মোঃ কাউছার ঊদ্দীন শরীফ, ঈদগাঁওঃ

কক্সবাজার সদর উপজেলা ঈদগাঁওতে শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে কয়েক হাজার শিশু।এ শিশুদের অল্প পারিশ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করে নেওয়া যায় বলে মালিকেরাও তাদের নিয়োগ করেন।এতে তাদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ থাকলেও শ্রমে জড়িয়ে পড়ার কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ।

জানা যায়,যে বয়সে শিশু বই-খাতা-কলম নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা কিংবা পেনসিল দিয়ে খাতায় বা দেয়ালে আঁকিবুকি করার কথা, সেই বয়সে তারা বেছে নিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। নানা বাস্তবতায় শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মাধ্যমে জীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। যখন কল্পনার ডানায় ভর করে স্বপ্নের দেশে চলে যাওয়ার কথা, তখন তারা কলকারখানায়, রান্নাঘরে, রাস্তায় হাড়ভাঙা খাটতে খাটতে ক্লান্ত। ঈদগাঁও বাজার, বাস স্টেশন , কলেজ গেইট , বঙ্গিম বাজার, মাছ বাজার , বাঁশঘাটা , ফার্নিচার এর কারখানা, , হোটেল রেস্টুরেন্ট ,মোটরসাইকেল গ্যারেজ,রিক্সার গ্যারেজ,মুদির দোকান, তেলের দোকান, পানের দোকান, ঝুপড়ি, চায়ের দোকান ওষুধের দোকান, ছাপাখানার কারখানা, কম্পিউটারের দোকান, ইসলামপুর ইউনিয়নের শিল্প এলাকায় লবণের মিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রেস্তোরাঁ, পরিবহন গ্যারেজ, ফার্নিচারের কারখানা, পর্যন্ত তাদের কর্মক্ষেত্র। ধরা যাক, বিদ্যালয় বিভিন্ন হলের ক্যান্টিনের কথা, যেখানে কর্মরত আছে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুশ্রমিক। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যখন এই অবস্থা, তখন শিশুশ্রম প্রতিরোধ করা খানিকটা কঠিনই বটে। আবার শহরের বিভিন্ন রুটে চলা গাড়ির চালক/হেল্পার কারা? সেখানেও রয়েছে শিশুশ্রমিক। এটাকে যদি আমরা সেবা হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে সেবা প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ অবধি শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যাই সিংহভাগ।বাঁশঘাটা সড়কে ফার্নিচার এর কারখানার একদল শিশু শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।একারখানাতে শিশুদের দিয়ে চার’ধরনের কাজ করতে দেখা যায়। ফার্নিচারে রং ব্যবহার করা, আগুন দিয়ে মোম তৈরী,ফার্নিচার কারখানা থেকে সুরুমে আনা,এবং ফার্নিচার বিক্রি করা হলে বড় গাড়ীতে লোভ করা। এরা সকাল আট টায় আসে বাসায় ফেরে রাত দশ টায়।স্থানান্তর কাজে নিয়োজিত শিশুদের দেওয়া হয় মাসে এক হাজার থেকে ১২ টাকা।
কারখানার মালিকেরা এসব শিশুদের অল্প পারিশ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ নিয়ে ফার্নিচারে রং ব্যবহার শিশুদের শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছিল ঘাম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সারা দিন কাজ করে ৫০ টাকা পাওয়া যায়। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাদের মা একটি বাটিতে খাবার দিয়ে দেয়। সেই খাবার তারা দুপুরে খায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে এরা শ্রমে জড়িয়ে পরছেন।আবার তাদের মধ্যে অনেকের মা বিভিন্ন বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ থাকলেও অভাবের কারণে তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। কিন্তু কুঁড়ি হয়েই শুকিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি শিশুর জীবন। শ্রম আইন অনুযায়ী, দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুকে কাজে নেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বিভিন্ন কারখানাতে দেখা যায়, উৎপাদন ও কলকারখানার কাজে শিশুর আধিক্য। তথ্যমতে, বর্তমানে ঈদগাঁওতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ২০ হাজারের অধিক। সঙ্গত কারণেই এটি একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে উঠছে দেশের জন্য।
অন্য দিকে অনেক অভিভাবকদের দাবী ঈদগাঁওর বিভিন্ন কলকারখানার মালিকেরা আমাদের শিশু সন্তানদের অর্থ দেখিয়ে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত করে আসছে। এতে প্রশাসন কড়া নজর দিলে আমাদের সন্তানদের পুনরায় বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে লেখাপড়া করানোর সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি। সেই সাথে এসব মালিকেরা শিশু শ্রমিক শ্রমে জাড়াতে না পারে মতো প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফার্নিচার কারখানার মালিক জানান, ‘শিশু শ্রমিকেরাই ভালো। যা মজুরি নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। কামও ভালো করে। আর তাদের তো টাকা দরকার। দুই পক্ষেরই লাভ। লোকসান নাই।ঈদগাঁও স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন,শ্রম আইন আমাদের দেশে পুরোপুরি মানা হয় না।গত কয়েক বছর আগে শ্রম মন্ত্রণালয় ৪৬ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার অনেক কাজই শিশুরা করছে। অথচ আইন অনুসারে ১৪ বছরের নীচে বয়স এমন শিশুরা কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না। এ ছাড়া তাদের পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু এগুলো মানা হয় না। মালিক ও শ্রমসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের কড়া নজরদারির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রতি জোর দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।এবিষয়ে ঈদগাঁও বাজার ফার্নিচার শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি রমিজ উদ্দীন কাজল বলেন,শিশুদের কচি হাত কখনোই হাতুড়ি পেটানোর জন্য নয়, বাসন ধোয়ার জন্য নয় কিংবা ভারি বস্তু মাথায় তোলার জন্য নয়। কিন্তু দারিদ্র্যের বেড়াজাল কাটিয়ে উঠতে অথবা কখনও মৌলিক চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে তারা বিসর্জন দেয় তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আমাদের জাতির জন্য খুবই লজ্জাজনক, আমরা এখনও আমাদের শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি। শিশুর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু লোভী স্বার্থপিপাসু মানুষ এসব শিশুকে অল্প বেতনে কাজে নিয়োগ দেয়।শিশুশ্রম বন্ধে সর্বপ্রথম শিশুর মৌলিক চাহিদা বাস্তবায়ন করতে হবে, দেশের সর্বত্র শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি হাতে নিতে হবে, যাতে স্কুলগামী শিশুর হার বাড়ে, শিশু অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, কেউ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুকে কাজে নিয়োগ দিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কোথায় কোথায় শিশুশ্রম হয়, তা খুঁজে বের করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের একটা হটলাইন থাকা উচিত, যাতে করে কোথাও শিশুশ্রম হলে তা কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জানানো যায় এবং পদক্ষেপ নেয়া যায়। সর্বোপরি, যথাযথ আইন প্রণয়ন এবং আইনের প্রয়োগই পারে শিশুশ্রম প্রতিরোধ করতে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •