আনোয়ার হোছাইন, ঈদগাঁও :

কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডিতে শীতের রাতে গাছের সাথে বেঁধে গৃহবধূকে নির্যাতনের একটি ভিডিওচিত্র সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঘটনার কিছু অংশের চিত্র জনতার মোবাইলে মোবাইলে। যা দেখে নিন্দা-ধিক্কারের ঝড় উঠেছে। প্রকৃত ঘটনা জানতে ছুটে চলছে গণমাধ্যমকর্মীরা।

পরকিয়ার অভিযোগে কয়েকজন বখাটে যুবক মিলে ঘটনাটির জন্ম দিয়েছে বলে জানা গেছে।

ভিকটিম নুর আয়েশা চৌফলদন্ডি ৬ নং ওয়ার্ডের খামারপাড়ার বেদার মিয়ার স্ত্রী।

ভিডিওতে দেখা গেল- ওই গৃহবধুকে কেউ কেউ বেধড়ক পিটাচ্ছে। কেউ শাড়ি-ব্লাউজ ধরে টানা হেঁচড়া করছে। আবার কেউ গৃহবধূর স্পর্শ কাতর স্থানে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করে চলছে। মহিলার পরিবারের সদস্যদের দেখে দেখে চোখের জল ফেলা ছাড়া কোন উপায় ছিলনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঘটনাটি গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতের।

ওইদিন স্থানীয় কিছু যুবকের ধারণকৃত ভিডিওতে দেখা যায়- নুর আয়েশাকে রাস্তার পাশে একটি গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। জাগির হোছন নামের আরেকজনকেও একই গাছের বিপরীত দিকে রশি দিয়ে বাঁধে। দুই জনের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে হয়। মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত একনাগাড়ে চলে পৈশাচিক নির্যাতন। ঘটেছে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা।

পরে ভোররাতে নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে যেন কোন আইনি ব্যবস্থা নিতে না পারে কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেয় এবং হুমকিতে ঘর ছাড়া হয়ে যায়।

তবে, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করছে একটি পক্ষ। ইতোমধ্যে বেশ রাজনীতির খেলাও শুরু হয়ে গেছে। তারা চেষ্টা করছে, কিভাবে এই ঘটনাকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষ দমন করা যায়।

এদিকে, দেরিতে হলেও ওই ঘটনার ভিডিও চিত্র ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এতে চারদিকে নিন্দা, ঘৃণা ও ধিক্কার জানানোর পাশাপাশি ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে। ওই পাশবিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা হয়।

ঘটনার সাথে স্থানীয় কবির আহমদ, ইলিয়াস, শাহাবুদ্দিন, রাশেল, এরশাদ চৌকিদার এরশাদ, দফাদার জহির, রণি, রাজু, আমির হোসেনসহ আরো কয়েকজন জড়িত বলে ভিকটিম ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে গৃহবধূর ঘরের দরজায় আঘাতের পর আঘাত করতে থাকে। এক পর্যায়ে ঘুমন্ত নুর আয়েশার শ্রবণ প্রতিবন্ধী স্বামী বেদার দরজা খুলে দিলে হায়েনারা নুর আয়েশার বিরুদ্ধে পরকীয়া প্রেমের অভিযোগ তুলে তাকে টেনেহেচঁড়ে ঘর থেকে বের করে রাস্তার একটি গাছের সাথে বেঁধে  লাঠিপেঠা শুরু করে।  শীতের রাতে ঐসময় মহিলার শরীরে মেকসি-ব্লাউজ ছাড়া কিছু ছিলনা।তার অর্ধনগ্ন শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে শ্লীলতাহানি করে এবং হাজারো মানুষের সামনে তারা আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে উপভোগ করে।এ নারী তাকে রক্ষার আকুতি জানালেও প্রভাবশালীচক্রের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ বা রক্ষার সাহস করেনি।

নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর স্বামী-সন্তানরা অসহায়ের মত চেয়ে চেয়ে দেখেছে ওই নিপীড়ণের চিত্র। ফেলেছে চোখের পানি।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকটিমের স্বামী বেদার মিয়া বলেন, আমার স্ত্রী সেদিন আমার পাশেই ঘুমিয়ে ছিল। পরকীয়া প্রেমের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটি সাজানো নাটক।

তিনি বলেন, আমি প্রতিবন্ধী হওয়ার সুযোগে আমার স্ত্রীকে কুপ্রস্তাব দিয়ে প্ররোচিত করত কিছু লোক। সে প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে নানা অযুহাতে, আর অভিযোগে আমার পরিবারকে নিগৃহীত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় মেম্বার মোহাম্মদ মিয়া জড়িত থাকার কথা শোনা গেলেও তা অস্বীকার করেছেন ভিকটিমের স্বামী বেদার মিয়া। তিনি বলেন, খবর পেয়ে মেম্বার ছুটে না গেলে বখাটেরা আরো মারধর করতো। তিনি উদ্ধার ও সমাধানের চেষ্টা করেছেন।

জাগির হোসেনের সাথে তার স্ত্রীর পরকিয়া নেই দাবি করেন বেদার মিয়া।

নির্যাতিতা নুর আয়েশা বলেন, আমার স্বামী একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধি। সেই সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার চিহ্নিত কতিপয় লম্পট ও দূর্বৃত্ত আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করে আসছে। তারা সফল না হওয়ায় স্থানীয় জাগিরকে জড়িয়ে আমার সাথে পরকীয়া প্রেমের মুখরোচক গল্প বানায় এবং সেদিন ওই নাটকটি মঞ্চস্থ করে। মূলত জাগিরও ওই দলের সদস্য ।

কান্না জড়িত কন্ঠে ভিকটিম নুর আয়েশা বলেন, ঘটনার পর থেকে হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এক মাস যাবত ঘর ছাড়া ছিলেন।এক সপ্তাহ পূর্বে প্রাণের মায়া ছেড়ে ঘরে ফিরেছেন। এখনো রীতিমতো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

ঘটনার বিষয়ে চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়াজ করিম বাবুলের নিকট জানতে চাইলে বলেন, আমি বিস্তারিত কিছুই জানিনা। কেউ অভিযোগও দেয়নি । তবে, মুখেমুখে কিছু কথা শুনতেছি।

স্থানীয় মেম্বার মোহাম্মদ মিয়া জঙ্গীর কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, নির্যাতন থেকে ওই মহিলাকে বাঁচাতে সেদিন এগিয়ে যাই। সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিছু দুষ্ট লোক প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টায় লিপ্ত।

কক্সবাজার মডেল থানার ওসি (তদন্ত) বিপুল চন্দ্র দে বলেন, এখনো এরকম কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •