ষা করতে পারবো না কিন্তু সেটা হয় প্রয়োজনের তাগিদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটা গভীর সংগ্রাম ও চেতনার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, সেটা সর্বজনীন এবং নন্দিত। আমরা যেন দিন দিন আমাদের মাতৃভাষার প্রকৃত স্বর ও স্বরলিপি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি, তবুও আশার বাণী যে এখন দেশের কতিপয় তরুণ এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও মাতৃভাষাকে আশ্রয় করে সাহিত্যের মননশীল চর্চা করে যাচ্ছেন। মাতৃভাষার জন্য আমাদের অগ্রজরা রক্ত দিয়েছেন, তাদের সেই ত্যাগ আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে বিবর্তনধারায় আলোকিত করবেন, সে প্রত্যাশা অমূলক নয়।

লেখক: মহাসচিব ,হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদ রামু।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •