এহসান আল কুতুবীঃ
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন। জেলাবাসীর সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে সরকারের প্রয়োজনে চাকরির সুবাদে কক্সবাজারে আসা তাঁর। একইসাথে সময়ের সাথে নিয়মানুযায়ী বদলি। একজন অভিভাবক হিসেবে আমার দেখা সময়গুলোর বয়স মাত্র এক বছর। গত ডিসেম্বরে আমার অফিসের নির্দেশ ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন কারনে প্রিয় কর্মস্থল সিপ্লাস টিভির হেড অফিস থেকে কক্সবাজার জেলার দায়িত্ব নিয়ে আসা। ক্ষণে ক্ষণে সংবাদের প্রয়োজনে সবার সাথে পরিচয়টা। জেলার অভিভাবক হিসেবে বেশ আর কম সব নিউজের পরিপূর্ণতা দিতে হয় জেলা প্রশাসকের বক্তব্য বা টেলিভিশনের ভাষায় সটের মাধ্যমে। প্রয়োজনের তাগিদে যখনি ফোন দিয়েছি, হয় রিসিভ করে কথা বলেছেন না হয় ব্যস্থ থাকলে পরে কলব্যাক করেছেন। যদিও তার বেশিরভাগ হয়েছে করোনাকালীন সময়ে। আবার সরাসরি গিয়ে বক্তব্য নিতে কখনো ব্যস্ততা দেখিয়ে অসহযোগিতা করেননি। এমনও সময় গেছে, আমরা টেলিভিশনের সাথে সম্পৃক্তদের ভিডিও বক্তব্য পাঠাতে হয় অফিসে প্রায়ই। সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজেই বক্তব্য রেকর্ড করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে সহযোগিতা করেছেন। একমাত্র দায়িত্ববোধ থেকেই আমাদের প্রতি তাঁর সহযোগিতা।

একজন জেলা প্রশাসককে জেলার সব মানুষের সাথে সময় দিতে হয়। দিন বা রাত তাদের কাছে সব সমান। সবসময় সজাগ থাকতে হয় কোথায় কখন কি হচ্ছে বা হবে। এতো ব্যস্ততার ফাঁকেও সহযোগিতা করেছেন, কখনো কখনো সুযোগ থাকলে একসাথে কফি পান করিয়ে আপ্যায়নও করেছেন।

২০২০ সালের মার্চে শুরু হয় করোনার প্রথম ধাপ। চারিদিকে আতঙ্ক, ভয়, হাহাকার অবস্থা। মাত্র একটা করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর চারিদিকে মানুষের মাঝে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন খবর আসতে থাকে সারাদেশে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যু হচ্ছে। এমন সময়ে প্রথমবারের মতো মানুষকে সচেতন করতে নেমে পড়েন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ( শুধুমাত্র দায়িত্ববোধ থেকে)। একের পর এক জুম মিটিং। কিভাবে মানুষকে ঘরে রাখা যায়, সচেতন করা যায়, আতঙ্কমুক্ত করা যায় এবং সর্বোপরি করোনা সংক্রমণ রোধ ও মানুষকে বাঁচানো যায়। তারপর শুরু হয় ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের জন্য খোঁজ নেওয়া, খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ। এই লড়াইয়ে সঙ্গী ছিলেন সাবেক পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন টিম। জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি জেলা পুলিশের ভিন্ন উদ্যোগও ছিলো অনন্য। মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে প্রশাসনের অনেকে অসুস্থ হয়েছিলেন। প্রশাসনের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগের সাথে গঠন করা হয় করোনা সহায়তা তহবিল। যেখানে সব শ্রেণী পেশার মানুষের সহযোগিতায় এলাকায় এলাকায় খবর নিয়ে পৌঁছে দেওয়া হয় খাদ্য সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সবখানে ছিলো জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা। পরে লকডাউন ঘোষনা হয়। এই লকডাউন বাস্তবায়নে জেলা, উপজেলা ও প্রত্যেকটা পৌর শহরে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের যে কঠোর অবস্থান, সবটুকুই বাস্তবায়নে স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতা কখনো ভুলবার নয়। বিশেষ করে রামুর ব্যাঙ্ঢাবা গ্রামে গহীন পাহাড়ে হেঁটে হেঁটে গিয়ে ওই এলাকার মানুষের জন্য ত্রাণ সামগ্রী ও চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে যাওয়ার মহান উদ্যোগটি কখনো কেউ চিন্তাও করেনি। একমাত্র জেলা প্রশাসক মহোদয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তাঁর কাজের কথা লিখতে গেলে গত তিনবছরের ইতিহাস কক্সবাজারবাসীর জন্য অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার একটি মাইলফলক। সাধ্যের মধ্যে দায়িত্ববোধ থেকে তিনি চেষ্টা করেছেন সবকিছুতে পরিবর্তন আনতে ও দায়িত্বকে যথাযথ পালন করতে। বাস্তবেই তার জানান দিয়েছেন।

একজন জেলা প্রশাসক হিসেবে তিনি কক্সবাজারবাসীর যা জন্য করেছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা নয় শুধু। তিনি যে একজন যোগ্য অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বের খাতিরে সবক্ষেত্রে একটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগিয়েছেন তার জন্য শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। করোনায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসিও, এইসডিও, অক্সিজেনের ব্যবস্থা, বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, আইসোলেশন সেন্টার ও স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে এসে একজন জেলা প্রশাসক কামাল হোসেনের হাত ধরে আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে শিশুপার্ক, করোনা হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতাল, অটিস্টিক শিশুদের জন্য অরুণোদয় স্কুল, ডিসি কলেজ ও সর্বোপরি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আটকে থাকা পদোন্নতিসহ সবকিছুর আমূল-পরিবর্তন।

মানবিক বলেই তাঁর রয়েছে ক্যান্সার আক্রান্ত সায়ানের মতো দূরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে আসা কত নারী পুরুষের পাশে দাঁড়ানো গল্প। কুকুরের সাথে রাত্রি যাপন করা পথশিশু রিদুয়ানকে বুকে টেনে নিয়ে নিজ ঘরে স্থান করে দিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার গল্পটিও মহানুভবতার বড় পরিচয়।

একজন জেলা প্রশাসক হিসেবে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে থাকতে পারাটা বড় গুণ। সব প্রশাসক হয়তো এমন নাও হতে পারে। তার কাছে সব মানুষের জায়গা ছিলো। সবার কথা শোনা, সমাধান দেওয়া, প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে যাওয়া। দিনরাত এতো ব্যস্ততার মাঝেও সাধারণের সাথে মিশে সবার মনে স্থান করে নেওয়াটা বড় ও মহৎ মনের পরিচয়। যার অনন্য জেলা প্রশাসক মহোদয়।

মহোদয়, আপনি দায়িত্ববোধ থেকে যেসব কর্মযজ্ঞ কক্সবাজারে করেছেন সবগুলোই একেকটি আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে চিরকাল। আপনি কক্সবাজার থেকে চলে গেলেও আপনার কর্মগুলোর মাঝে ও কক্সবাজারবাসীর মনের মনিকোঠায় আপনি শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ জায়গা থেকে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আপনার আগামী সুন্দর ও উজ্জ্বল হোক। আপনার জন্য সবসময় দোয়া ও শুভকামনা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •