ইশরাত মোঃ শাহ জাহান

গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত। সব ঋতুতেই চলছে মহেশখালীর গোরকঘাটা-জনতা বাজার প্রধান সড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ। উন্নয়নকাজে বছরব্যাপী চলা এ খোঁড়াখুড়িতে একদিকে যেমন সড়কের ত্রাহি অবস্থা। অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে ধুলার রাজত্ব। মহেশখালীর সব জায়গাতে ধুলায় ধূসর প্রান্তর। ঠিক যেন বায়ূদূষণের আনুষ্ঠানিক আয়োজন! মহেশখালীর এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে উন্নয়ন বা সংস্কার কাজ চলছে না। জনতা বাজার-গোরকঘাটা সড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু খোঁড়া মাটি পড়ে আছে রাস্তার ধারে। এতে যানবাহন চলাচল কিংবা পথচারীর হাঁটাহাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে মাটি। শুষ্কতায় সেসব মাটি বাতাসে মিশে ধুলা সৃষ্টি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। আবার কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি সেরেছে। কিন্তু রাস্তায় দেওয়া হয়নি কার্পেটের (পিচ) ঢালায়। এতেও সৃষ্টি হচ্ছে ধূলার রাজত্ব। ফলে ঘটছে বায়ূদূষণের মাধ্যমে পরিবেশ ও মানবজীবনের চরম বিপর্যয়।
কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী এসব উন্নয়ন কাজে ধুলা সৃষ্টি যেন না হয় সেটি নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে ঠিকাদারদের প্রতি। অথচ তাদের খামখেয়ালিপনায় প্রতিনিয়ত চরম বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে জনজীবন। আবার এসব ঠিকাদারদের যারা নজরদারি করবে তারাও নির্বিকার। এতে ধুলোয় ধূসর প্রতিনিয়ত নাকাল হচ্ছেন মহেশখালীবাসী।
সেই সঙ্গে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, জ্বর কাশি শর্দি সহ নানান রোগাক্রান্তের সংখ্যা। সচেতন মহলের দাবি, সঠিক নজরদারি আর ঠিকাদারদের অবহেলায় বায়ূ দূষণের জন্য দায়ী। যার ফল ভোগ করছে মহেশখালীবাসী। সরকারের কঠোর নজরদারি ছাড়া এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন তারা। তাই মহেশখালীবাসীর সু-স্বাস্থ্যের জন্য হলেও এ বিষয়ে সরকারকে নজর দেওয়ার আহ্বান তাদের।
বায়ূদূষণরোধে নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পরিবেশ অধিদফতরের নির্দেশনা হলো সড়ক সংস্করণ, সম্প্রসারণ কিংবা যেকোনো উন্নয়নকাজ পরিচালনায় ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রেখে পরিবহন ও মজুদ করা। যত্রতত্র ফেলে না রাখা এবং ধুলিদূষণ নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত বেষ্টনী ব্যবহার করা।
সেই সঙ্গে রাস্তার পাশে ড্রেন বা নর্দমা থেকে ময়লা বা বর্জ্য অপসারণ করে তা ফেলে না রেখে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া। রাস্তার নানাবিধ কাজ যথাসম্ভব রাতে করা ও নির্ধারিত স্থানটি যতদূত সম্ভব ঢেকে রাখা এবং দৈনিক একাধিকবার পানি ছিটানো।
একই সঙ্গে ধুলো নিয়ন্ত্রণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাস্তা কার্পেটিং করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা। ধুলা যাতে না ওড়ে সে জন্য প্রয়োজনীয ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এসব নির্দেশনা প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। আর এসব নির্দেশনা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কিনা তার নজরদারির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এলাকার স্হানীয় প্রশাসনের।
অথচ সরেজমিনে মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের মোহরা কাটা,ধলঘাট পাড়া, পানির ছড়া, বড় মহেশখালীর শুকরিয়া পাড়া, বড় ডেইল, রাস্তার মাথা, মাহারা পাড়া, নতুন বাজার, মধুয়ার ডেইল, পৌরসভার পুটিবিলা, পাল পাড়া সহ আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কারকাজে কোথাও দেখা মেলেনি পরিবেশ দূষণ তথা ধুলোকণা সৃষ্টিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। এসব এলাকার কোথাও রাস্তা খুোঁড়াখুঁড়ি পর উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সড়কটি খোঁড়ার আগে যেমন কার্পেটিং ঢালায় ছিল। তেমনটি আর করা হয়নি। আধাকাঁচা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোথাও মানা হচ্ছে না ধুলা দূষণরোধের নির্দেশনা।
মহেশখালীতে দীর্ঘ একবছর ধরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলছে বলে জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুল শিক্ষিক বলেন, ‘একবছরের বেশি সময় ধরে চলছে মহেশখালীর প্রধান সড়কের কাজ। কিন্তু কাজ কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। এমনকি যারা কাজ করছে তারাও জানে না। কিন্তু রাস্তা কাটার সময় যেসব মাটি তুলেছিল সেগুলো এখন ধুলা হয়ে বাতাসে ছড়াচ্ছে। কারণ যখন মাটি কেটেছিল, তখন ছিল বর্ষা। তখন মাটি পানিতে ভেজা থাকায় সমস্যা হয় নি। কিন্তু এখন যা অবস্থা বলার মতো নয়।’
একই কথা বললেন সংবাদকর্মী নুর চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গত এক বছর ধরেই চলছে উন্নয়ন কাজ। তিনমাস কাটে। ছয় মাস কাজ বন্ধ থাকে অবস্থা। মোট কথা কবে যে কাটাকাটির কাজ বন্ধ হবে তা জানতে পারি না আমরা। কিন্তু আগে তো একদিন বৃষ্টি হলে তিনদিনও মাটি থেকে ধুলা উড়তো না। এখন তো শীতকাল। গতকয়েকদিন ধরে ধুলার পরিমাণ বেড়েছে। এমনকি একটা শার্ট একদিনের বেশি পড়া যায় না। ধুলায় ময়লা হয়ে যায়। তার মধ্যে বৈশ্বিক মহামারী করোনা। এখন কি মানুষ ধুলোবালি থেকে বাঁচবে, নাকি করোনা থেকে?’
তবে এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বলছে ভিন্ন কথা, ধুলার দূষণ প্রতিরোধে প্রতিনিয়ত পানি ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন কাজগুলোর মনিটরিং করছে তারা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সাপ্তাহে সর্বোচ্চ দু’বার পানি ছিটানো হচ্ছে।
একজন সিএনজি ড্রাইভার আক্ষেপ করে বলেন ‘সবসময় রাস্তায় থাকি, প্রতিদিন গোরকঘাটা-জনতা বাজার সড়কে ড্রাইভিং করতেছি। কিন্তু সাপ্তাহে দু’একবার ছাড়া পানি ছিটানোর গাড়ি দেখি নি।’
একই কথা বললেন, বড় মহেশখালী নতুন বাজারের ব্যবসায়ী মমতাজ। তিনি বলেন, পানি ছিটানোর কথা আপনার থেকেই শুনলাম। আমি তো সকালে দোকান খুলি। কই কখনও তো দেখলাম না। আর পানি ছিটালে কি ধূলাবালি থাকতো? দোকানের মালপত্র সকালে মুছলে দুপুর হতে হতে আবারও ধুলার স্তর জমে!
মহেশখালীবাসীর নাক-মুখ ঢেকে চলতে হলেও কর্তৃপক্ষের মুখ তাতে কতটা মলিন? বায়ু দূষণের জন্য সুনির্দিষ্ট করে বা আলাদা করে কোনো আইন নেই। তবে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় বাতাস যেহেতু পরিবেশের অংশ কাজেই পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে বাতাস দূষণ নিয়ন্ত্রণটা পরিবেশ বিভাগেরই দায়িত্ব।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে বায়ু দূষণ যেসব ক্ষেত্রে হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম কারণ বর্তমান মহেশখালীর গোরকঘাটা-জনতা বাজার প্রধান সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ। সচেতন মহলের দাবি কোনো নির্মাণ কিংবা রাস্তা সংস্কার কাজে যদি ধূলা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া। যদি নিয়মিত ধুলা নিয়ন্ত্রণে যেখানে নির্মাণ হচ্ছে, রাস্তা কাটা হচ্ছে সেসব জায়গায় বিশেষ তদারকি করে তাহলে মহেশখালীর বায়ু দূষণকে একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা যায়।
ধূলো দূষণ মূলত বায়ু দূষণেরই অংশ। সামগ্রিকভাবে বায়ু দূষণ শীতকালে বাড়ে। আর বর্ষাকালে কমে। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে চারপাশ ভেজা থাকে সে কারণে দূষণ কম হয়। আর শীতকালে শুষ্ক থাকার কারণে ধুলা ছড়িয়ে যায়। শীতকালে কাজের পরিমাণও বেশি হয় এবং ধুলাও বাতাসে বেশি ভাসে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির আগে যদি পানি দিয়ে ভিজিয়ে নেয়া হয় তাহলে ধুলা এত বেশি পরিমাণে ছড়ায় না। এছাড়াও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করার পর দ্রুত মাটি-বালু না সরানো, রাস্তা পরিষ্কার না করা, ময়লা-আবর্জনা রাস্তায় ফেলা, ইত্যাদি নানা কাজ করার ক্ষেত্রে নিয়ম না মেনে করার ফলে দূষণ ছড়াচ্ছে। বর্ষাকালে এ কাজগুলো করলে ধুলা ছড়াতো না। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির ফলে কাদা জমে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। তাই এ জাতীয় কাজের জন্য শুষ্ক মৌসুমই উত্তম সময়। কিন্তু নিয়ম মেনে কাজগুলো করলে দূষণ ছড়াবে না।
অনেকের সর্দি-কাশি লেগেই থাকছে, নানা ধরনের রোগ ছড়াচ্ছে। ধুলার সঙ্গে নানা ধরনের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্যের সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে। বয়স্ক এবং শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ ধূলি দূষণ থেকে।
সর্বোপরি মহেশখালীর সচেতন মহলের দাবি চলমান মহেশখালীর প্রধান সড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজে প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও পানি ছিটানো। তাহলে মহেশখালীবাসী কিছুটা হলেও এই ধুলোময় জীবন থেকে রক্ষা পাবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •