cbn  

সালাহ্ উদ্দিন জাসেদ :

কক্সবাজার শহরে কিছুতেই বন্ধ হচ্ছেনা শিশুশ্রম। দিন দিন অব্যাহতভাবে শিশুশ্রম বেড়েই চলছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আইনের তোয়াক্কা না করে শহরের খাবার হোটেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি, গাড়ির গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ, বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ সব জায়গায়ই অগণিত শিশু কাজ করছে।

বিশেষ করে পর্যটনের শহর কক্সবাজারের অলি-গলিতে থাকা ভালো মানের খাবার হোটেল থেকে শুরু করে সব হোটেলে দেখা মিলে শিশুদের দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বেআইনিভাবে কাজ আদায় করে নেওয়ার দৃশ্য।

শিশুশ্রম এক ধরনের শোষণের নাম। হোটেল মালিকরা শিশুদের দিয়ে অমানবিক কাজ করাচ্ছে মূলত কম পুঁজিতে অধিক শ্রম এবং মুনাফা লাভ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো মজুরি ছাড়াই পেটেভাতে অথবা নামমাত্র মজুরি নিয়ে শিশুশ্রমীকদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

এদেরই একজন, সুমন ( ছদ্মনাম) সাথে কথা বলে জানা যায়, সুমন মাসিক ৩,০০০ টাকা বেতনে কাজ করে কক্সবাজার শহরের এক মিষ্টির দোকানে। মা ও ৬ বছর বয়সী ছোট ভাইকে নিয়ে তার জগৎ সংসার। দু’বছর আগে ৩য় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তাকে।

আরেকজন ১২ বছরের শিশু, এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সে ১ সপ্তাহ হচ্ছে হোটেলের কাজে যোগ দিয়েছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাকে কাজ করতে হয়। হোটেলে আগতদের খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি থালাবাসন পরিষ্কারের কাজটিও তাকে করতে হয়। বারবার পানির সংস্পর্শে আসায় তার দু’হাতের আঙুলের ফাঁকে সাদা ফাঙ্গাস জন্মেছে অল্প সময়ে। দিনে বা মাসে কত টাকা বেতন পাই জানতে চাইলে সে জানায়, আমাকে কত টাকা দিবে আমি জানিনা। আমাকে মালিক বলছে আগে কাজ শিখতে।

এমন অর্ধশতাধিত ছোট বড় হোটেলে কাজে থাকা শিশুদের সাথে আলাপচারিতায় বেরিয়ে আসে, শিশুরা শ্রম দিতে আসছে দারিদ্র্যের কষাঘাতে, খাদ্যের অভাবে বা জোর-জবরদস্তির মুখে বাধ্য হয়ে। সে সুযোগে মালিকরা অসহায় শিশুদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে স্বল্প বেতনে বা পেটেভাতে।

বিষয়টি নিয়ে একাধিক পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, তাদের শিশুদের কাজে পাঠানোর প্রধান কারণ হচ্ছে অসচ্ছলতা ও অভাব অনটনে সংসার পরিচালনা।

শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ শ্রম আইনে বলা হয়েছে, কোন পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোরকে নিয়োগ করা যাবেনা বা কাজ করতে দেয়া যাবেনা। যদি শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে তাঁকে অর্থদণ্ড করা হবে। শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইন থাকলেও তা বন্ধ করা যাচ্ছেনা অসাধু মালিকদের কারণে।

যদিও হোটেল মালিকদের দাবি, অভাবী পরিবারের অনুরোধেই শিশুদের চাকরি দিতে হয়।

কক্সবাজারে শিশুশ্রম বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছেন কক্সবাজারের আইনজীবী আজিজুল হক। শিশুশ্রম বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী বলেন, শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য সরকার পৃথক শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে পালন করতে হবে ইতিবাচক ভূমিকা। তবেই দেশের শিশুরা ভবিষ্যতে মানবসম্পদ তথা জাতির প্রকৃত কর্ণধার হয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু শিশুশ্রম বন্ধে এখানে কেউ এগিয়ে আসছেনা। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি কমরেড গিয়াস উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার শহরে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশুশ্রম। শিশুদের ব্যবহার করে মুনাফা আদায় করে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। শিশুশ্রম নিরুৎসাহিত করতে সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালীদের শিশুদের কল্যাণকর ব্যবস্থপনা মাধ্যমে শিশুশ্রম ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে । দেশের প্রচলিত আইনের ধারায় শিশুশ্রম বন্ধে কক্সবাজারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

সাংবাদিক মিজানুর রশিদ মিজান বলেন, শিশুরা মিডিয়ার ভোক্তা কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সব সময় তাদের সবসময় ভূমিকা থাকেনা। মূলধারার মিডিয়ায় শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, এতে করে মিডিয়াতে তাদের কথা বলার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি ন্যায়সঙ্গত সামাজিক উন্নয়নে শিশুদের খুঁটি শক্তিশালী হবে বলে মনে করি।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এথিন রাখাইন প্রতিবেদককে জানান, শিশুশ্রম খুবই অমানবিক একটা কাজ। যে সময় শিশুরা থাকার কথা তাদের মায়ের খোলে, অভাব- অনটনের কারণে দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে তাদের। শিশুদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে যারা মোটা অংকের মুনাফা করতেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ যে শিশু নিজের পরিবার চালানোর জন্য কাজ করছে, তাদের সহযোগীতা করতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকে। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শিশুদের জন্য কাজ করলে শিশুশ্রম অনেকটা বন্ধ হবে বলে মনে করি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে এডিএম (কক্সবাজার) শাহাজান আলী জানান, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশিদ মহোদয়ের সাথে কথা বলে জানাব।

প্রকৃতপক্ষে, শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সব শ্রেণীর শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যারা শিশুদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে মুনাফা করছে সে সমস্থ শিশুশ্রমে উৎসাহ প্রদানকারীদের আইনের আওতায় এনে শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

(সংগত কারণে শিশু শ্রমিকের ছদ্মনাম ব্যবহার ও মুখ ঢেকে দেয়া হল। চাকুরিটা চলে গেলে হয়তো তাকে আরো বেশি অসহায় ও বিপদগামী বানাবে।- সিবিএন)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •