ডেস্ক নিউজ:
নির্বাচনী হাওয়া বইতেই চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। সাত দিনের মধ্যেই নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন। এরআগে গত মার্চে পাহাড়তলীতে প্রাণ গেল একজনের। ভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে অস্ত্রের সংঘাত ও প্রাণহানির শঙ্কা বাড়ছে দিন দিন। নিজেদের ক্ষমতা জাহির করে ভোটের মাঠ দখলের জন্য মূলত কাউন্সিলর প্রার্থীরা এসব অস্ত্রের ব্যবহার করছেন। খোদ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সংঘাত এড়াতে এরই মধ্যে বৈধ অস্ত্র জমা নিয়ে অবৈধগুলো উদ্ধারে সাড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বক্তব্য যদিও পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, একনলা, দুইনলা, শর্টগান ও পিস্তলের লাইসেন্স দেয় জেলা প্রশাসন। আর চট্টগ্রামে এসব বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ৪ হাজার ২৭৫টি। তবে অবৈধ অস্ত্রের সংখ্যা কত তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। সিএমপির শীর্ষ এক কর্মকর্তার অবশ্য ধারণা, দুইশতাধিক অবৈধ দেশি-বিদেশি অস্ত্র রয়েছে বণিজ্যিক নগরীতে। মূলত অস্ত্র মামলার সূত্র ধরেই এ হিসাবটা করেছে সিএমপি। তবে সিটি নির্বাচন এলেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে অবৈধ অস্ত্রের আমদানি বাড়ে। সে জন্য প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানোসহ নগরজুড়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।

সিএমপি সূত্র জানায়, গেল ডিসেম্বর মাসে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে ছয়টি। আর জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিনে উদ্ধার হয়েছে দুটি অস্ত্র। এর মধ্যে ডিসেম্বরে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে দুটি বিদেশি ও চারটি দেশি। জানুয়ারি দুটিই দেশী অস্ত্র। একইসাথে এগুলোর বাহককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু ভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে নগরবাসী ও প্রার্থীদের মাঝে।

কেননা এক সপ্তাহের ব্যবধানেই বাকলিয়ায় ছুরিকাঘাতে এক যুবক এবং পাঠানটুলিতে গুলি করে আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি ৮ জানুয়ারির পর থেকে অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে নগরের অন্তত ১০ স্থানে। শুধু অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বা প্রদর্শন হচ্ছে তা নয়, বৈধ অস্ত্র দিয়েও হানাহানির ঘটনা ঘটছে, অতীতেও ঘটেছে। সামনেও সেটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে বৈধ অস্ত্র জমার কোনো নির্দেশনা এখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি হয়নি। তাই নির্বাচনী সহিংসতায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করা হচ্ছে, না-কি বৈধ অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে; সে ব্যাপারেও অন্ধকারে পুলিশ। গোলপাহাড় মোড়ে গত ২ ডিসেম্বর গভীর রাতে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন আলমগীর আলম নামের এক ঝুট ব্যবসায়ী। পরে পুলিশ তদন্ত করে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের তথ্যটি নিশ্চিত হয়।

এবার চসিক নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর দিন গত ৮ জানুয়ারি চকবাজার ওয়ার্ডে এবং তারও আগে শুলকবহর ও মোহরা এলাকায় কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে রক্তাক্ত জখমের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘাতেও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।

ডবলমুরিং এলাকায় গত মঙ্গলবার রাতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের সমর্থকদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় সদ্য সাবেক কাউন্সিলর আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের লোকজন। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বাবুল নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মী। তবে বাবুল হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস্থা নগর গোয়েন্দা পুলিশ (পশ্চিম)।

অস্ত্রের এমন ঝনঝনানিতে উদ্বেগ-আতঙ্কে চট্টগ্রাম নগরের ভোটাররা। এ কারণে ভোটের আগেই সব বৈধ অস্ত্র জমা নিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। শুক্রবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে নগরের ১৬নং চকবাজার ওয়ার্ডে ধানের শীষের পক্ষে গণসংযোগকালে তিনি এ দাবি করেন।

বিএনপির এ মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘প্রতিটি নিবার্চনের আগে নিয়ম অনুযায়ী সব বৈধ অস্ত্র জমা নিয়ে অবৈধগুলো উদ্ধারে প্রশাসন তৎপর থাকে। কিন্তু চসিক নিবার্চনে প্রশাসন এখনো পর্যন্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান কিংবা বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া্র কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। ফলে প্রতিদিন ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি, হানাহানি শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঠানটুলি ও বাকলিয়াতে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি ও ছুরিকাঘাতে দুজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নগরীর হালিশহর রামপুর ওয়ার্ডের বড়পুকুর পাড়ে ধানের শীষ প্রতীকের পোস্টার লাগাতে গেলে যুবলীগকর্মীরা হামলা চালায়।’

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র সাধারণ ভোটার ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে পারে। নিবার্চনের আগে আরও হামলা এবং হতাহতের ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় সাধারণ ভোটাররা শঙ্কিত। এসব খুনাখুনি বন্ধে ও সাধারণ ভোটার এবং বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের জানমালের নিরাপত্তায় অবিলম্বে লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা নিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।’

জানতে চাইলে চসিক নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পুলিশ প্রশাসনের। তবে বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সময় হলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।’

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘বৈধ বা অবৈধ অস্ত্র নিয়ে কেউ বেআইনী কাজ করতে পারবে না। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা বিভাগও কাজ করছে। পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত চেকপোস্ট, ব্লকরেইড করা হচ্ছে। প্রত্যেক সন্দেহভাজন গাড়ি ও ব্যক্তিকে তল্লাশি করা হচ্ছে। আমি নিজেও মাঠে থেকে তদারকি করছি। যে কোনো মূল্যে নির্বাচনী সহিংসতা দমনে সিএমপি একেবারেই জিরো টলারেন্স নীতিতে আছে।’
-সিভয়েস।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •