– বদরুল ইসলাম বাদল 

“একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেক বার।” রাজপথ কাঁপানো শ্লোগান। নব্বই দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় শ্লোগানটির সাথে প্রথম পরিচিত হই। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বিভিন্ন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জিয়া সামরিক শাসন জারি করে। সংবিধান স্থগিতসহ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং স্বাধীনতার পরাজিত হায়নাদের বিশ্বস্ত প্রেমি জেনারেল জিয়া হাজার বছরের বাঙালি জাতির কৃষ্টি সংস্কৃতির ঐতিহ্যের গৌরব মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর বর্বরোচিত খড়ক চালায়।

রাজাকার শাহ আজিজ গংদের মন্ত্রীর আসনে বসিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের পবিত্রতা নষ্ট করে। জেনারেল জিয়ার দেখানো পথে জেনারেল এরশাদ ও নব্বই সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। তাতে সদ্য স্বাধীন দেশের ভংগুর অর্থনীতি এবং পাকিস্তানী বাহিনীর দ্বারা ধ্বংসের অবকাঠামো উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়ে যায়। স্বাধীনতার স্বাদ সপ্নের চোরাবালিতে আটকে পড়ে। কিন্তু লড়াকু বাঙালী জাতি হার না মানা জাতি। হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে বাঙালী জাতি কোন দিন কারও সাথে আপোষ করে নাই। তেমনি খান জেনারেল আইয়ুব ইয়াহিয়ার এদেশীয় প্রেতাত্মাদের সামরিক জান্তাদের এদেশের মানুষ মেনে নিতে পারে নাই। প্রতিবাদ করেছে । প্রতিরোধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে স্বাধীনতা ও অধিকারের জন্য আন্দোলন করে ঐক্যবদ্ধ জাতি স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করে। মোদ্দা কথা নানাবিধ সংকটে জাতিকে ঐক্যের প্রশ্নে আমরা বারবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছে ফিরে যাই। স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্যের দিকে ফিরে দেখি। সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচার, স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একাত্তরের দৃঢ়তা নিয়ে একতার মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালি জাতি সমস্ত লড়াই সংগ্রামে বিজয়ের হাসি হাসে। আবার বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ও একাত্তরের চেতনায় সম্মিলিত ভাবে কাধেকাধ মিলিয়ে মোকাবিলা করে। সর্বোপরি বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ চেতনার নাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।

তেমনি আজ বিজয়ের মাসে পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে পুঁজিবাদের মোড়লদের চোখ রাঙ্গানীএবং কুঠচাল ডিঙিয়ে বাঙালি জাতি বিজয়ের হাসি হাসে। বিশ্ব বিস্ময়ের সাথে দেখে বাঙালি জাতির অকুতোভয় নির্ভীক চিত্তের বিজয় মিছিল। অতীতে বৃটিশ উপনিবেশ কিংবা পাকিস্তানি গোষ্ঠী জাতির ভাগ্য এবং জীবন যাত্রার সাথে সম্পর্কিত কোন উন্নয়নে হাত দেয় নাই। শোষণ আর শাসনের সুবিধার নিমিত্তে যত টুকু না করলে নয় শুধু সে পর্যন্ত করেছে। তাই বিশ্বের সর্বত্র যেখানে প্রগতির ঝান্ডা জয়জয়কার আমাদের এই ভূখন্ডে তখন অন্ধকার অমানিশা। তৎকালীন পিছিয়ে পড়া সামাজিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করে রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধু মুজিব এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের উপর জোর দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলেন বারবার।

কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতা নেবার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। তখনই সমস্ত মহাপরিক্লপনা স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র শাসনের দায়িত্ব নেওয়ায় পিতার চোখে দেখা সোনার বাংলা নতুন ভাবে অক্সিজেন নিয়ে প্রাণ ফিরে পায়।একে একে জয় করে সমুদ্র, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আকাশ। আন্তর্জাতিক মানের মেট্রোরেলসহ ইত্যাদি ।

কিন্তু উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য এগুলো বড় চ্যালেঞ্জিং। তদুপরি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কারীদের পাস কাটিয়ে সম্পুর্ন নিজেদের অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতুর মত মেগা প্রকল্প সপ্নের বাইরের আকাশ ছোঁয়া সপ্ন ।কিন্তু একুশ টি জেলার মানুষের হ্নদয়ের স্পন্দনের সাথে দেশের নিউক্লিয়াসের সরাসরি মিলন সত্যি বিশ্বের কাছে বিস্ময় ।এই মিলন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সূচকের ঘরে ও নতুন মাত্রা যোগ করবে।

কিন্তু এই বিজয় টি সহজ বিজয় ছিল না। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান সমূহ তথা বিশ্ব ব্যাংক আই এম এফ জাইকাসহ ঋণদাতা সংস্থার শুরু থেকে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের সংশ্লিষ্টতা স্থগিত করে।ফলে অনিশ্চিত হয়ে যায় মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু। কিন্তু বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক চরিত্র হার না মানা। সে ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নিজের দেশের টাকায় পদ্মা সেতু করার ঘোষনা দেন। নড়েচড়ে বসে আন্তর্জাতিক পাটিগণিত বিশেষজ্ঞ গন। বিদ্রুপের হাসি হাসে দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী।হাসি তামাশা করে। দম্ভের সাথে বিদেশি বিনিয়োগ কারীদের প্রশ্নকে সমর্থন করে।

বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে দেশ এবং জাতির মাঝে কোন সংকট দেখা দিলে দলমতনির্বিশেষে সবাই এক হয়ে যায়। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশের দেশ বিরোধী কিছু মানুষের এবং দলের। তেমনি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একাত্তরে বাঙালি জাতির চেতনার বিরোধিতা করে। বিদেশি প্রভুদের খুশী করতে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত হয়। দেশের উন্নয়ন বাধা গ্রস্থ করতে দেশের ভিতরে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকে। ইস্যুবিহীন জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন এবং আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে উন্নয়নের গতিকে ব্যাহত করতে চায়। তাই পদ্মাসেতুর মত একটি ভাল কাজকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্টী মেনে নিতে পারছে না। কোন দেশপ্রেমিক নাগরিক কিংবা দল পদ্মা সেতুর মত একটি জনমুখী মেগা প্রকল্পের বিরোধিতা করতে পারে না। কিন্তু হাজার ষড়যন্ত্র করেও কিছু করার পারে নাই। কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু নিয়ে দায়ের কৃত দুর্নীতির মামলা খারিজ হয়ে যায়। সমস্ত গুজব জল্পনা কল্পনা ডিঙ্গিয়ে আজ পদ্মা সেতু এপার ওপারের সাথে মহা মিলনের জয় হয়। কৃতজ্ঞতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বছরে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের আপোসহীন চেতনার অনন্য নিদর্শন।নদীমাতৃক বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করার জন্য স্বাধীনতার আগে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জনসভায় পদ্মা নদী সহ বিভিন্ন নদীর উপর সেতু করার সপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়নের আগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং পরাজিত হায়নাদের দেশীয় এজেন্টরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। কিন্তু রুপালি ইলিশের চারণভূমি পদ্মা পাড়ের মানুষের লালিত স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাস্তবায়িত করে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকল।

আজ বাঙালি জাতি বিশ্বে যে যেখানে আছে পদ্মা বিজয়ের খুশিতে আত্মহারা। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং কুটনৈতিক টেবিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা নিয়ে প্রশংসার ঝড়। শুধু তাই নয় উন্নয়নশীল অনেক দেশের দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব শেখ হাসিনার সাফল্য নিয়ে অনুপ্রাণিত। উজ্জীবিত। শুধু পুঁজিবাদী বিশ্বের মুৎসুদ্দী গোষ্ঠী এবং দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখে কোন কথা নাই। হতবাক। এখন পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসানোর পর ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষামান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ভাসমান ক্রেনবাহী জাহাজ। তিয়ান-ইবঙ্গবন্ধুর সপ্ন বুননের জন্য নিয়ে আসা। বঙ্গোপসাগরে অবস্থান রত তিয়ান- ই কে ভালবাসা।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ব-দ্বীপের দিকে আরও একটি পৃথিবীর বৃহত্তম জাহাজ আসার খবর বাঙালি জাতির এখনও মনে আছে। সপ্তম নৌবহর। যুদ্ধবাজ আমেরিকার তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের জাহাজ। নির্ঘাত পরাজয় বুঝতে পেরে পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করার জন্য সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশ উপকূলের দিয়ে আসা শুরু করে। বাঙালির সপ্নকে চুরমার করার জন্য। কিন্তু বিশ্বের বড় ক্রেনবাহী জাহাজ তিয়ান-ই আসে বঙ্গবন্ধুর দেখা সপ্ন পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের জন্য। হাজার স্যালুট তিয়ান-ই। আর ঘৃণা ভরে ধিক্কার সপ্তম নৌবহর, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ,হানাদার পাকিস্তান এবং তাদের দুসর দেশীয় দালালদের।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।

লেখক : বদরুল ইসলাম বাদল, ঢেমুশিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার, নব্বই দশকের সাবেক ছাত্র নেতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •