ছোটন কান্তি নাথ :

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কক্সবাজারের সকল উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ পেতেছে ‘সেইফ্ হেলথ প্রকল্প’ নামের একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদন ও স্বীকৃতি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় একটি পত্রিকায় ‘জরুরী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশের মাধ্যমে পুরো জেলায় এই অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং পরীক্ষা নিয়ে শুক্রবার থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে উঠেছে।

ইতোমধ্যে চক্রটি মেডিক্যাল অফিসার ও স্বাস্থ্যকর্মী পদে নিয়োগের আবেদনের বিপরীতে কয়েক হাজার প্রার্থীর কাছ থেকে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে ৩৫০ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অংকের টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর চাকরি পেতে জেলার চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা থেকে অন্তত দুই হাজার প্রার্থী আবেদন করেন মহাপরিচালক, সেইফ্ হেলথ প্রকল্প, মহাখালী, ঢাকা বরাবরে। প্রতিটি আবেদনের বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের মহাখালী শাখার নির্দিষ্ট একাউন্টের (এইচ.এ.এম.এ ট্রেনিং ফাউন্ডেশন, হিসাব নং- ০১২০৬০২০০০৭০৬) অনুকূলে ৩৫০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট আবেদনের সাথে সংযুক্ত করে দেন। পরবর্তীতে তাদের নামে ইস্যু করা হয় নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র। সেই প্রবেশপত্র নিয়ে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চকরিয়া সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন ৭২৯ জন চাকরি প্রার্থী যুবক-যুবতী।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, এ ধরনের কোনো এনজিও, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব তাঁর জানা নেই এবং পরীক্ষা বিষয়েও তিনি অবগত নন। এর পরও তিনি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের মো. সুমন নামের একজন দাবি করেছেন, সেইফ্ হেলথ প্রকল্পে স্বাস্থ্যকর্মী পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে বেশ কয়েকজন বেকার যুবকের কাছ থেকে ইতোমধ্যে ২০ হাজার টাকা করে হাতিয়েছেন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত কক্সবাজার জেলা ব্যবস্থাপক (ডি.এম) কথিত ডাক্তার দেলোয়ার হোসেন রুবেল। একইভাবে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অসংখ্য বেকার যুবক-যুবতীর কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে ফেলে মোটা অংকের টাকা নেওয়ারও তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে।

গতকাল শুক্রবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী জানান, পরীক্ষা চলাকালে যাতে কোন ধরণের সমস্যার সৃষ্টি না হয় সেজন্য পুলিশও পাহারায় ছিল।

পুলিশের পাহারা থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চকরিয়া থানার ওসি শাকের মোহাম্মদ যুবায়ের বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে থানা পুলিশকে অবগত করার পর পুলিশের একটি টিম পরীক্ষাস্থলে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া বা সঠিক কী-না তার বিস্তারিত তথ্য পুলিশের কাছে নেই।

ওসি বলেন, যদি কোন চাকরিপ্রার্থী প্রতারণার শিকার হন এবং এনিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তাহলে তদন্তপূর্বক পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ‘সেইফ্ হেলথ প্রকল্প’ নামের কোন প্রকল্প পরিচালনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন বা স্বীকৃতি রয়েছে কী-না জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদুল হক বলেন, ‘করোনাকে পুঁজি করে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বেকার যুবক-যুবতীর কাছ থেকে মূলতঃ মোটা অংকের টাকা হাতানোর উদ্দেশ্যে এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে নামসর্বস্ব শতভাগ ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি।’

উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধান বলেন, ‘প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যারা নিজেকে ডাক্তার হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাদের কোন স্বীকৃতিও নেই। অতএব স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সরকারের কোন সংস্থা এই প্রতিষ্ঠানকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাঠে কাজ করার কোন অনুমোদন দেয়নি। এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের ভুয়া প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে সবাইকে সতর্ক এবং সাবধান থাকতে হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানভীর হোসেন বলেন, ‘এই ধরণের কোন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কোন তথ্য আমার কাছে নেই। তবে ইউএনও স্যার বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। তিনি স্টেশনে থাকাকালীন কোন চিঠি তাকে দেওয়া হয়েছিল কী-না সেই ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি।’

প্রসঙ্গত- গত বছরের নভেম্বরে গাইবান্ধা জেলায় একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেখানকার পুলিশ নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তথা চেয়ারম্যান ডা. মনিরুলকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। এনিয়ে সময় টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়।

বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হয় সেইফ্ হেলথ প্রকল্পের কক্সবাজার জেলা ব্যবস্থাপক ডা. দেলোয়ার হোসেন রুবেলের সঙ্গে। এ সময় তিনি দাবি করেন, ঢাকায় আমাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হচ্ছেন ডা. মনিরুল আলম। সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি এবং চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় আমরা কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে প্রতি উপজেলায় প্রতিজনকে ২২৫০০ টাকায় তিনজন করে মেডিক্যাল অফিসার এবং প্রতিজনকে ১২৫০০ টাকায় প্রতি ইউনিয়নে ৯ জন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। তারই আলোকে চকরিয়ায় আজকে (গতকাল) এমসিকিউ পদ্ধতিতে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চকরিয়া থানা সেন্টারেও প্রতিষ্ঠানের নামে একটি অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলেও জেলা ব্যবস্থাপক দেলোয়ার দাবি করেন।
অপরদিকে ০১৭১০০৫৮০৬৯ নাম্বার থেকে এইচ.এ.এম.এ ট্রেনিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে

এই প্রতিবেদককে ফোন করেন ডা. মো. মনিরুল আলম। তিনি নিজেকে সমুদ্রবাংলা পত্রিকার সম্পাদক এবং দৈনিক রূপবাণী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও পরিচয় দেন। তিনি বলেন, আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে বেকার যুবক-যুবতীদের চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি তাদেরকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। যাতে তারা একেকজন উদ্যোক্তা তথা পল্লী চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন, জয়েন্ট স্টক কোম্পানী থেকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। যার লাইসেন্স নম্বর- ১৩০৯৪।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •