এম.এ আজিজ রাসেল :

পর্যটন শহরের সড়কের উপরেই গড়ে উঠেছে ১৫টি অবৈধ সিএনজি স্টেশন। ক্ষমতাশীল দলের কতিপয় পাতি নেতা নিয়ন্ত্রণ করেন ওইসব অবৈধ সিএনজি স্টেশন। প্রতিদিন স্টেশনগুলো থেকে সাড়ে ৩ হাজার সিএনজি গাড়ি ছাড়া হয়। যার অধিকাংশ লাইসেন্সবিহীন। প্রধান সড়কসহ অলিগলির যানজটের নেপথ্যে এসব সিএনজি। এছাড়া আনাড়ি সিএনজি চালকদের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট—বড় নানা দুর্ঘটনা।
অবৈধ সিএনজি স্টেশন গুলোকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এক প্রকার মৌখিক বৈধতা দিয়েছে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশ ও জেলা অটোরিক্সা—সিএনজি—টেম্পু শ্রমিক (১৪৯১) ইউনিয়ন। এতে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। অভিযোগ রয়েছে লাইসেন্সবিহীন একটি সিএনজি থেকে প্রতি মাসে টোকেন দিয়ে প্রতি মাসে ২—৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশ। শুধু এসব সিএনজি থেকে ট্রাফিক পুলিশের আয় হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এছাড়া কক্সবাজার জেলা অটোরিক্সা—সিএনজি—টেম্পু শ্রমিক (১৪৯১) ইউনিয়নের নামে প্রতিমাসে প্রায় একই পরিমাণ টাকা আদায় করা হয় সিএনজিগুলো থেকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাস টার্মিনাল থেকে কলাতলী পর্যন্ত অঘোষিতভাবে ১৫টি অবৈধ সিএনজি স্টেশন গড়ে উঠেছে। কক্সবাজার পৌরসভা গেইটের পাশে প্রধান সড়ক লাগোয়া করিমের নিয়ন্ত্রণে চলছে মাহিন্দ্রার স্টেশন। এখান থেকে চলে কক্সবাজার—বাসটার্মিনাল পর্যন্ত ৩০টি মাহিন্দ্রা। এটি নিয়ন্ত্রণ করেন পৌরসভার কর্মচারি কবির ও একজন ভ্রাম্যমান ট্রাফিক। তারা এখানে দাঁড়ানো প্রতি মাহিন্দ্রা থেকে দৈনিক ৩০—৫০ টাকা তোলেন।
লালদিঘি উত্তর পাড় এস,আলম কাউন্টারের সামনে থেকে ১৫০টি ছাড়া হয় টেকনাফ শাপলাপুরগামী সিএনজি। এখান থেকে জলিল নামে এক ব্যক্তি ৩০ টাকা ও পৌরসভার নামে ১৫ টাকা সিএনজি প্রতি নেয়া হয়। সিএনজি চালক জহিরুল ইসলাম জানান, যাত্রী বেশি নিলে ২০০ টাকা পর্যন্ত চালকদের কাছ থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেয়া হয়।
শহরের সবচেয়ে বড় অবৈধ সিএনজি স্টেশন ভোলা বাবুর পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন। এখানে প্রায় ৩০০টি সিএনজি কোটবাজার, মরিচ্যা ও উখিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এটি নিয়ন্ত্রণ করেন প্রভাবশালী এক নেতা। তার নিয়োজিত জলিল নামে এক ব্যক্তি প্রতিদিন সিএনজি প্রতি ৩০ টাকা উত্তোলন করেন। স্টেশনটি কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে স্থানান্তর করা হলেও পুনরায় ওই নেতা অধিকাংশ সিএনজি চালকদের নিয়ে আসেন।
কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের পূর্ব পার্শ্বে একই রুটের অবৈধ সিএনজি স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় এক কাউন্সিলর এর ভাই ও তার সহযোগী কবির। এখান থেকেও ৩০ টাকা করে সিএনজি প্রতি নেয়া হয়। এছাড়া হাসপাতাল সড়কের সী—সাইড হাসপাতাল ও শেভরণের সামনের সড়কে বসা সিএনজি স্টেশনও তারা নিয়ন্ত্রণ করেন।
শহরের বড় অভিশাপ বাজারঘাটার অবৈধ সিএনজি স্টেশন। বাজারঘাটা পূর্ব থেকে পশ্চিম পার্শ্ব পর্যন্ত স্টেশনটি বিস্তৃত। বাংলাবাজার, খরুলিয়া ও রামুর প্রায় ৫০০টি সিএনজি এখান থেকে ছাড়া হয়। রাশেদুল হক নামে এক ব্যক্তি এখানকার সিএনজি থেকে টোকেন দিয়ে ১০ টাকা করে নেয়।
শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কের বড় মাথা ব্যথা বড়বাজার এলাকার পৌর সুপার মার্কেটের পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্বের ২টি সিএনজি স্টেশন। এখানকার সড়ক এমনিতেই সরু। তার মধ্যে সিএনজি স্টেশন হওয়ায় যান এবং জন চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগে পোহাতে হয়। এই দুইটি স্টেশন থেকে প্রতিদিন ২০০টি সিএনজি খুরুস্কুলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। কক্সবাজার শহরের পৌরসভা মার্কেট সংলগ্ন সিএনজি স্টেশন দুটিই অবৈধ স্টেশন বা পার্কিং বলে দাবি স্থানীয়দের। চাঁদা আদায়কারিরা নিজেদের পকেট ভারি করার জন্য যে যার মতো স্টেশন বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে। আমান উল্লাহ ও নুরুল হকের নিয়ন্ত্রণে এই স্টেশন ২টি চলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিএনজি চালক বলেন, পেশকার পাড়ার সাবো ও সিহাব প্রতিদিন স্টেশন থেকে গাড়ি প্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা আদায় করে পৌরসভার নাম দিয়ে কিন্তু টোকেন খুঁজলে ধারালো ছুরি দেখিয়ে সেই টাকা আদায় করা হয়।
চাঁদা আদায়ে জড়িত শাবু ও সিহাব জানান, যানজট নিরসনের জন্য তাদের দোকান মালিক সমিতির নেতা রাশেদ নিয়োগ দিয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে তারা সে চাঁদা আদায় করেন। আদায়কৃত টাকা চাঁদা না এটি একটি সম্মানী। যা তাদের প্রাপ্য। কারণ তাদের ভয়ে সেখানে কোন যানজট হয় না। তাদের দাবি অবৈধ সিএনজি স্টেশনের সেই লাইনের চাঁদার টাকা নির্দিষ্ট অংশ ভাগবাটোয়ারা হয়। যা অনেক কর্মকর্তার নিকট সময়মতো পৌঁছে দিতে হয়। তা না হলে চাঁদা তোলার জন্য অন্য কাউকে হস্তান্তর করা হয়।
একইভাবে কলাতলী আদর্শগ্রামের বাসিন্দা লাইনম্যান নজিবুল হক বাবু ও মৌলভী নুরুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে কলাতলী মোড়ে রয়েছে একটি সিএনজি স্টেশন। তারা প্রতিদিন সিএনজি থেকে সমিতির নামে চাঁদাবাজি করে।
কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের অবৈধ সিএনজি স্টেশন জাকারিয়া ও আম্বুলোর নামে ব্যক্তি লিংকরোডের অবৈধ সিএনজি স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা প্রতিদিন ওই দুই স্টেশন থেকে টাকা তুলেন।
সিএনজি চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ট্রাফিক পুলিশ ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সড়ক দখল করে সিএনজি স্টেশন বসিয়েছে। তাদের সাথে রয়েছে দৈনিক ও মাসিক চুক্তি। এই চুক্তিতে ট্রাফিক পুলিশের দেয়া টোকেনে জেলাজুড়ে চলে লাইসেন্সবিহীন সিএনজি। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের টিআই বিলাল এসব নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাবাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, টমটম যন্ত্রণার পাশাপাশি অবৈধ স্টেশনের কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কি ট্রাফিক বিভাগের চোখে পড়ে না।
কক্সবাজার আন্দোলনের সমন্বয়ক সাংবাদিক এইচ,এম নজরুল ইসলাম বলেন, সড়কে চাহিদার তুলনায় চারগুণ বেশি গাড়ি চলছে। যার জন্য প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ, অসাধু চাঁদাবাজ নেতা ও সিএনজি সমিতি মিলে এই শহরকে যানজটের শহর বানিয়েছে। নতুবা সড়ক দখল করে কিভাবে অবৈধ সিএনজি স্টেশন হয়।
কক্সবাজার জেলা অটো রিক্সা সিএনজি টেম্পু পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুল মোস্তফা জানান, চাঁদা আদায়কারীর সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি উল্টো এ বিষয়েপ্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
কক্সবাজার পৌরসভার সচিব রাসেল চৌধুরী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা খোরশেদ আলম জানান, নির্দিষ্ট স্পট রয়েছে যেখান থেকে পৌরসভার কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট টাকা আদায় করে রশিদ প্রদানের মাধ্যমে। কিন্তু অনেক অবৈধ স্টেশন রয়েছে যেখান থেকে অনেক চাঁদাবাজ চালকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে হয়রানি করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কক্সবাজার জেলা অটোরিক্সা—সিএনজি—টেম্পু শ্রমিক (১৪৯১) ইউনিয়নের সভাপতি জিন্নাত আলী জানান, সমিতির নামে কেউ সিএনজি স্টেশন থেকে টাকা উত্তোলণ করে না। এটি সমিতির সুনাম ক্ষুন্ন করার ষড়যন্ত্র।
কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের টিআই মো. আমজাদ হোসেন বলেন, পুলিশ—সাংবাদিক বন্ধু। এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলেন। আমার ব্যক্তিগত কোন মন্তব্য নেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •