সিবিএন ডেস্ক:
আদালতের নির্দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের মধ্যে বেসরকারি স্কুল ও কলেজে কর্মরত অনেকেই তদবির করে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। আবার অনেকেই বছরের পর বছর চেষ্টা করে এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনার পর দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে হালনাগাদ প্রতিবেদন পাঠাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছে।

গত ১৩ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে হালনাগাদ প্রতিবেদন পাঠাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে দারুল ইহসান বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ইউজিসি অনুমোদিত সকল বিষয়ে পাস করা শিক্ষার্থীদের সনদের বৈধতার জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রদান এবং মূল সনদ ইস্যু করার জন্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন করার কথা বলা হয়। এ বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পত্র ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পাঠানো হলো। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ওই পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।

প্রসঙ্গত, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক সনদ (প্রবেশনাল) নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন হাজারও শিক্ষার্থী। কিন্তু মূল সনদ পাওয়ার আগেই আদালতের নির্দেশে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়টি। ফলে মূল সনদ নেই কোনও শিক্ষার্থীর কাছে। এ কারণে মূল সনদ ইস্যু করতে পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং সনদের বৈধতার বিষয়ে ইউজিসির কাছে প্রতিবেদন চায় মন্ত্রণালয়।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ইউজিসির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনগতভাবে যা করণীয় তা করা হবে।’

এদিকে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী নন-এমপিও শিক্ষক ও সহকারী গ্রন্থাগারিকদের অভিযোগ, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে এমপিও দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতি গ্রহণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দফায় দফায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দ্বৈতনীতি গ্রহণের বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও মন্ত্রণালয় আমলে নেয়নি। সর্বশেষ গত বছর ৮ জুলাই শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদের পক্ষে সচিব বরাবর বিষয়টি সুরাহার জন্য আবেদন জানানো হয়।

ঢাকার নবাবগঞ্জের বকসনগর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক মোহাম্মদ ছিয়ামুল হক তার লিখিত আবেদনে বলেন, ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল উচ্চ আদালত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার বলে উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে। হাইকোর্টে রায় চ্যালেঞ্জের পর ২০১৭ সালের ১৯ জুন সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, আগ্রহী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা যেকোনও অংশীজন স্ব-ব্যাখ্যায় পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যবেক্ষণ করে বন্ধ ঘোষিত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্রে গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করতে পারেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রায়ের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানায়, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত সনদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনে করে।

উচ্চ আদালতের রায় ও ইউজিসির মতামতের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ২৮ আগস্ট জারি করা পরিপত্রে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত সনদে নিয়োগপ্রাপ্তদের এমপিওভুক্তির আদেশ দেয়। পরদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ আগস্ট আদেশটি স্থগিত করা হয়।

অন্যদিকে আদালতের রায় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এনটিআরসিএ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের নিয়োগের সুপারিশ করে। এনটিআরসির সুপারিশে বিধি অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক নিয়োগ দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট এমপিও ছাড়ের আদেশ স্থগিত করে আরেকটি আদেশ জারি করলে আইনগতভাবে এমপিওভুক্তির পথ বন্ধ হয়ে যায়। এমপিও ছাড়ের আদেশ স্থগিতের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওই সময়ের সিনিয়র সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চাইবো। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
২০১৮ সালের ৯ নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মতামতে বলা হয়, ‘হাইকোর্ট বিভাগের প্রদত্ত রায়ে যেহেতু বর্ণিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্যুকৃত সনদসমূহকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় নাই এবং উক্ত সনদসমূহ যথাযথ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করা বা না করা তাদের ইচ্ছাধীন মর্মে মন্তব্য করেছেন। সেহেতু প্রত্যাশী মন্ত্রণালয় ইস্যুকৃত উক্ত ২৮/৮/২০১৮ তারিখের পরিপত্র আইনসঙ্গত মর্মে মতামত প্রদান করা যতে পারে।’

আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে আরও বলা হয়, ‘রিট পিটিশনের রায় প্রচারিত হওয়ার পূর্বের সনদসমূহের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাধীন, এবং তা রায়ে অবৈধ মর্মে ঘোষণা করা হয়নি।’

আইন মন্ত্রণালয়ের এই মতামতের পরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বছর ৪ মাসের বেশি সময়েও কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এর ফলে শিক্ষক ও সহকারী গ্রন্থাগারিকদের মধ্যে ব্যক্তি বিশেষে এমপিও দেওয়া হয় গোপনে। কিন্তু যাদের তদবির করার ক্ষমতা নেই তাদের এমপিও দেওয়া হয়নি। তারা বিনা বেতনে এখনও চাকরি করে যাচ্ছেন।

গত বছর ৮ জুলাই সচিবের কাছে পাঠানো সহকারী গ্রন্থাগারিক মোহাম্মদ ছিয়ামুল হকের আবেদনের সঙ্গে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থগিতাদেশের আগে ও পরে দারুল ইহসানের সনদধারীদের এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (বর্তমান সিইসির আপন ছোট ভাই) কে এম নাসির উদ্দিনকে এমপিও দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে নাসির উদ্দিন এমপিও পাওয়ার পর বাংলা ট্রিবিউনকে ২০১৯ সালে জানিয়েছিলেন, ‘আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলাম। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আমি ২০১৮ সালে এমপিওভুক্ত হয়েছি। ’

এছাড়া সিলেটের আরও দুজন শিক্ষককে আগের শিক্ষামন্ত্রীর সময় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৩০ মে সিলেটের রাজা কেসি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল মুহিতকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এমপিওভুক্ত করা হয়।

সহকারী গ্রন্থাগারিক মোহাম্মদ ছিয়ামুল হক বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও ছাড়ের আদেশ স্থগিত করার পর আরও ২৭ জনের এমপিও দেওয়া হয়েছে। এমন একটি তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এছাড়া ২০২০ সালে ঢাকার ফরিদাবাদ হাইস্কুলের সহকারী গ্রন্থাগারিক ও শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ তারাবুনিয়া হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষককে (আইসিটি) এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। -বাংলাট্রিবিউন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •