আলমগীর মানিক, রাঙামাটি
রাঙামাটি সড়ক বিভাগ কর্তৃক জেলার ঘাগড়া-বড়ইছড়ি সড়কে ভাঙ্গন ঠেকাতে জরুরী ভিত্তিতে সড়ক মেরামতের নামে কোটি টাকা নয়-ছয়ের অভিযোগে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি আমলে নিয়ে সরেজমিনে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক এর এনফোর্সমেন্ট টিম। বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাঙামাটিস্থ দুদকের সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক জিএম আহসানুল কবির এর নেতৃত্বে এই তদন্তাভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় দুদকের এএসআই নবিউল ইসলাম, রাঙামাটি সড়ক বিভাগের সড়ক উপ-বিভাগ-১ এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মসউদর রহমান, উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আরিফুর রহমান ও শেখ ফতেহ এলাহী ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মি. মোহাম্মদ আমিনুল হক (প্রাঃ) লিমিটেড এর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
দূদক সূত্র জানিয়েছে সম্প্রতি “রাঙামাটিতে সড়ক বিভাগের সোয়া কোটি টাকার কাজে বছর না যেতেই ধ্বস” শিরোনামে স্থানীয়-আঞ্চলিক ও জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদটি দূদক প্রধান কার্যালয়ের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট্যদের সাথে কথা বলে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য দুদকের রাঙামাটি কার্যালয়স্থ এনফোর্সমেন্ট টিমকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিস্ট্য প্রতিবেদক রাঙামাটি সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর মানিককে সাথে নিয়ে বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উক্ত কাজগুলো বাস্তবায়নাধীন ঘটনাস্থলগলো সরেজমিনের পরিদর্শন করা হয়। এসময় প্রকাশিত খবরের সত্যতাও পেয়েছে এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যগণ। দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিন প্রত্যক্ষকরনের পাশাপাশি আমরা উক্ত কাজগুলোর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে সিডিউল ও ইস্টিমিট শিট এরকপি দূদক কার্যালয়ে প্রেরণের জন্য বলে দেওয়া হয়েছে। সবকিছু দেখে তারপর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রিপোর্ট দিবে রাঙামাটি দুদক কর্তৃপক্ষ। উক্ত রিপোর্ট এরআলো কেন্দ্র থেকে নির্দেশনানুসারে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত: রাঙামাটির ঘাগড়া/চন্দ্রঘোনা/বান্দরবান সড়কে গেল বর্ষা মৌসুমের আগে জরুরী সড়ক মেরামতের নামে সোয়া কোটি টাকার মেইনটেনেজ কাজ করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই পুরো টাকাগুলো জলে যাওয়ার অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। এই সড়কের অন্তত ৪টি স্পটে সড়ক ধ্বসরোধে অস্থায়ী ধারক দেওয়াল নির্মাণের এই কাজে লোহার পাইপ ব্যবহার করা হলেও সনাতন পদ্ধতির গাছ দ্বারা বল্লি প্যালা সাইডিংয়ের চেয়েও এই কাজ নিন্মমানের হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। এলাকাবাসীর মতে জরুরী মেরামতের নামে এই কোটি টাকার পুরোটাই পকেটস্থ করেছে সংশ্লিষ্ট্য ঠিকাদার।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ২০১৯-২০২০ অর্থসালে রাঙামাটি সড়ক বিভাগের উদ্যোগে ইজিপি টেন্ডারের মাধ্যমে রাঙামাটির ঘাগড়া-চন্দ্রঘোনা-বাঙ্গালহালিয়া-বান্দরবান সড়কে কয়েকটি স্থানে এমএস পাইপ প্যালাসাইডিং, বেম্বো প্যালাসাইডিং, আর্থ ফিলিং, সেন্ডব্যাগ লায়িং কাজের লক্ষ্যে ইজিপি আইডি নং-৪০২৭৯৪, ৪০২৮১০, ৪৩৬৩৭০, ৩৯২৪৫১ এই চারটি কাজের বিপরীতে ২৭০৮৫৫২.৩৯, ৬০১০৫৫৯.৯১, ১১৫৯৭১৬.১৮ ও ৩৭২৯১১৬.৭৩ টাকাসহ সর্বমোট প্রায় এক কোটি ৩৬ লক্ষ টাকার প্রদান করা হয় ঢাকার ঠিকানা ব্যবহারকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মি. মোহাম্মদ আমিনুল হক (প্রাঃ) লিমিটেডকে। এই প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট্য ঠিকাদারের লোকজন গত কয়েকমাস আগে উক্ত কাজগুলো সম্পন্ন করেছে বলে সরেজমিনে ঘাগড়া-চন্দ্রঘোনা সড়কে গেলে সেখানকার বাসিন্দাগণ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
কাপ্তাইয়ের কুকিমারা, মুরালিপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাগণ জানিয়েছেন, লোহার ৬ইঞ্চি মোটা পাইপগুলো কোনো রকম দাঁড় করিয়ে ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ কাজ হয়ে গেছে বলে চলে যায়। বর্ষামৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাত না হওয়ার পরেও লোহার পাইপগুলো ধ্বসে পড়ে পড়ে। এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুকিমারা চেকপোষ্টের সামনের সড়কেই নিন্মমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা ড্রেনসহ সড়কের উপরের অংশে বেশ লম্বা ফাটল ধরেছে। মুরালী পাড়া এলাকায় স্থাপনের কিছুদিনের মধ্যেই হেলে পড়েছে এমএস পাইপ প্যালাসাইডিং।
সম্প্রতি সরেজমিনে এই স্পটগুলো পরিদর্শনে জনগণের অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।
এদিকে রাঙামাটির সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই স্থায়ী টেকসইয়ে এই একই সড়কগুলোতে আবারো কয়েক কোটি টাকা বরাদ্ধ দিয়েছে সরকার। সেকাজগুলো পর্যায়ক্রমে শুরু করা হবে। রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহে আরেফিন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছেন, আমাদের কাছে উক্ত কাজগুলো নিয়ে অভিযোগ এসেছে। তিনি জানান, এখনো পর্যন্ত ঠিকাদারের জামানত দেওয়া হয়নি। শীঘ্রই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং যেসব কাজ ঠিকমতো হয়নি সেগুলো আবার করিয়ে নেওয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •