মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

রোববার ৭ ফেব্রুয়ারী সকাল ১০টার দিকে উদ্বোধন করা হবে মানবদেহে করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগের কর্মসূচী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশের সাথে কক্সবাজারেও আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি আরো জানান, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষ থেকে সম্মানিত অতিথিরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সাথে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রম শুরু করবেন। উদ্বোধনকালে টিকাদান কর্মীদের ভ্যাকসিন দিয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সাথে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রম উদ্বোধনের সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান। সদর উপজেলা ব্যতীত জেলার অন্য ৭টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং রামু সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আগামী ৮ফেব্রুয়ারী অথবা ৯ ফেব্রুয়ারী থেকে মানবদেহে করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন-করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ও সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান।

তিনি আরো জানান, উপজেলা গুলোর লোকসংখ্যা ও রেজিষ্ট্রেশন অনুপাতে জেলার অন্য ৭টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং রামু সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শনিবার ৬ ফেব্রুয়ারী জেলা ইপিআই স্টোর থেকে নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রেখে ভ্যাকসিন প্রেরণ করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলায় করোনার ভ্যাকসিন নিতে সরকার নির্ধারিত ক্যাটাগরীতে থাকা উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ১৫ ক্যাটাগরীর তালিকা থেকে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ৩৯ হাজার জনের তালিকা তৈরী করা হয়েছে। এরমধ্যে, কক্সবাজার জেলা সদরে প্রায় এক হাজার ব্যক্তি ৬ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রেজিষ্ট্রেশন করেছেন বলে জানিয়েছেন- সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান। তিনি আরো জানান, রেজিষ্ট্রেশন চলমান থাকায় পুরো কক্সবাজার জেলায় মোট কতজন রেজিষ্ট্রেশন করেছেন তা এখনো নির্ণয় করা যায়নি।

তবে ভিন্ন একটি সুত্র মতে, একই সময় অর্থাৎ ৬ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পুরো কক্সবাজার জেলায় রেজিষ্ট্রেশন করেছেন মাত্র প্রায় ৭ হাজার ব্যক্তি। যা প্রণীত তালিকার শতকরা প্রায় ১৭ ভাগ মাত্র। ইন্টারনেটে সুরক্ষা এ্যাপে গিয়ে ১৫ ক্যাটাগরীতে থাকা উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আগ্রহী নাগরিকগণ করোনা ভ্যাকসিন নিতে সবসময় রেজিষ্ট্রেশন করতে পারবেন। রেজিষ্ট্রেশন করতে নির্ধারিত কোন সময় নেই বলে জানিয়েছেন-সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান।

কক্সবাজার জেলা সদরে তিনটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে জেলা সদর হাসপাতাল, কক্সবাজার সিভিল সার্জনের কার্যালয় ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজকে কক্সবাজার জেলা সদরের করোনা ভাইরাসের টিকাদান কেন্দ্র করা হয়েছে। এরমধ্যে, মানবদেহে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য ৮টি প্রশিক্ষিত টিম জেলা সদর হাসপাতালে, ৪টি টিম কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে এবং সিভিল সার্জন অফিসে ২টি টিম কাজ করবে।

এছাড়া, রামু সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪টি টিম, জেলার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২টি টিম এবং প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে টিম মানবদেহে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য কাজ করবে। এছাড়া, প্রয়োজন হলে যেকোন সময় যাতে কাজ করতে পারে, সেরকম আরো কিছু সংখ্যক প্রশিক্ষিত টিম স্টেনবাই রাখা হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, সংসদ সদস্য কানিজ ফাতেমা আহমেদ, কক্সবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশীদ, পুলিশ সুপার মোঃ হাসানুজ্জামান (পিপিএম), কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. অনুপম বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এডভোকেট ফরিদুল ইসলাম, জেলা বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহবুবুর রহমান সহ বিশিষ্টজনদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন-সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান।

এছাড়াও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সুপার ডা. রফিক উস সালেহীন, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. নওশাদ রিয়াদ, ডা. শাহীন আবদুর রহমান, জেলা ইপিআই সুপার সাইফুল হক, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য রুস্তম আলী চৌধুরী প্রমুখ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, গত ৩১ জানুয়ারী ৮৪ হাজার ডোজ করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কক্সবাজারে আনা হয়েছে। কক্সবাজারে আনা করোনার ভ্যাকসিন গুলো ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড আ্যাষ্ট্রাজেনের “কোভি শিল্ড” টিকা।

কক্সবাজারে আনা ৮৪ হাজার ডোজ করোনার ভ্যাকসিনে ৮ হাজার ৪০০ ভায়াল রয়েছে। প্রতিটি কার্টনে এক হাজার ২০০ ভায়াল টিকা আছে। প্রতিটি ভায়ালে টিকা রয়েছে ১০ ডোজ। সে হিসাবে কক্সবাজারের ৪২ হাজার নাগরিককে করোনা ভাইরাসের এই ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে।

একজন নাগরিককে ২ ডোজ করে করোনা ভাইরাসের এই টিকা দিতে হবে। এক ডোজ টিকা দেওয়ার ৮ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হবে।

সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ক্যাটাগরীর উদ্দিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নাগরিকগণকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনা ভাইরাসের এই টিকা দেওয়া হবে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উদ্দিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নাগরিকগণ হলো : সকল সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সকল সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, স্বাস্থ্য কর্মী, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বাস্থ্য বিভাগীয় সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, মেডিকেল কলেজের সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনাবাহিনী সহ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল সদস্য, বিজিবি, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, গণমাধ্যম কর্মী, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়োজিত ব্যক্তি, রাষ্ট্র পরিচালনার নিমিত্তে অপরিহার্য সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবাদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, স্বাস্থ্য কর্মী, জনপ্রতিনিধি সহ উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তা কর্মচারী, বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকগণ, ধর্মীয় প্রতিনিধি, ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণসহ যারা করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য তালিকা পাঠিয়েছেন, করোনার সম্মুখযোদ্ধা সহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত স্টাফ এবং ৫৫ বছরের উর্ধ্ব বয়সী নাগরিকগণ।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সহ প্রতি উপজেলা থেকে ৫ জনকে মানবদেহে করোনা ভাইরাসের টিকা প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আবার প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা জেলার টেকনেশিয়ান, নার্স, উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, পরিবার পরিকল্পনা ভিজিটর সহ সংশ্লিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধনের মাধ্যমে যাদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে, তাদের শরীরে করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানাদিক বিশ্লেষণসহ হাতে-কলমে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •