cbn  

বিদেশ ডেস্ক:

ব্রিটেনে নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বেশকিছু দেশ এরইমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পরিস্থিতিকে ‘সত্যিকারের উদ্বেগের কারণ’ বলে মনে করা হচ্ছে। করোনা মহামারি দেখা দেওয়ার পর থেকে যে এবারই প্রথম রূপান্তর বা জিনগত পরিবর্তনের কারণে ভাইরাসটির সংক্রমণ বেড়েছে, তা নয়। তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পর ধারণা করা হচ্ছে এই ছড়িয়ে পড়ার হার ৭০ শতাংশ কিংবা তার চেয়েও বেশি।

কোভিড-১৯ এর ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য (স্ট্রেইন) কী?

স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মানবশরীরকে আক্রান্ত করা কোভিড-১৯ এর অন্তত সাতটি বড় গ্রুপ কিংবা স্ট্রেইন পাওয়া গেছে। মূল স্ট্রেইনটি আবিষ্কার হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে। এর নাম ‘এল স্ট্রেইন’। এরপর ২০২০ সালের শুরুর দিকে এর রূপান্তর হয়ে এস স্ট্রেইন হয়। এরপর আবারও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে উদ্ভব হয় ভি ও জি স্ট্রেইনের।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাতে সাধারণত করোনাভাইরাসের স্ট্রেইন জি দেখা যায়। তবে এসব মহাদেশে মানুষের চলাচলের ওপর বিধি-নিষেধ শিথিল থাকার কারণে দ্রুত এ ভাইরাস ছড়িয়েছে এবং জিআর, জিএইচ ও জিভি স্ট্রেইনের উদ্ভব হয়েছে। এদিকে আবার এশিয়াতে মূল স্ট্রেইন এল-এর উপস্থিতি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময়ের জন্য ছিল। কারণ চীনসহ বিভিন্ন দেশ দ্রুত তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে চলাফেরায় বিধি-নিষেধ আরোপ করায় এর রূপান্তর হয়নি। এছাড়া অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিছু স্ট্রেইনকে একসঙ্গে `স্ট্রেইন ও’ নামে ডাকা হয়ে থাকে।

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আধিপত্যকারী স্ট্রেইন হলো জি স্ট্রেইনস। বিশেষ করে ইতালি ও ইউরোপে প্রাদুর্ভাবের পেছনে এটি দায়ী। সুনির্দিষ্ট মিউটেশনটি হলো ডি৬১৪জি। এটি সবচেয়ে পরিচিত রূপান্তর। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ভাইরাস আরও বেশি সংক্রামক হয়ে উঠতে পারে। তবে কিছু গবেষণা আবার এর সঙ্গে সাঘর্ষিক। এরইমধ্যে মূল এল স্ট্রেইন ও ভি স্ট্রেইনের মতো শুরুর দিককার স্ট্রেইনগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মহামারি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কার্যকরী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এল ও এস স্ট্রেইনের সংক্রমণ রোধ করতে পেরেছে। আর জি স্ট্রেইনের কারণে যে নতুন সংক্রমণ দেখা গেছে তা এসেছে বিদেশফেরতদের মাধ্যমে।

মার্চের শুরু থেকেই এশিয়াতে জি, জিএইচ ও জিআর স্ট্রেইনের প্রকোপ বাড়তে দেখা গেছে। এক মাসেরও বেশি সময় আগে থেকে এ স্ট্রেইন ইউরোপে ছড়িয়েছে।

কেন এই বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে?

দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে অপেক্ষাকৃত দ্রুত বেগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরই এর নেপথ্যে থাকা কোভিড-১৯ এর একটি নতুন রূপান্তরকে শনাক্ত করা হয়। বিবিসির স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিনিধি জেমস গ্যালাঘার বলছেন, মূলত তিনটি কারণে করোনাভাইরাসের নতুন এই ভ্যারিয়ান্টটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। প্রথমত, এটি ভাইরাসের অন্য সংস্করণগুলোকে প্রতিস্থাপিত করছে। দ্বিতীয়ত এটির বিভাজন বা রূপান্তর ভাইরাসের কিছু অংশে পরিবর্তন আনে, যা গুরুত্বপূর্ণ। এবং তৃতীয়ত এসব বিভাজনের মধ্যে বেশ কিছু ল্যাবে পরীক্ষার পর দেখা গেছে যে এগুলো মানুষের দেহের কোষকে সংক্রমিত করার ভাইরাসের যে সক্ষমতা তা বাড়ায়। এই ৩ বৈশিষ্ট্যই ভাইরাসটিকে সহজে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা দেয়।

ভাইরাসটির সংক্রমণ কমিয়ে আনতে এরই মধ্যে চতুর্থ পর্যায়ের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কোভিড-১৯ জেনোমিক্স কনসোর্টিয়ামের অধ্যাপক নিক লোমান বলেছেন, “ল্যাবরেটরিতে এ নিয়ে পরীক্ষার দরকার আছে, কিন্তু এর জন্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে অপেক্ষা করার সময় আছে কি? সম্ভবত এই অবস্থায় নয়।”

যুক্তরাজ্যে করোনা ভাইরাসের নতুন রূপান্তরটি কতখানি সংক্রামক?

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে ৪৩ শতাংশ নতুন সংক্রমণ, পূর্ব ইংল্যান্ডে ৫৯ শতাংশ এবং লন্ডনে ৬২ শতাংশ নতুন সংক্রমণের পেছনে এ রূপান্তরিত স্ট্রেইন দায়ী। ইংল্যান্ডের প্রধান মেডিক্যাল কর্মকর্তা অধ্যাপক ক্রিস হুইটি বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে খুব খুব দ্রুত এর সংক্রমণ বেড়েছে।’

প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা প্যাট্রিক ভ্যালান্স বলেন, ‘অস্বাভাবিকভাবে বড় সংখ্যায় এর রূপান্তর দেখা গেছে।’ করোনাভাইরাসের নতুন এ স্ট্রেইনটির ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন পরিবর্তন দেখা গেছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ভাইরাসের নতুন রূপান্তরিত স্ট্রেইন (ভিইউআই-২০২০১২/০১) ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি সংক্রামক হতে পারে। এটি আর নাম্বার ০.৪ বাড়িয়ে দিতে পারে।

বরিস জনসন বড়দিনে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করার আভাস দিয়েছিলেন। তবে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সমালোচনার মুখে নতুন করে করোনার বিধিনিষেধ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় টায়ার ফোর রেস্ট্রিকশনস ঘোষণা করতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন বিজ্ঞানের পরিবর্তন হয়, তখন আমাদেরকে অবশ্যই পদক্ষেপও পাল্টাতে হবে। যখন ভাইরাস তার আক্রমণের পদ্ধতি পাল্টে ফেলে, তখন আমাদেরকে অবশ্যই নিজেদের প্রতিরক্ষার পদ্ধতি পাল্টাতে হবে। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, আমার কাছে কোনও বিকল্প পথ খোলা নেই।’

জনগণকে এসব এলাকা থেকে বাইরে ভ্রমণে না যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক হুইটি। তিনি মনে করেন, এতে ‘উল্লেখজনক মাত্রার ঝুঁকি’ আছে। হুইটি বলেন, ‘নতুন স্ট্রেইনটি উচ্চ মৃত্যু হার কিংবা ভ্যাকসিন ও চিকিৎসাকে অকার্যকর করে দিচ্ছে বলে কোনও আলামত এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কাজ চলছে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •